২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম
বাজারদরের উত্থান আর পতনের মাঝখানে সীমাবদ্ধ মুন্সিগঞ্জের আলু চাষিদের ভাগ্য। বিগত কয়েক বছরের ক্রমাগত লোকসান পোষাতে, চলতি মৌসুমে লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে আলু আবাদ করেছেন জেলার কয়েক লাখ কৃষক। তবু এবছর মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। জমি থেকে আলু উত্তোলন শুরু হতেই কয়েক দফা দরপতনে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে আলু চাষিদের ভবিষ্যৎ। এমন পরিস্থিতিতে আগামী মৌসুমে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
সরেজমিনে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখাঁন ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, উত্তোলন মৌসুম ঘিরে মাঠ থেকে আলু তোলার ব্যস্ততা বেড়েছে এখানকার আলু চাষিদের। প্রান্তিক কৃষকের দীর্ঘদিনের ঘাম আর শ্রমে অর্জিত স্বপ্নের ফসল বস্তাবন্দি করে পাঠানো হচ্ছে হিমাগারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সময়ের ব্যবধানে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির দেখা না মিললে, হিমাগার থেকে কৃষক ফেরেন শূন্য হাতে। গেল কয়েক বছর ক্রমাগত লোকসানে ঋণের বোঝা ভারী হয়েছে কৃষকের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১১ লাখ থেকে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত।
অধিদফতরের তথ্য বলছে, চাহিদার তুলনায় বেশি আলুর উৎপাদন হওয়ায় দুর্গতি যেন পিছু লেগেছে কৃষকের। এবারও বাজারদর কম থাকায় বড় অংকের লোকসানের মুখে কয়েক লাখ আলু চাষি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চলতি মৌসুমে আলু সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় কমাতে সড়ক পথের চেয়ে নৌপথে বেড়েছে চাপ। উত্তোলন শেষে জমি থেকে বস্তাবন্দি করা আলু- দুই চাকার বাহন সাইকেলে করে বাড়ি নিচ্ছেন কৃষক। তবু প্রশ্ন উঠছে, এত ত্যাগের বিনিময় অর্জিত কষ্টের ফসল, কেন সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছে না!
আরও পড়ুন: কৃষিবান্ধব উদ্যোগই কৃষকের গলার কাঁটা!
আলু চাষিদের অভিযোগ, সার, কীটনাশক বীজের দামের সাথে শ্রমিক মজুরি যুক্ত হয়ে এ বছর আলু আবাদে মনপ্রতি কৃষকের খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমান আলুর পাইকারি বাজার মূল্য সর্বোচ্চ ৪৫০ টাকা। এতে জমি থেকে আলু বিক্রি করে কৃষককে মণপ্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে দুই থেকে অন্তত আড়াই শ টাকা পর্যন্ত।
এতে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত আলুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক। ফলে দ্রুত বিদেশে আলু রফতানির জোর দাবি এ অঞ্চলের কৃষকের। তবু আশা জাগানিয়া বার্তা নেই স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কাছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ ও বিপণন অধিদফতরের জরিপ অনুযায়ী- গত পাঁচ বছর আলু আবাদ করে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পেয়ে পথে বসেছেন বহু প্রান্তিক চাষি। কোনো মৌসুমে আলুর আকাশচুম্বী বাজারদর দেখা গেলেও বেশির ভাগ সময় বাজারমূল্য গিয়ে ঠেকেছে পাতাল সমান শূন্যের কোঠায়। ফলে চাষিদের লোকসান কমাতে সরকারি টিসিবির পণ্যে আলু ক্রয় বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করাসহ কৃষকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি উঠলেও সেইসব কখনোই দেখেনি আলোর মুখ।
গত সোমবার (২০ এপ্রিল) জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ঘুরে ও ভুক্তভোগী স্থানীয় আলু চাষি এবং প্রান্তিক কৃষকদের সাথে কথা হলে তারা জানান, আলু চাষে সুপরিচিত জেলা মুন্সিগঞ্জে এবছর ভালো ফলন হয়েছে। আলুর গুণগত মান ও ভালো ফলন দেখে কৃষকের চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক দেখা দিলেও আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় কৃষকের সেই হাসি ফুরিয়ে গেছে। বর্তমান বাজারমূল্যে আলু বিক্রি করে মণপ্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে অন্তত দুশো টাকা। তবু মাঠে দেখা মিলছে না পাইকারের।
প্রান্তিক চাষিরা বিক্রির আশায় আলু তুলে জমিতে স্তুপ করে রাখলেও অন্যানবারের মতো পাইকারি আলু ব্যাবসায়ী ও সংরক্ষণকারীদের খুব একটা দেখা মিলছে না। ফলে কৃষকরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
সম্প্রতি রাতভর বৃষ্টি হওয়ায় জমির আলুর স্তুপ এবং অপেক্ষাকৃত আলুর নিচু জমিতে পানি আটকে যাওয়ায় ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়ার শঙ্কায় আলু চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এছাড়া বিগত মৌসুমে বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর বিপরীতে সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ায় হতাশার মাত্রা আরও বেড়েছে। ফলে আলুকেন্দ্রিক খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং সুপার শপে সরবরাহের মাধ্যমে আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহারে কৃষি বিভাগ উদ্যোগ গ্রহণের দাবি আলু চাষিদের।
আরও পড়ুন: প্রতিদিন কমছে কৃষিজমি, সংকটে কৃষক
মুন্সিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩৪ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে ১০ লাখ ৯৭ হাজার ১৪৭ মেট্রিক টন আলু ফলনের আশা করা হয়। মাঠ পর্যায়ে এ পর্যন্ত আবাদকৃত জমির ৮০ শতাংশ জমির আলু উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে। এবছর জেলায় প্রতি হেক্টর জমিতে ৪২ থেকে ৪৩ মেট্রিকটন আলু উৎপাদিত হয়েছে। গত বছর জেলার ৬ উপজেলায় ৩৫ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছিল।
চাষিরা বলছেন, বিগত মৌসুমের বিপুল পরিমাণ লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই ধারদেনা করে উৎপাদন করা আলু এখন কৃষকের গলার কাঁটা। একদিকে খুচরা বাজারে দরপতন অপরদিকে মাঠে দেখা মিলছে না পাইকারের। এতে দিশেহারা কৃষক দাবি জানিয়েছেন দ্রুত বিদেশে রফতানির জন্য।
মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চম্পাতলা গ্রামের আলু চাষি জামাল মন্ডল বলেন, ৭ গন্ডা (৪৯ শতাংশ) জমিতে ৪ হাজার ৫০০ কেজি আলু উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে মানসম্মত প্রতিমণ আলু ৪৮০ হতে ৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, আর প্রতিমণ আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৫৫০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, বীজের এবার কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হয়েছে। গেল মৌসুমে বিপুল পরিমাণ লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই ধারদেনা করে উৎপাদন করা আলু এখন কৃষকের গলার কাঁটা। একদিকে খুচরা বাজারে দরপতন অপরদিকে মাঠে দেখা মিলছে না পাইকারের, ফলে লোকসান ঠেকাতে দ্রুত আলু বিদেশে রফতানির জোর দাবি জানাচ্ছি।
মহকালী ইউনিয়নের কেওয়ার নূরাইতলী এলাকার অপর কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, এবার সানসাই জাতের আলুর দেখতে যেমন সুন্দর ফলনও ভালো হয়েছে, তাই কৃষকরা ডায়ামন্ড, ভ্যানিলা জাতের আলুর আবাদ থেকে সরে এসেছে।
অভিজ্ঞ এ কৃষকের মতে, যারা বাক্স আলু (হল্যান্ড ডায়ামন্ড) ২য় দফায় রোপন করেছে কিংবা ব্রাক, এসিআই বিএডিসি বীজ রোপন করেছে তাদের ফলন ভালো হয়নি।
মহাকালী, রনছ এলাকার কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে ভুক্তভোগী কৃষক রমজান মাতবর ও সবুর আলী জানান, অনুকূল আবহাওয়া আর আলু গাছে পোঁকা-মাকড়ের সংক্রমণ না হওয়া সর্বোপরি কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হওয়াতে এ বছর আলুর ফলন বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছে।
তারা আরও বলেন, বছরের পর বছর লোকসান থেকে কৃষক বাঁচাতে হলে রফতানির বিকল্প নেই। এছাড়া এ জেলার পটেটোফ্লেক্স কারখানাগুলোও সচল করলে কৃষকরা দাম পাবেন।
অন্যদিকে এমন পরিস্থিতিতে কৃষক বাঁচাতে আলুর বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি আগামী মৌসুম ঘিরে বিকল্প কিছু নিয়ে ভাবছে জেলা কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. হাবিবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা করে বৈজ্ঞানিক পন্থা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সারের ডোজ প্রয়োগ করে চাষাবাদ করলে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব।
এই কর্মকর্তা বলেন, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে আলুর ফলন বেশ ক্ষতি হয়েছে। তাই মুন্সিগঞ্জের প্রধান ফসল আলুতে এবার কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন আশা করি। তিনি বলেন, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে টঙ্গীবাড়ি উপজেলায় আলুকেন্দ্রিক খাবার তৈরি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে, অন্যান্য উপজেলায়ও হবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএডিসি, ব্র্যাক, এসিআইসহ বিভিন্ন কোম্পানির আলু বীজ রোপনে সুনির্দিষ্ট কারিগরি নির্দেশনা থাকে, তা অনুসরণ না করায় কোনো কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আর প্রণোদনা প্রদান প্রক্রিয়াধীন।
তবে এ বছর বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত আলুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন আশা জাগানিয়া বার্তা নেই অধিদফতরের কাছে। অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে মুন্সিগঞ্জ জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন হতে পারে সাড়ে ১০ লাখ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টন।
প্রতিনিধি/জেবি