২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২১ এএম
জ্বালানি সংকটে একের পর এক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা ও সিস্টেম লসসহ বিভিন্ন কারণে গাজীপুরে বেড়েছে বৈদ্যুতিক লোডশেডিং। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শহর এলাকায় লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গাজীপুরে গড়ে সাত ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনন্দিন জীবন যেমন বিপর্যস্ত হচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন কারখানায় কমেছে উৎপাদন। আর এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ইটাহাটা এলাকার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী কাজল ফকির ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এই এলাকায় গত কয়েক দিনে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। আমার হোটেল প্রতিদিন ভোরে খোলি, বন্ধ করি রাত ১১টায়। এই সময়ের মধ্যে অন্তত ছয় থেকে সাতবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: কতদিন ভোগাবে লোডশেডিং
নাওজোড় এলাকার বাসিন্দা আবুল হাশেম বলেন, ‘তীব্র গরমে দিনে ছয় থেকে সাতবার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার লোডশেডিংয়ে অন্তত এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে মোটর দিয়ে পানি উঠাতে সমস্যা হচ্ছে। ওজু-গোসল যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনি লোডশেডিংয়ের সময় গরমে ঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’
কলেজপাড়া এলাকার এক গৃহিণী বলেন, ‘২১ এপ্রিল থেকে আমার ছেলের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে ছেলের পড়াশোনা বিঘ্নিত হয়েছে। এখন পরীক্ষা চলাকালেও লোডশেডিং থাকলে আমাদের সমস্যা তো হবেই।’
শহর এলাকায় তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম হলেও শহরের বাইরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন এলাকায় দিনে-রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই সমিতি গাজীপুর শহর ছাড়াও কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কমেছে কারখানায় উৎপাদন। গাজীপুরে কমবেশি পাঁচ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে, যার অধিকাংশই তৈরি পোশাক শিল্প। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার মেশিনপত্র চালাতে সমস্যা হচ্ছে।
বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে সেই জেনারেটর চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এতে বেশির ভাগ সময় শ্রমিকরা বেকার বসে থাকছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিমুখী এই শিল্প। আর্থিক লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় ইয়ন নীট কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দিনের মধ্যে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার মেশিনপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, উৎপাদন কমে গেছে। আমরা সময়মতো শিপমেন্ট করতে পারছি না। ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাব, সেখানেও সমস্যা। পাম্পে ডিজেল নেই। যেটুকু পাওয়া যায়, দাম বাড়ার কারণে এখন লিটারপ্রতি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: সিলেটে ভয়াবহ লোডশেডিং
তিনি আরও বলেন, ‘বাইরের ক্রেতারা অর্ডারের সময় আগে পণ্যের যে দাম দিতেন, এখনও তাই দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে কারখানা পরিচালনা করতে নানামুখী সমস্যা হচ্ছে।’
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট, যেখানে সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১৭২ মেগাওয়াট। তাই বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন এলাকায় ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং হচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন শ্রীপুর ও মাওনা অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর অধীন কালিয়াকৈর উপজেলায় চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১২০ মেগাওয়াট। প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পকারখানা থাকা এই জেলায় প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুতের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবুল বাশার আজাদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। তবে আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করছি।’
উল্লেখ্য, তীব্র তাপপ্রবাহ চলাকালে লোডশেডিং বৃদ্ধি পাওয়ায় গাজীপুরের সাধারণ মানুষ ও শিল্প উদ্যোক্তারা তীব্র ভোগান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী দিনগুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিধি/এমআই