শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

দালাল আর আনসারদের ‘দৌরাত্ম্য’ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে

কাজী রফিক
প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০১:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

দালাল আর আনসারদের ‘দৌরাত্ম্য’ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে

রাজধানীর শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। বিশাল আয়তন ও জনবলের এই হাসপাতালে কম খরচে ভালো চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন আসেন হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু দালাল চক্র ও আনসার সদস্যদের দৌরাত্ম্যে সেই প্রত্যাশা যেন দুমড়ে-মুচড়ে যায় সাধারণ রোগীদের।

হাসপাতালের মূল প্রবেশদ্বার আগের তুলনায় অনেকটা সংকুচিত হয়ে গেছে। কারণ হিসেবে উন্নয়ন কাজকে দোষারোপ করা হলেও একটু ভালোভাবে নজর দিলেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।

হাসপাতাল প্রাঙ্গণের মধ্যেই বসেছে ত্রিশটির বেশি অস্থায়ী দোকান। হাসপাতালে আগত মানুষ ও গাড়ি চলাচলের সড়কের দুই পাশ দখল করে এসব দোকান বসানো হয়েছে। হাঁটার রাস্তা, গাড়ি চলাচলের রাস্তা, গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গায় পর্যন্ত বসানো হয়েছে দোকান।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, কোনো দোকানই এখানে বিনামূল্যে বসেনি। প্রতিটি নির্দিষ্ট হারের চাঁদা দিতে হয় তাদের। এই চাঁদার টাকা যায় হাসপাতালে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের পকেটে।

হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেখলেই দোকান বন্ধের নির্দেশ আসে আনসারদের পক্ষ থেকে। আবার তারা চলে গেলেই আগের মতো সবকিছু।

6

গত মঙ্গলবার দুপুরে আনসার সদস্য দুলাল হাসপাতালের মূল অংশ থেকে বেরিয়ে আসেন পার্কিংয়ের দিকে৷ সেখানে থাকা কয়েকজন দোকানিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘দোকান ঢাক। একটু পরে খুলিস। আমি বললে।’

হাসপাতালের মূল অংশে প্রবেশ করলেই রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির জট। হাসপাতালের সামনে দুজন আনসার সদস্যের দায়িত্ব পরিবহনগুলোকে সুশৃঙ্খল রাখা। সে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তারা যেন বাড়তি দায়িত্বও পালন করেন।

সোমবার সকালে শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পথে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় সিএনজিচালক কালাম মোল্লার। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখান থেকে যাত্রী নিলে আনসারগো ১০ ট্যাকা কইরা দেওয়া লাগে।

একই তথ্য মিলেছে পরদিন মঙ্গলবারও। সিএনজিচালক আবুল বাশার ঢাকা মেইলকে বলেন, এটা তো জানা কথা, হাসপাতালের সামনে থেকে যাত্রী নিলে আনসারগো ১০ টাকা দেওয়া লাগে৷ অনেকে হাসপাতালের সামনেই নেয়।

আনসারদের একাংশ যখন সিএনজি থেকে ১০ টাকা করে তুলতে ব্যস্ত, একই সঙ্গে আরেকদল ব্যস্ত ‘মোবাইল টান দিতে’৷

7

শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরতদের মধ্যে প্রচলিত আছে, মোবাইল টান দিলেই ১০০!

এই কথা অর্থ জানতে চাইলে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একটি ওষুধ কোম্পানির একজন প্রতিনিধি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা হাসপাতালে আসি, এটা আমাদের কাজ। ডিউটি। বৈধ পেশা। আনসাররা প্রায়ই মোবাইল টান দেয়। ১০০ টাকা দিলে আবার দিয়ে দেয়।

একই পেশার আরও একজন পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রতি মাসে আমাদের এখানে টাকা দিতে হয়। কোম্পানি ভেদে এক থেকে দুই হাজার টাকা করে নেয়।

কে বা কারা এই টাকা নেয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনসাররা নেয়।

এদিকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আরেক ভোগান্তির নাম ‘দালাল’। হাসপাতালটির বিপরীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকের প্রতিনিধি হিসেবে তারা কাজ করেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকায়। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নেওয়াই তাদের কাজ। এমন বেশ কয়েকজন দালালকে শনাক্তও করেছে ঢাকা মেইল।

এছাড়া হাসপাতালে আসা রোগীদের ট্রলি কিংবা হুইল চেয়ার সেবা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। রোগীর স্বজনদের এই সেবার জন্য গুনতে হচ্ছে টাকা।

গত সোমবার ও মঙ্গলবার শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের মূল ভবনের প্রবেশমুখেই হুইল চেয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন নারী ও পুরুষ। পায়ে হেঁটে চলতে অসুবিধা হয় এমন রোগীদের বসানো হচ্ছে হুইল চেয়ারে।

মঙ্গলবার সেই চেয়ারের সেবা নিয়েছেন শাহিনূর বেগম। হাসপাতালে এসে ১০ টাকার টিকেট কেটে জরুরি বিভাগে ডাক্তার দেখিয়েছেন।

8

ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে শাহিনূর বেগম জানান, তার স্বামীকে হুইল চেয়ারে করে একশ গজের মতো দূরত্বে নেওয়া হয়েছে৷ এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে একশ টাকা।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, শুধু হুইল চেয়ার নয়, স্ট্রেচার ব্যবহারেও রোগীর স্বজনদের দিতে হয় ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। সূত্র মতে, এই স্ট্রেচার ও হুইল চেয়ারে রোগী বহনকারীরা হাসপাতালের কর্মী নন৷

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় হাসপাতালটির পরিচালক খলিলুর রহমানের কাছে৷

অভিযোগের তালিকা শেষ হওয়ার আগেই তিনি বলে ওঠেন, অনেক কমপ্লেইন। ওরা ঝামেলা করে। বদলাইতেছে, তাও ঠিক হচ্ছে না।

এর কারণ কি হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারণ কিছু না, ব্যক্তিগত কারণ। নিজের স্বার্থের জন্য করে। কোনো অথরিটি কি এগুলোর পারমিশন দেয়?

অভিযোগ রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও আনসাররা তোয়াক্কা করে না— এ বিষয়ে জানিতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, এর ছিটেফোঁটাও যদি প্রমাণ করতে পারেন, চাকরি ছেড়ে দেব।

হুইল চেয়ার যারা পরিচালনা করছেন, তাদের অনেকেই হাসপাতালের কর্মী না বলে স্বীকার করেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল পরিচালক। তিনি জানান, তাদের স্টাফের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর অভাব।

কারই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর