জেলা প্রতিনিধি
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার কলাবাড়িয়া ইউনিয়নের চরকান্দিপাড়া গ্রামে ভ্যানচালক হাসান শেখ হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, এ ঘটনায় অন্তত ২০ থেকে ২৫টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের হিসাবে, মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি টাকা। হামলার ভয়ে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) গ্রামটি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরে পড়ে আছে ছাই ও ধ্বংসস্তূপ। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার আগে টিন, আসবাবপত্র, ধান-চাল, পাট, গবাদিপশু ও স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, হাসান শেখের মৃত্যুর পরদিন থেকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। আতঙ্কে নারী ও শিশুরা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অছিকুর শেখ, অহিদুল শেখ, শেখ তৈয়বুর রহমান, জাহিদ শেখ, সোহরাব শেখ, সাইফুল শেখ, মাহমুদ শেখ, মামুন শেখ, সেকন শেখ, মারুফ শেখ, আকিদুল শেখ, হাসমত শেখ, আমিন শেখ, শাহাবুদ্দিন শেখ, ইখতিয়ার শেখ, ইখলাস শেখ, ইস্কান্দার শেখ ও আজিম গাজীর বাড়িসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫টি বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী বাবু শেখের স্ত্রী তসিরন অভিযোগ করেন, সোহেল মেম্বারের নেতৃত্বে আলমগীর, আজিজুল, মাহাবুর, রাসেল ও মুক্তিসহ একদল লোক তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় তার কানের দুল, স্বর্ণের চেইন, স্মার্টফোন ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে যাওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তসিরন বলেন, “আমার ছেলেরা বিদেশে থাকে। অনেক কষ্টে যা কিছু গড়ে তুলেছিলাম, সব ধ্বংস করে দিয়েছে। ভাঙচুর ও লুটপাটের পর রাতের বেলায় আমাদের ভবনে আগুন দেওয়া হয়। আমরা এখন পুরোপুরি নিঃস্ব। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
জাহিদুর রহমানের স্ত্রী চায়না বেগমের অভিযোগ, হাসান শেখের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোহেল মেম্বারের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের বাড়িসহ আশপাশের বাড়িঘরে হামলা চালায়। ভাঙচুর ও লুটপাটের কারণে তারা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
চায়না বেগম বলেন, “পুলিশ এক পাড়ায় অবস্থান করলে হামলাকারীরা অন্য পাড়ায় গিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করছে। ভয়ে আমরা বাড়িতে ফিরতে পারছি না। দ্রুত প্রশাসনের সহযোগিতা চাই, যাতে নিরাপদে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারি।”
শেখ তৈয়বুর রহমানের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা ও মেয়ে শিল্পী বেগম বলেন, হাসান শেখ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে তাদের প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরতে গেলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সন্তানদের লেখাপড়াও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ওহিদুল ইসলামের স্ত্রী ববিতা বেগম বলেন, “আমরা এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়েছি। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। বাড়িতে থাকার মতো পরিবেশ নেই।”
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, অন্তত ২০ থেকে ২৫টি বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে তাদের সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে চরকান্দিপাড়া গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সোহেল মেম্বার ও আবেদ শেখের পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে হাসান শেখ গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় আরও ১১ জন আহত হন।
আহত ব্যক্তিদের প্রথমে কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে গুরুতর আহত ব্যক্তিদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ভোরে হাসান শেখ মারা যান।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই হোসেন শেখ বাদী হয়ে নড়াগাতী থানায় ৩৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর সোহেল মেম্বারের পক্ষের লোকজন আবেদ শেখের পক্ষের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্ত সোহেল মেম্বার কারাগারে থাকায় এবং অন্য অভিযুক্তরা পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার বাদী হোসেন শেখ জানিয়েছেন, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
নিহত হাসান শেখের মা তাসলিমা বেগম (৬২) বলেন, “কে বা কারা ভাঙচুর, লুটপাট করছে, তা আমরা জানি না। আমার ছেলে হাসান শেখ হত্যায় যারা জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আমি দোষীদের ফাঁসি চাই।”
নড়াগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হোসেন আলী বলেন, হাসান শেখ হত্যা মামলায় তিনজন এবং ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের দুটি পৃথক মামলায় আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোট নয়জনকে গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরকান্দিপাড়া ও কলাবাড়িয়া এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কলাবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে লুট হওয়া কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেফতার ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও এসআরবির যৌথ অভিযান চলছে।
প্রতিনিধি/এসএস