জেলা প্রতিনিধি
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫১ এএম
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের দেখা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। চিকিৎসক দেখানোর পরও শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি। প্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালে করা যাচ্ছে না। এমআরআই বন্ধ, অচল সিসিইউ ও আইসিইউ। সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন চালু থাকে এক্স-রে, সিটিস্ক্যান ও আলট্রাসনোগ্রাফি। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা মৌলভীবাজারের এই সরকারি হাসপাতালে জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক চিকিৎসক দিয়ে চলছে কার্যক্রম। নার্স ও টেকনোলজিস্টের পাশাপাশি সংকট রয়েছে শয্যারও। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যন্ত্রপাতি অচল থাকায় সীমিত হয়ে পড়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৪০৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে শূন্য রয়েছে ১০৩টি পদ। এর মধ্যে চিকিৎসকের ৮৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪২ জন। অনুপস্থিত চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন সাতজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে দিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। আর ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ রোগী। ফলে অতিরিক্ত রোগীদের অনেক সময় বিভিন্ন ওয়ার্ডের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হয়।

তবে হাসপাতালের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, সীমিত জনবল দিয়ে রোগীর এই চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন। চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মীর সংকট থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই বহির্বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। দূর উপজেলা থেকে কেউ এসেছেন চিকিৎসকের দেখা পেতে, কেউ আবার রাতেই স্বজনকে ভর্তি করেছেন হাসপাতালে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে চিকিৎসকের দেখা। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে গিয়ে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
চিকিৎসকের সংকটের পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। হাসপাতালে ১৪ জন টেকনোলজিস্টের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন ৯ জন।
জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটিস্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এমআরআই সেবা পুরোপুরি বন্ধ। অচল রয়েছে সিসিইউ ও আইসিইউ। ডায়ালাইসিস সেবাতেও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের সংকট রয়েছে।
ফলে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা করানোর সুযোগ না পেয়ে অনেক রোগীকেই বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর এর চাপ পড়ছে বেশি।
রাজনগর উপজেলার টেংরা এলাকার রোগী মোতালিব খান বলেন, ‘সকাল আটটা থেকে লাইনে দাঁড়াইছি। ১১টার দিকে ডাক্তারের কাছে যাইতে পারছি। তিনি এক মিনিট কথা শুনে প্রেসক্রিপশন দিলেন। এখন বাইরে থেকে টেস্ট করতে হবে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কই পাবো?’

রোগীর স্বজন জবদুল মিয়া বলেন, ‘হাসপাতালে টেস্ট করাতে পারি না। নামেই সরকারি হাসপাতাল, কিন্তু সব কাজ প্রাইভেটে করতে হয়। আমাদের মতো মানুষের পক্ষে এত টাকা খরচ করা সম্ভব না।’
আরেক রোগীর স্বজন ইয়ামিন মিয়া জানান, তার শাশুড়ির আলট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন ছিল। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, সেবা বন্ধ। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে হয়েছে।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি অচল যন্ত্রপাতি সচল করা এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি রোগী ও স্বজনদের।
তাদের ভাষ্যে, যে হাসপাতালে ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা, সেই হাসপাতাল যদি জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটে জোড়াতালি দিয়ে চলে, তাহলে সরকারি চিকিৎসাসেবার সবচেয়ে বড় বোঝাটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধেই।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক প্রণয় কান্তি দাস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হাসপাতালে নানা সংকট রয়েছে। এসব সংকট সমাধানে কাজ করা হচ্ছে এবং বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। জনবল সংকট নিয়ে এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।’
প্রতিনিধি/জেবি