Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

পর্যটকশূন্য সেন্টমার্টিনে ভেসে আসছে টন টন ‘বিদেশি বর্জ্য’

০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৫ এএম

পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সৈকতে ভেসে আসছে বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্য। ছেঁড়া দ্বীপসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় পড়ে থাকা এসব বোতল, প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্যের অনেকগুলোর গায়ে মিলেছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানের লোগো ও বিদেশি ভাষার লেখা। সমুদ্রস্রোত ও বাতাসে ভেসেই এসব বর্জ্য প্রতিবেশী দেশগুলোর উপকূল থেকে সেন্টমার্টিনে এসে জমা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা। এমন অবস্থায় দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সামুদ্রিক দূষণ মোকাবিলাও জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।

গতকাল রোববার (৪ অক্টোবর) সেন্টমার্টিনের সর্বদক্ষিণের অংশ ছেঁড়া দ্বীপের সৈকতজুড়ে বিপুল প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পর্যটন মৌসুম এখনো শুরু না হলেও সৈকতে এতো বিপুল বর্জ্য জমে থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তারা।

সৈকতে পড়ে থাকা বোতল ও প্যাকেটগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, অনেকগুলোর গায়ে বাংলাদেশের বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম, লোগো ও বিদেশি ভাষায় লেখা রয়েছে। কয়েকটি বোতলের লেবেলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও দেখা গেছে।

স্থানীয়দের ধারণা, বর্ষাকালে প্রবল সামুদ্রিক স্রোত ও দক্ষিণা বাতাসের কারণে এসব বর্জ্য মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের উপকূল থেকে ভেসে সেন্টমার্টিনে এসে জমা হতে পারে।

coxsbazarদ্বীপটির মারমেইড রিসোর্টের মালিক তায়েব উল্লাহ সম্প্রতি ছেঁড়া দ্বীপ এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, ‘পর্যটক না থাকার সময়েও সৈকতে বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্য দেখে বিস্মিত হয়েছি। এসব বর্জ্যের অনেকগুলোর গায়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের লেবেল ও লেখা রয়েছে।’

তায়েব উল্লাহ আরো বলেন, ‘বর্ষার প্রবল স্রোত ও দক্ষিণা বাতাসের কারণে এসব বর্জ্য সমুদ্রপথে সেন্টমার্টিনে ভেসে আসতে পারে। স্থানীয়ভাবে দূষণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিবেশী দেশ থেকে ভেসে আসা বর্জ্য এখন দ্বীপটির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।’

দ্বীপের উপকূলীয় কেয়াবন এলাকাতেও একই ধরনের বর্জ্য দেখা গেছে বলে জানান তিনি।

coxsbazar-2ছেঁড়া দ্বীপের সৈকতে বর্জ্যের স্তূপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘সৈকতে বিদেশি বোতল ও বর্জ্য, পর্যটক না থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ এবং পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা আছে।’ 

আরেক বাসিন্দা ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘সেন্টমার্টিন ভ্রমণ বন্ধ রেখে কী লাভ হলো? পর্যটন বন্ধের সময়ও টনের পর টন প্লাস্টিক বর্জ্য আসছে। এটা নিয়ে সরকারের কাজ করা উচিত।’

প্রতিদিন এক টন বর্জ্য সংগ্রহ

সেন্টমার্টিনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে ব্র্যাক। প্রতিষ্ঠানটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সমন্বয়ক মোহাম্মদ রফিক জানান, তাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা দ্বীপের আবাসিক এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় এক টন বর্জ্য সংগ্রহ করেন। পরে এসব বর্জ্য বিভিন্ন শ্রেণিতে আলাদা করে সেগুলো অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করা হয়।

রফিক আরো বলেন, দ্বীপের জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে তারা অন্য দেশ থেকে আসা বর্জ্য পাননি। তবে ছেঁড়া দ্বীপের কাছে সৈকত পরিষ্কার করার সময় বিদেশি লেবেলযুক্ত বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্য পেয়েছেন। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক।

পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কক্সবাজারের সদস্যসচিব এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে এখন পর্যটক নেই। এরপরও সেখানে বস্তা বস্তা প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য ভেসে আসছে। এটি দ্বীপটির পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি।’

থাইল্যান্ডের বোতল, মিয়ানমারের প্যাকেট 

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, ‘সৈকতে পাওয়া প্লাস্টিকের বোতলের গায়ে থাকা কয়েকটি লোগো অনলাইনে যাচাই করে দেখা হয়েছে। এতে কয়েকটি লোগো থাইল্যান্ডের কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বলে শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া কিছু প্যাকেটের গায়ে বিদেশি ভাষায় লেখা রয়েছে, যেগুলো মিয়ানমারের বলে মনে হচ্ছে।’

উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সেন্টমার্টিনের দূষণ কমাতে পর্যটন সীমিত করছি, সৈকত পরিষ্কারে অভিযান চালাচ্ছি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার চেষ্টা করছি। অথচ অন্য দেশ থেকে আসা বর্জ্যও আমাদের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিকে দূষিত করছে।’

coxsbazar-1মাহমুদ পাশা বলেন, বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্য যদি উপকূলে এসে পৌঁছায়, তাহলে সমুদ্রের তলদেশেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক জমা হতে পারে। এতে প্রবাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সেন্টমার্টিনের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তার মতে, দ্বীপটির স্থানীয় দূষণ কমানোর পাশাপাশি এখন আন্তঃসীমান্ত সামুদ্রিক দূষণ মোকাবিলায়ও যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

প্রতিনিধি/এমআর