আসাদুজ্জামান লিমন
২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৮ এএম
বাংলাদেশে অফরোড অ্যাডভেঞ্চার সেগমেন্টের মোটরসাইকেল প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ এই সেগমেন্টের বাইকের চাহিদা রয়েছে তুঙ্গে। তরুণেরা এখন কমিউটার বাইক নিয়ে পার্বত্য এলাকার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু সড়কে ছুটে বেড়াচ্ছেন। তবে সেখানে গিয়ে নানা বিড়ম্বনায়ও পড়তে হচ্ছে। সাধারণ কমিউটার বাইক শহরের রাস্তায় দারুণ পারফরম্যান্স দিলেও পাহাড়ি বা গ্রামীণ খানাখন্দে পর্যাপ্ত স্বাচ্ছন্দ্য দেয় না। এসব বিষয় মাথায় রেখে হিরো সম্প্রতি এক্সপালস সিরিজে এনেছে দুটি অফরোড অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেল—এক্সপালস ২০০ ৪ভি ও এক্সপালস ২০০ ৪ভি প্রো।
দেশের বাজারে নতুন আসা এই দুটি বাইক নিয়ে তরুণদের আগ্রহের শেষ নেই। বিশেষ করে কেনার আগে টেস্ট রাইড দেওয়ার জন্য অনেকেই মুখিয়ে আছেন। অটোমোবাইল সাংবাদিকদের আগ্রহও এতে কম নয়। গণমাধ্যমকর্মীদের এই কৌতূহল মেটাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কলোনি বাজারসংলগ্ন লাল মাঠে (পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠ) বিশেষ টেস্ট রাইডের আয়োজন করা হয়। সেখানে অটোমোবাইলপ্রেমী সাংবাদিকেরা নতুন দুটি মডেল নিজে চালিয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নেন।
টেস্ট রাইড ও রাইডারদের অনুভূতি
বাইকে উঠে একজন অভিজ্ঞ চালক প্রথমেই ইগনিশন অন করে থ্রটল রেসপন্স যাচাই করেন। এক্সপালসের দুটি মডেলের থ্রটল রেসপন্স বেশ ভালো। ইঞ্জিনের গর্জনই এর শক্তির জানান দেয়, যার সঙ্গে রয়েছে ভালো এক্সিলারেশন। বাইকটির উচ্চতা কিছুটা বেশি মনে হলেও পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি বা তার বেশি উচ্চতার যেকোনো রাইডার এটি সহজে ও সাবলীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। সর্বোপরি, এর হ্যান্ডলিং ও কন্ট্রোলিং বেশ চমৎকার।
অটোমোবাইল সাংবাদিক ও মোটরসাইকেল চালক মাহবুব শরীফ তার কর্মজীবনে বিভিন্ন কোম্পানির নানা মডেলের মোটরসাইকেল চালিয়েছেন। হিরো এক্সপালস চালিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি অফরোড বা অ্যাডভেঞ্চারের জন্য সত্যিই দুর্দান্ত। তবে শুধু পাহাড়ি বা এবড়োখেবড়ো পথেই নয়, এটি শহরের মসৃণ সড়কেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে চালানো সম্ভব। কারণ, এতে ব্যবহার করা হয়েছে ডুয়েল পারপাস টায়ার। অন্যদিকে, এর এক্সহস্ট পাইপ বা সাইলেন্সারটি উঁচুতে থাকায় বর্ষার দিনে সড়কে জমে থাকা পানিতেও এটি অনায়াসে চালিয়ে নেওয়া যায়।’
আরেক অটোমোবাইল সাংবাদিক সুমন চৌধুরী জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে এমন একটি বাইকের অভাব অনুভব করছিলেন, যা দিয়ে একই সঙ্গে শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথে এবং ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়কে স্বাচ্ছন্দ্যে রাইড করা সম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে মোটরযান নিয়ে লেখালেখি করেন সুমন চৌধুরী। বাংলাদেশের বাজারে আসা প্রায় সব ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলই তিনি চালিয়েছেন। তবে এই প্রথম এ ধরনের ডুয়েল পারপাস অ্যাডভেঞ্চার অফরোড বাইক চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন তিনি। হিরো এক্সপালস চালানোর পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনে বহু মোটরসাইকেল চালানোর সুযোগ হয়েছে, তবে এই ক্যাটাগরির ডুয়েল পারপাস অ্যাডভেঞ্চার অফরোড বাইক এর আগে কখনো চালানো হয়নি। রাইড করার সময় এর ভারসাম্য, সাসপেনশন এবং অফরোড সক্ষমতা সত্যিই দারুণ লেগেছে। শহরের পিচঢালা পথ হোক কিংবা পাহাড়ি বা এবড়োখেবড়ো রাস্তা—সব জায়গাতেই এটি দারুণ কনফিডেন্স দেয়।’
আজ যারা টেস্ট রাইড দিয়েছেন, তাদের সবারই বক্তব্য, বাইকটির সাসপেনশন ও ব্যালান্সিং এতটাই চমৎকার যে রাস্তার খানাখন্দ বা ঝাঁকুনি তেমন বুঝতেই পারা যায় না। ভাঙা ও ইটের সোলিংয়ের গ্রামীণ রাস্তাতেও এটি ভালো রাইডিং অভিজ্ঞতা দেয়। কর্নারিং করাও সহজ। এর চমৎকার ব্যালান্সের কারণে বাইকটি কোনো ঝাঁকি বা খানাখন্দের মুখোমুখি হলে চালক ও পিলিয়ন কেউই সেই ঝাঁকি বা ধাক্কা তেমন অনুভব করেন না। বাইকটির ব্রেকিং সিস্টেম নিয়ে টেস্ট রাইডারদের ভাষ্য, এবিএস থাকায় ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতেও ভালোভাবে ব্রেক করা সম্ভব হয়।
এক্সপালস সিরিজের প্রযুক্তি ও ফিচার
বাংলাদেশের মোটরসাইকেলপ্রেমীদের জন্য অ্যাডভেঞ্চার রাইডিংয়ের নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে বিশ্বের বৃহত্তম মোটরসাইকেল ও স্কুটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিরো মোটোকর্প। দেশের বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়েছে জনপ্রিয় এক্সপালস সিরিজের দুটি নতুন মডেল—এক্সপালস ২০০ ৪ভি ও এক্সপালস ২০০ ৪ভি প্রো। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ১২ বছরের যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যুক্ত হলো। নতুন দুটি মডেল বাজারে আনার মাধ্যমে বাংলাদেশে অন-রোড ও অফরোড অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেল সেগমেন্টে নিজেদের পোর্টফোলিও আরও প্রসারিত করল হিরো মোটোকর্প। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক্সপালস প্ল্যাটফর্ম এখন বাংলাদেশের রাইডারদের জন্যও উন্মুক্ত করল প্রতিষ্ঠানটি।
তরুণ ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় রাইডারদের জন্য তৈরি এক্সপালস ২০০ সিরিজে দুর্গম পথে চলার সক্ষমতা, দৈনন্দিন ব্যবহারের সুবিধা এবং আধুনিক রাইডিং প্রযুক্তির সমন্বয় রয়েছে। এটি তৈরিতে হিরো মোটোকর্পের অ্যাডভেঞ্চার দর্শন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। দুটি মোটরসাইকেলে রয়েছে ১৯১.৬ সিসি বা ১৯৯.৬ সিসির ৪-ভালভ, সিঙ্গেল-সিলিন্ডার, অয়েল-কুলড ইঞ্জিন, যা ৮,৫০০ আরপিএমে ১৮.৯ বিএইচপি পাওয়ার এবং ৬,৫০০ আরপিএমে ১৭.৩৫ এনএম বা ১৭ নিউটন-মিটার টর্ক উৎপন্ন করে। এর সঙ্গে রয়েছে ৫-স্পিড ট্রান্সমিশন।
মূল ফিচার:
রেট্রো-মডার্ন ফুল এলইডি হেডলাইট, ক্লাসিক রাউন্ড ডিআরএল এবং উইন্ড ব্লাস্ট কমাতে র্যালি-স্টাইল উইন্ডশিল্ড। অফরোড ডিএনএ ফুটিয়ে তুলতে হাই-মাউন্টেড ফ্রন্ট মাডগার্ড, হ্যান্ডেলবারে সলিড নাকল গার্ড এবং ১৩ লিটারের ফুয়েল ট্যাংক। ইঞ্জিন সুরক্ষায় মেটাল স্কিড প্লেট বা প্রটেক্টিভ বাশ প্লেট এবং হাই-মাউন্টেড আপ-সুইপ্ট এক্সহস্ট। তিনটি এবিএস মোড—রোড, অফরোড ও র্যালি। ব্লুটুথ কানেক্টিভিটি, টার্ন-বাই-টার্ন নেভিগেশন, গিয়ার ইন্ডিকেটর এবং কল-এসএমএস অ্যালার্টসহ ফুল ডিজিটাল এলসিডি স্পিডোমিটার। দীর্ঘযাত্রার সুবিধার জন্য ইউএসবি চার্জার, নিরাপত্তার জন্য হ্যাজার্ড সুইচ এবং ব্যাগ বা লাগেজ বহনের জন্য হুকসহ লাগেজ প্লেট।
আরও পড়ুন: ১২৫ ও ১৫০ সিসির নতুন পালসার আনছে বাজাজ
এক্সপালস ২০০ ৪ভি (স্ট্যান্ডার্ড)
এটি প্রতিদিনের যাতায়াত ও হালকা ট্রেইল রাইডিংয়ের জন্য তৈরি। এতে রয়েছে ৮২৫ মিমি সিট হাইট, ২২০ মিমি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স, ১৫৯ কেজি ওজন এবং ১৯০ মিমি ফ্রন্ট সাসপেনশন ট্রাভেল। পেছনে রয়েছে ১৭০ মিমি ট্রাভেল মনোশক সাসপেনশন। এটি মেটালিক নেকলাস ব্লু হোয়াইট রঙে পাওয়া যাবে। ডেইলি রাইড ও উইকেন্ড ট্যুরিংয়ের জন্য এটি উপযোগী।
এক্সপালস ২০০ ৪ভি প্রো
এটি আরও বেশি অফরোড সক্ষমতা দেয় এবং হার্ডকোর অফরোডিংয়ের জন্য তৈরি। এতে রয়েছে প্রো অ্যাডজাস্টেবল সাসপেনশন, সামনে ২৫০ মিমি ও পেছনে ২২০ মিমি সাসপেনশন ট্রাভেল, ২৭০ মিমি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স, ৮৯১ মিমি সিট হাইট, ১৬১ কেজি ওজন, হ্যান্ডেলবার রাইজার, এক্সটেন্ডেড গিয়ার লিভার, লম্বা সাইড স্ট্যান্ড এবং অ্যান্টি-স্কিড ব্রেক প্যাডেল। এছাড়া এতে রয়েছে অ্যাগ্রেসিভ র্যালি ডিএনএ গ্রাফিক্স। এটি পার্ল ফেডলেস হোয়াইট রঙে পাওয়া যাবে।
বিক্রয় ও সার্ভিস সুবিধা
বাংলাদেশে নিলয় মোটরস লিমিটেডের মাধ্যমে হিরো মোটোকর্পের মোটরসাইকেল বাজারজাত করা হয়। বর্তমানে দেশজুড়ে ৫৩০টির বেশি অনুমোদিত সেলস ও সার্ভিস আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি নতুন মোটরসাইকেল কেনার সঙ্গে গ্রাহকেরা পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি ও ইন্স্যুরেন্স সুবিধা পাবেন।
আকর্ষণীয় এই দুটি বাইকের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্সপালস ২০০ ৪ভির দাম রাখা হয়েছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং এক্সপালস ২০০ ৪ভি প্রোর দাম ৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। যারা অফরোডিং এবং লং ট্যুর বা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য হিরো এক্সপালস ২০০ সিরিজ একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
এজেড/এআর