ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৭ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৮ এএম
রমজানের রোজা আত্মশুদ্ধি শিক্ষা দেয়। আর ঈদ সেই আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও সংযমের উত্তম পুরস্কার। তাই ঈদের দিন শুধু আনন্দে আত্মত্যাগ ও সংযমের মেতে ওঠা নয়; বরং আত্মদান, যাকাত প্রদান, ভ্রাতৃত্ব স্থাপন ও বিশ্বমানবতার প্রতি প্রেম প্রদর্শনই প্রকৃত কর্তব্য। কাজী নজরুল ঈদের এই গানটিতে ‘মন’-কে সম্বোধন করে আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ এটি বাহ্যিক নির্দেশ নয়, অন্তরের জাগরণ। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উদযাপন প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য অসাধারণ অনুভূতি। তাই রমজানের রোজার শেষে ঈদের খুশির দিনে মানুষের প্রতি মমত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। আত্মত্যাগের মাধ্যমেই মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি সম্ভব। এসব মহান আল্লাহরই অলংঘ্যনীয় নির্দেশ। অর্থ-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব, সোনা-দানা, রাজ-রাজত্ব, বালাখানা সব আল্লাহর রাহে কুরবানী করতে হবে। এখনকার মুসলিম জাতির বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের মূল সমস্যা হলো যথাযথভাবে যাকাত দেন না। কবির ভাষায়- যারা যাকাত দেন না তারা মুর্দা। অতএব যাকাতের বিধান সমাজ রাষ্ট্রে কায়েম করে মুসলিমের ঘুম ভাঙানোর প্রতি জোর দিয়েছেন কবি। আজ যে পবিত্র ঈদগাহে মুসলিমগণ নামাজ আদায় করবে সেই ঈদগাহে একদিন কাফির মুশরিকগণ পুজা-অর্চনা করতেন। এই স্বাধীন জমিন ও পবিত্র ঈদগাহের সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ধর্মযুদ্ধের সকরুণ ইতিহাস। সেই পবিত্র যুদ্ধে অনেকেই হয়েছেন শহীদ। আবার অনেকেই হয়েছেন-গাজী।
যুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করেই কবি আবার শান্তির কথা বলতে ভুলে যাননি। পরের চরণেই কবি বলেছেন-‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,/ তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ’। অর্থাৎ ইসলাম অর্থ শান্তি। কোনক্রমেই কেউ ভুল না করেন। এজন্যই কবি সচেতনভাবে বললেন, দোস্ত-দুশমন ভুলে যেতে। যুদ্ধ নয়। প্রেম দিয়েই বিশ্বকে ইসলামে দীক্ষিত করার তাগিদ দিয়েছেন। গরীব-দুঃখী, নিত্য-উপবাসী ও অসহায়, ইয়াতিম-মিসকিনকে তিনি দান করার কথা তুলে ধরেছেন। হৃদয়ে তৌহিদী বিশ্বাস লালনের মাধ্যমেই নবী মোহাম্মদ-এর ভালোবাসা ও শাফায়াত পেয়ে ধন্য হবেন মুসলিমগণ। শুধু যুদ্ধ যুদ্ধ নয়। ক্ষমা ও মাহাত্মই ছিলো মহানবীর মূল আদর্শ। এই কারণেই কবি নজরুলও বিখ্যাত এই গানের শেষ দুই চরণ ক্ষমা ও মহৎ কাজের অনুপ্রেরণায় শেষ করেছেন। কবির ভাষায়-‘তোরে/ মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা, সেই/ পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ’।
প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম রচিত ‘নজরুল নির্দেশিকা’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে- ‘৩ অক্টোবর ১৯৩২ সালে প্রকাশিত জুলফিকার (গানের সংকলন) সংগীতগ্রন্থে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়।’
কাজী নজরুল ইসলামের অমর ইসলামি সংগীত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে এক অনন্য সৃষ্টি। গানটি সৃষ্টির পর থেকে অদ্যাবধি এমন দ্বিতীয় একটি গান রচনা কারও পক্ষেই সম্ভব হয়নি। এমন কি এই গানের কাছাকাছি একটি গানও সৃষ্টি হয়নি। বলাবাহুল্য গান-কবিতার লেখক মাত্রই বিশেষত গীতিকবিগণের মনের গহীনের অন্যতম প্রত্যাশাই থাকে, ‘আহ্, এমন একটি গান যদি আমিও লিখতে পারতাম!’ গানটির বাণী সুমিষ্ট কথামালার অনন্য উৎস। সুচয়িত শব্দাবলি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিক ঘটনাসম্বলিত। মুসলিম জাতির ইতিহাস সমৃদ্ধ। এছাড়াও বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপট অনুযায়ী অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনামূলক এবং প্রবল সাহস উৎপাদক ও উৎসাহ ব্যঞ্জক। বস্তুত এই গানটিতে মুসলিম সমাজের আত্মশুদ্ধি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ত্যাগের বাণী বহনকারী চিরন্তন আহ্বান বিধৃত।
আরও পড়ুন
‘বিদ্রোহী’ কবিতা: সমকাল-দর্পণে
সমগ্র ব্রিটিশ আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭) উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ ছিলো নানা দিক থেকে পশ্চাৎপদ ও বিভক্ত। ঔপনিবেশিক শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষাগত অনগ্রসরতা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে মুসলমানগণ ছিলেন নিপীড়িত, নির্যাতিত, প্রবঞ্চিত, নিগৃহীত ও হতাশাগ্রস্থ। এই সমকালে মুসলিমগণ সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ছিলেন, পরাস্ত ও পরাধীন। পরিষ্কারভাবে বলা যায়, মুসলিমগণ ছিলেন হিন্দু-অধীন। এই প্রেক্ষাপটে নজরুল ইসলামী ভাবধারাকে মানবতাবাদী ও বিপ্লবী চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেন। যে মুসলমানগণ মনে করতেন, ইসলাম কেবল আচার-অনুষ্ঠানের ধর্ম। তাদেরকে নজরুল শেখাতে সমর্থ হন যে, ইসলাম সাম্য, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। ইসলাম সর্বৈবভাবে সর্বাস্থায় অসাম্প্রদায়িক ও অবিসংবাদিতভাবে শান্তিকামী। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি সেই চেতনারই জ্যোতির্ময় বহিঃপ্রকাশ। জাতিস্বর প্রমাণও বটে। পশ্চাৎপদ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে জাগিয়ে তোলার জন্য ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটির বিকল্প নেই। জাতীয় জীবনে অসাধারণ অবদান রাখতে পারার কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে।
যেমন-অপরূপ ছন্দ। সুন্দর কথামালা। সুললিত কণ্ঠ। আরকেটি শাশ্বত সুর। এসব মিলে চিরকাল সঙ্গীত হয় অমর-অক্ষয় ও চিরস্থায়ী। কালে কালে শিল্পীর পরিবর্তন আসে। স্বরভঙ্গ রোগে সুরের বিবর্তন হয়। কিন্তু গানের কথার পরিবর্তন হয় না। যুগের চাহিদা মেটানোর তথাকথিত কারণে অনেক সময় পুরাতন সুরকে ভেঙ্গে নতুন সুরে পুরাতন গান গাওয়া হয়। তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই কোনো একটি সুনির্দিষ্ট গানের মৌলিক, প্রথম বা প্রারম্ভিক সুর থেকে অধিকতর খারাপ হয়। বৈচিত্র্য হারায়। যথাযথভাবে হৃদয়কে আলোড়িত করতে পারে না। যা গানের কথা আর মাধুর্যকেই শুধু বিনষ্ট করে না, সাথে সাথে সঙ্গীত তার সুরমূর্ছনার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। তাই গানের কথার শিল্পী যিনি তিনি যদি সুর করেন তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই সংগীত হয়ে ওঠে চিরন্তন উপভোগ্য। লালিত্যময়। হৃদয়ের চাহিদামতো সুন্দর ছন্দে সমুজ্জল। সর্বোপরি গানটি দেশ কালের সীমানা ছাড়িয়ে কালজয়ী হয়ে ওঠে।
গানের কথার মাঝে গীতিকার ফুল, পাখি, রাতের নীরবতা, আকাশের ঝিলিমিলি তারকারাজি, পূর্ণিমার চাঁদ অর্থাৎ প্রকৃতিকে টেনে এনে সংগীত পিপাসুদের অপার তৃষ্ণা নিবারণ করেন। আবার অনেক সময় ইতিহাস-ঐতিহ্যকে টেনে এনে কোনো জাতির জাতীয় চেতনাকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। সেই চেতনা হতে হয় অবশ্য অসাম্প্রদায়িক। শুধু মানুষের জন্য। সব গানই যে নিছক আবেগ থেকে লেখা হয়, তাও নয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাঁর সকল গানে প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, দেশপ্রেমসহ ইতিহাস ঐতিহ্যকে স্মরণ করেছেন বার বার। নদী-সাগরে সাঁতার কাটার মতো কাজী নজরুলের সংগীত ভুবনে অনেকেই সাঁতার কাটেন। কিন্তু তাঁর লেখার মর্ম অনেকেই বুঝতে চান না। আবার অনেকে বুঝতে পারলেও উপলব্ধি করেন না। আর যারা উপলব্ধি করেন তারা সুকৌশলে দ্বিবিভাজিত হয়ে যান।
এক পক্ষ তাঁর প্রবল ভক্ত হয়ে যান। আর একপক্ষ বিপক্ষে চলে যান। অনেকেই নীরবে বিরুদ্ধাচরণ করেন। আর সুযোগ বুঝে বিভিন্নভাবে আঘাত হানেন। তাদের বিরোধিতা কাজী নজরুলের গানের সাথে নয়; বরং আদর্শগত। কারণ তাঁকে মৌলবাদিরা ভাবতেন নাস্তিক আবার নাস্তিকেরা ভাবতেন মৌলবাদি। গানটির প্রথম শিল্পী ছিলেন আব্বাস উদ্দীন আহমাদ। এই গানটি রচনার ইতিহাস বেশ মজার। এবং গানটি খনিকটা সাম্প্রদায়িক পীড়নের শিকার। আব্বাস উদ্দীন আহমাদ, ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন,
‘একদিন কাজিদাকে বললাম, ‘কাজিদা, একটা কথা মনে হয়। এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কালু কাওয়াল এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়, এই ধরনের বাংলায় ইসলামি গান দিলে হয় না? তারপর আপনি তো জানেন কীভাবে কাফের কুফর ইত্যাদি বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাংক্তেয় করে রাখবার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে একদল ধর্মান্ধ। আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান’।

আব্বাস উদ্দীনের এই পরামর্শ কবি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করলেন। কিন্তু গান কম্পজিশনের জন্য স্টুডিও প্রয়োজন। আর তৎকালে মুসলিমদের স্টুডিও ছিলো না। ফলে গান কম্পজিশনের জন্য হিন্দুদের দ্বারস্থ হতে হতো। কাজী নজরুলের বিভিন্ন আঙ্গিকের গান তখন ভগবতী বাবুর স্টুডিওতে রেকর্ড হতো। তাই আব্বাস উদ্দীনের ইসলামী গান লেখার প্রস্তাবে নজরুল বললেন, ‘আব্বাস, তুমি ভগবতী বাবুকে বলে তার মত নাও, আমি ঠিক বলতে পারব না’।
কাজী নজরুলের পরামর্শ অনুযায়ী আব্বাস উদ্দীন আহমদ ভগবতী ভট্টাচার্য অর্থাৎ গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করতে গেলেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ভগবতী ইসলামী সংগীত রেকর্ডের কথা শুনে প্রচণ্ড রেগে গেলেন। সেই বিষয়টি আব্বাস উদ্দীনের নিজের বাণীতে এইরূপ- ‘আমি ভগবতী ভট্টাচার্য অর্থাৎ গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইন-চার্জকে বললাম। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘না না না ওসব গান চলবে না। ও হতে পারে না’। মনের দুঃখ মনেই চেপে গেলাম’। এরপরও আব্বাস উদ্দীন আহমাদ নাছোড় বান্দা। দুটি কারণে- এক. ইসলাম প্রীতি। আরেকটি কাজী নজরুলকে উগ্র ধর্মান্ধ সম্প্রদায় হতে মুক্তি দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা। তাই তিনি ভগবতী বাবুর পেছনে লেগেই থাকলেন।
‘ওমন রমজানের ঐ রোজার শেষে গানটি প্রায় ৯৫ বছর ধরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। এর সুর, কথা ও গায়কী সব মিলে এক অনবদ্য সৃষ্টি। কিন্তু গানটি লিখতে কবির সময় লেগেছিল মাত্র ৩০ মিনিট। এবং কবির পূর্ব মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াই কবি গানটি রচনা করেন। কবি উন্দুবালাকে গান শেখাচ্ছিলেন। এমন সময় আব্বাস উদ্দিন আহমাদ সেই কক্ষে প্রবেশ করেন এবং ইসলামী গান প্রচারের প্রতিবন্ধকতা নিরসন হয়েছে মর্মে জানান। কবি সাথে সাথে ইন্দুবালাকে ছুটি দিয়ে দেন। এবং গান রচনায় মনোনিবেশ করেন। আব্বাস উদ্দিন আহমদের স্মৃতিতে ঘটনাটি এই রূপ: এর প্রায় ছ-মাস পরে। একদিন দুপুরে বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি অফিস থেকে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ঘরে গিয়েছি। দেখি একটা ঘরে বৃদ্ধা আশ্চর্যময়ী আর বৃদ্ধ ভগবতীবাবু বেশ রসাল গল্প করছেন। আমি নমস্কার দিতেই বৃদ্ধ বললেন, ‘বসুন বসুন’। আমি বুদ্ধের রসাপ্লুত মুখের দিকে চেয়ে ভাবলাম, এই-ই উত্তম সুযোগ। বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করেন তা হলে বলি। সেই যে বলেছিলাম ইসলামি গান দেওয়ার কথা, আচ্ছা, একটা এক্সপেরিমেন্টই করুন না, যদি বিক্রি না হয় আর নেবেন না, ক্ষতি কি’? তিনি হেসে বললেন, ‘নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি, আচ্ছা আচ্ছা করা যাবে’।
শুনলাম পাশের ঘরে কাজিদা আছেন। আমি কাজিদাকে বললাম যে ভগবতীবাবু রাজি হয়েছেন। তখন সেখানে ইন্দুবালা কাজিদার কাছে গান শিখছিলেন। কাজিদা বলে উঠলেন, ‘ইন্দু তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সঙ্গে কাজ আছে'। ইন্দুবালা চলে গেলেন। এক ঠোঙা পান আর চা আনতে বললাম দশরথকে। তারপর দরজা বন্ধ করে আধঘণ্টার ভিতরই লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’। তখুনি সুরসংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন। পরের দিন ঠিক এই সময় আসতে বললেন। পরের দিন লিখলেন, ‘ইসলামের ওই সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’।
গান দু-খানা লেখার ঠিক চারদিন পরেই রেকর্ড করা হল। কাজিদার আর ধৈর্য মানছিল না। তাঁর চোখেমুখে কী আনন্দই যে খেলে যাচ্ছিল। তখনকার দিনে যন্ত্র ব্যবহার হত শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দু-খানা আমরা তখন মুখস্থও হয়নি। তিনি নিজে যা লিখে দিয়েছিলেন, মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর ঠিক আমার চোখ বরাবর হাত দিয়ে কাজিদা নিজেই সেই কাগজখানা ধরলেন, আমি গেয়ে চললাম। এই হল আমার প্রথম ইসলামি রেকর্ড। দু-মাস পরে ঈদুল ফেতর। শুনলাম গান দু-খানা তখন বাজারে বের হবে’।
গানটি ১৯৩২ সালের জুলফিকার গ্রন্থে প্রকাশিত হলেও গানটি লেখা ১৯৩১ সালে। গানটি রচনার চারদিনের ভেতর রেকর্ড হয়। হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) কোম্পানির রেকর্ড নম্বর এন- ৪১১১। ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে গানটির প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ। গানটি প্রচার হতেই (অন-এয়ার) তা ভাইরাল হয়ে গেলো। অসাধরণ কথামালার সাথে অনিন্দ্য সুর ও সুমিষ্ট আকর্ষণীয় গায়কী গানটিকে সর্বস্তরের শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়। এখনকার যুগে যেকোন তথ্য-সংবাদ বা সংগীত যতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সম্ভব, তৎকালে তা না থাকলেও ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি অধুনা তথ্যপ্রযুক্তির যুগের মতোই ভাইরাল হয়ে যায়। গানটি কতোটা মানুষের মন জয় করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় গানটির কণ্ঠশিল্পীর জবানিতে-
ঈদের বন্ধে বাড়ি গেলাম। বন্ধের সঙ্গে আরও কুড়ি-পঁচিশ দিন ছুটি নিয়েছিলাম। কলকাতা ফিরে এসে ট্রামে চড়ে অফিস যাচ্ছি। ট্রামে একটি যুবক আমার পাশে গুন গুন করে গাইছে, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’। আমি একটু অবাক হলাম। এ গান কী করে শুনল? অফিস ছুটির পর গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়েছি, মাঠে বসে একদল ছেলের মাঝে একটি ছেলে গেয়ে উঠল... ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে। তখন মনে হল এ গান তো ঈদের সময় বাজারে বের হওয়ার ‘কথা। বিভূতিদার দোকানে গেলাম। আমাকে দেখে তিনি একদম জড়িয়ে ধরলেন। সন্দেশ, রসগোল্লা, চা এনে বললেন, ‘খাও’। আমার গান দুটো এবং আর্ট পেপারে ছাপানো আমার বিরাট ছবির একটা বাণ্ডিল সামনে রেখে বললেন, ‘বন্ধু-বান্ধবদের কাছে বিলি করে দিও। আমি প্রায় সত্তর আশী হাজার ছাপিয়েছি, ঈদের দিন এসব বিতরণ করেছি। আর এই দেখো দু-হাজার রেকর্ড এনেছি তোমার’।

আনন্দে খুশিতে মন ভরে উঠল। ছুটলাম কাজিদার বাড়ি। শুনলাম তিনি রিহার্সেল রুমে গেছেন। গেলাম সেখানে। দেখি দাবা খেলায় তিনি মত্ত। দাবা খেলতে বসলে দুনিয়া ভুলে যান তিনি। আমার গলার স্বর শুনে একদম লাফিয়ে উঠে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আব্বাস তোমার গান কী যে’ আর বলতে দিলাম না, পা ছুঁয়ে তাঁর কদমবুসি করলাম। ভগবতী বাবুকে বললাম, ‘তা হলে এক্সপেরিমেন্টের ধোপে টিকে গেছি, কেমন’? তিনি বললেন, ‘এবার তাহলে আরও ক-খানা এই ধরনের গান...’ খোদাকে দিলাম কোটি ধন্যবাদ’।
গানটির তাল, লয়, মাত্রা, অনিন্দ্যসুন্দর। সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাণী ও সুরের মেল বন্ধন পানিতে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মতোই। তাই এটি অপূর্ব কথামালা এবং উৎকৃষ্ট সুরে সঙ্গীত হিসেবে টিকে থাকার জন্য সুবিবেচনা প্রসূত। তারপরও সবকালেই কিছু কিছু শ্রোতা-পাঠক লেখকের উপর অভিমানে অভিন্ন জ্ঞানগর্ভ কথার সারমর্ম বলেন। কিন্তু গানটি গীত হলে পরে, এই আলোচক সমালোচকের কাছেও অসম্ভব সুন্দর লাগে। সুরমূর্ছনায় বিহ্বল হন না, এমন শ্রোতা নাই বললেই চলে। আলোচ্য গানটির স্থায়ী হচ্ছে -
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন্ আসমানী তাগিদ।’
রমজান মাসের একমাস সিয়াম সাধনার পর আসে খুশির ঈদ। সাবলীলভাবে তিনি এটি তুলে ধরেছেন। চিরাচরিত সময়কে তিনি উল্লেখ করেছেন। কোন ব্যঞ্জনা এবং অতিরেক ব্যতীতই তিনি সহজ-প্রাঞ্জল বাক্য দিয়েই শুরু করেছেন, গানের প্রথম চরণ। কোন বিশেষণ বা বিশেষণের অতিশায়ন তিনি ব্যবহার করেননি। কারণ সিয়াম সাধনার সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিশে আছে লক্ষ লক্ষ বছরের আবেগ, প্রেম, আনুগত্য ও তাক্বওয়া। দ্বিতীয় চরণে আসছে ‘তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন্ আসমানী তাগিদ।’ এখানে তিনি মানুষকে আসমানী নির্দেশ মানার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। আর তা হলো, নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে ভালোবাসার শাশ্বত নির্দেশ।‘ভোগের চেয়ে ত্যাগেই প্রকৃত শান্তি’। তাই কবি ঈদের দিনে আত্মত্যাগে বলিয়ান জাতি গঠনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। এসবই এক আল্লাহর নির্দেশ। এক আল্লাহতে বিশ্বাস এবং তার নির্দেশ মানার একান্ত তাগিদ। এক আল্লাহর নির্দেশ মানলেই পৃথিবীটা সুন্দর হতে পারে। তার পরের চরণে কবি বলেন,
‘তোর সোনাদানা বালাখনা সব রাহে লিল্লাহ
দে জাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ।’
এখানে ইসলামের আরেক সাম্যের বাণী উল্লেখ করা হলো। সোনা দানা, শান শাওকাত যা আছে এসবই তো আল্লাহর রাহে কোরবান করতে হবে। কারণ এসবই তো তারই সৃষ্টি এবং তাকেই দাসত্ব করতে হবে। তিনি কাউকে আমীর আবার কাউকে ফকির বা মিসকিন করতে পারেন কিন্তু ধনীর ধনসম্পদে, বিত্ত বৈভবে আছে ফকির মিসকিন গরিবের- আল্লাহ প্রদত্ত আইনগত অধিকার। আল্লাহই দিয়েছেন এই সোনাদানা বালাখানা, আবার তিনিই নির্দেশ দিচ্ছে যাকাত, ফিতরা দাও। ‘তোমার যা আমি দিয়েছি তাতে তোমার প্রতিবেশির হক আছে। অতএব মুসলমান যারা তারা সচেতন হও।’
আল্লাহর এই নির্দেশকে সুন্দর, সাবলীল এবং সুর-ছন্দের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জানিয়ে গেলেন কী অমীয় গান! যেখানে তিনি মুসলিমকে মুর্দা বলেছেন। কারণ মুসলমান যদি জীবিত থাকতো, তাহলে আর যাই হোক দেশে কিংবা সমগ্র বিশ্বে দুর্নীতি, অপশাসন, অত্যাচার, নির্যাতন, অভাব-অনটন, দুর্ভিক্ষ লেগে থাকতো না। সৌদী আরব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে এখন যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরাও যদি আল্লাহর নির্দেশ মতো সবাই যাকাত প্রদান করি তাহলে দারিদ্র-পীড়িত মানুষ দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত থেকে মুক্তি পাবে। যদি ঠিকমত যাকাত দেওয়া হয়, তাহলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য অবসান হবে এই কথা হলফ করে না বলা গেলেও এই কথা সুষ্পষ্ট করে বলা যায় যে, অনেকাংশেই তা কমে আসবে। এবং একটা সময় আসবে যখন যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া মুসকিল হবে। মুসলমান আজ কি ধ্বংসের নেশায় আসক্ত। নির্বল নিদ্রামগ্ন সহায়-সম্বলহীন এক জাতি। কিন্তু কবি বলেছেন, তোমার ঘুম ভাঙো। জেগে ওঠো। ঠিকমত আল্লাহর বিধান মেনে চলো, দেখবে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমাদের দেশে সম্পদ এক শ্রেণির পুঁজিবাদীদের হাতে বন্ধী। তারা যাকাত দেয় না। আল্লাহর আইনকে অমান্য করে। আবার সরকারকে ট্যাক্সও দিতে চায় না। বোধকরি একশ বছর আগে নজরুল তা উপলব্দি করেছিলেন বলেই এমন গান তিনি লিখে গেলেন। আর তাই এই গানের মাধ্যমে তিনি মুসলামানকে জেগে ওঠার আহ্বান করেছেন। এর পরের চরণ
‘আজ তুই পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদ গাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।’
এখানে ঈদের জামাতের ময়দানের সাথে তিনি গাজী এবং শহীদের ইতিহাস টেনে এনেছেন। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোন পরিস্থিতিতে, কোন প্রেক্ষাপটে, কি কারণে এবং কেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিলো। আরবের তৎকালীন মানবতা এমনই শোচনীয় ছিলো, যে-কোন বিবেকবান সচ্চরিত্রের মানুষ ক্ষমতাসীন মোড়ল মাতব্বর এবং তথাকথিত নেতাদের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারতেন না। মানব ইতিহাসে আইয়্যামে জাহেলিয়া অত্যন্ত নিকৃষ্ট যুগ ছিলো। জাহেলী যুগ বলতে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী আরব সমাজের সময়কালকে বোঝায়। সাধারণভাবে এটি ষষ্ঠ শতাব্দীর আরবের সামাজিক-ধর্মীয় অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও নৈতিক অবক্ষয়ের যুগ হিসেবে পরিচিত। এই যুগের অবসান ঘটে যখন মুহাম্মদ (সা:) নবুয়ত লাভ করেন এবং ইসলামের শিক্ষা প্রচার শুরু করেন। আরবি শব্দ ‘জাহেলিয়াত’ অর্থ অজ্ঞতা বা অবিদ্যা। তাই জাহেলী যুগ বলতে এমন এক সময়কে বোঝায় যখন মানুষ সত্য ধর্ম, নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলো। এই যুগে আরব সমাজে গোত্রভিত্তিক বিভাজন, মূর্তিপূজা, নারীর প্রতি অবমাননা এবং নানা সামাজিক অনাচার প্রচলিত ছিলো। কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া, পিতার মৃত্যুর পর মাকে বিবাহ করার জন্য ভাই ভাই লড়াই করতো তারা। গর্ভবতী নারীর প্রসবের সময় এলে জীবন্ত অবস্থায় পেট ফুটো করে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠতো।
এমন মহাদুঃসময়ে মহানবী (সা.) এসব কাজের বিরুদ্ধাচারণ করলেন এবং এই সমস্ত বিভিন্ন কারণে কাফেররা তার উপর জুলুম নির্যাতন শুরু করে দিলো। সময়ের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে তিনিও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন। সেই ধর্মযুদ্ধে অনেকেই হয়েছেন শহীদ। আবার যাঁরা যুদ্ধে বেঁচেছিলেন তাঁরা হয়েছেন গাজী। কিন্তু একটিমাত্র যুদ্ধেই সমস্যার সমাধান না হওয়ায় অনেকেই অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এবং একাধিকবার গাজী হয়ে ফিরে আসার পরও আবার শহীদ হয়েছেন। তারপর পেয়েছেন স্বাধীন মানবিক জমিন। স্বাধীন ভূখণ্ড। শান্তির ময়দান পাওয়া গিয়েছে। যেখানে হচ্ছে আজ ঈদের নামাজ। একসময় যে ময়দানে চলতো কাফের আর মুশরিকদের দৌরাত্ম, সেই ময়দান আজ মুসলমানদের অধীন। সেই ইতিহাস মুসলমান জাতি জানে না। তাই নজরুল সেই ইতিহাস টেনে এনেছেন। জানো মুসলিম। জেনে জাগো। সময় হয়েছে জেগে উঠার। আজ অনেকেই ধর্মের লেবাস পোশাক পরে জীবন দেওয়াটাকে শহীদ হওয়া মনে করেন। অথবা আত্মঘাতী হামলা করে শহীদ হবেন বলে মনে করেন। আসলে এভাবে আত্মঘাতী কাজ করলে শহীদের দরজা নয় বরং আত্মহত্যার দরজা মিলবে।
এভাবে তিনি গানটিতে মুসলিমদের অতীতের ইতিহাস, জাজ্বল্যমান ইতিহাস, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, অসাম্প্রদায়িকতা, দান খয়রাত করার তাগিদসহ মুসলমানদের বর্তমান ও অতীত সমস্যার কথা অত্যন্ত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। ছন্দে ছন্দে গানের আনন্দে আমরা সেগুলো শিখতে পেরে সত্যিই ধন্য। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান সব ধর্মের এবং সকল মতাদর্শের মানুষ গানটি শুনে আনন্দ পান। সুখ অনুভব করতে পারেন। কিন্তু মুসলমানদের গানটি বুঝে শোনা দরকার। অথবা শুনে বোঝা দরকার। তবেই কবির আসল আবেদন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে। আবার সুন্দর হয়ে উঠবে সমাজ। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না। থাকবে না কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীর দৌরাত্ম। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য কমে আসবে। কবির সকল আবেদন সেদিন সার্থক হবে।
প্রথম পঙক্তিতে অতিপর্ব দুই মাত্রার। এটি সচেতনভাবেই সৃষ্ট। কারণ এখানে মানানসই একমাত্র অতিপর্ব খুবই বিরল। কতটা বিরল তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করা যায়। যেমন এখানে ‘ও মন’ বলা হয়েছে। এটি দুই মাত্রা। অন্য সকল ক্ষেত্রে ‘তুই’ ‘তোর’ ‘দে’ ‘আজ’ ‘যে’ ‘ঢাল’ একমাত্রা বিশিষ্ট অতি পর্ব দেখা যায়। প্রথম পঙক্তিতে অতিমাত্রা হিসেবে কবি ‘ও মন’ এর পরিবর্তে শুধু ‘মন’অথবা ‘ও’ অথবা ‘হে’ অথবা অন্য কোন বর্ণ বা শব্দ দিয়ে গানটি শুরু করতে পারতেন। কিন্তু সেটি এই সংগীতের সাথে মানানসই হতো না। অনিবার্যভাবে সেটি পরিত্যক্ত বলে গণ্য হতো। কারণ সুরের মৌলিকত্ব, প্রগাঢ়ত্ব, বিশেষত্ব এবং মাধুর্য সৃষ্টির জন্য মনকে নাড়া দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো। কবি তা সচেতনভাবেই করেছেন। তাই দুই পর্ব হলেও কবি সচেতনভাবে ‘ও মন’ দিয়ে একটি চঞ্চল সুরের সূত্রপাত করেছেন। নিঃসন্দেহে কবি মানুষের মনমতি বুঝেই গীতগতির সঞ্চার করেছেন। সরঃবৃত্ত ছন্দ এমনি গতিময়। গানের শুরুতেই মনের ব্যবহার মনকে আকৃষ্ট করে দারুণভাবে। ‘মন’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলায় নজরুলের আগে পরে বহু গান সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় সকল গানই সুখশ্রুত্য।
(ও মন) রমজানের ঐ/ রোজার শেষে/ এলো খুশির/ ঈদ, (২)+৪+৪+৪+১=১৫
(তুই) আপনাকে আজ/ বিলিয়ে দে,/ শোন আসমানী/ তাগিদ। (১)+৪+৪+৪+২=১৫
(তোর) সোনা-দানা,/ বালাখানা/ সব রাহে লিল/লাহ, (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(দে) যাকাত, মুর্দা/ মুসলিমের আজ/ ভাঙাইতে/ নিঁদ।। (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(আজ) পড়বি ঈদের/ নামাজ রে মন/ সেই সে ঈদগা/হে, (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(যে) ময়দানে সব/ গাজী মুসলিম/ হয়েছে শ/হীদ।। (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(আজ) ভুলে যা তোর/ দোস্ত-দুশমন,/ হাত মেলাও হা/তে, (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(তোর) প্রেম দিয়ে কর/ বিশ্ব নিখিল/ ইসলামে মু/রিদ।। (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(যারা) জীবন ভরে/ রাখছে রোজা,/ নিত্য উপ/বাসী, (২)+৪+৪+৪+২=১৬
(সেই) গরীব ইয়াতীম/ মিসকিনে দে/ যা কিছু মু/ফিদ।। (১)+৫+৪+৪+১=১৫
(ঢাল) হৃদয়ের তোর/ তশতরীতে/ শিরনি তৌ/হিদের, (১)+৪+৪+৪+২=১৫
(তোর) দাওয়াত কবুল/ করবেন হজরত/ হয় মনে উম/মীদ।। (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(তোরে) মারল ছুঁড়ে/ জীবন জুড়ে/ ইট পাথর যা/রা, (১)+৪+৪+৪+১=১৪
(সেই) পাথর দিয়ে/ তোলরে গড়ে/ প্রেমেরই মস/জিদ।।(১)+৪+৪+৪+১=১৪

৭ চরণের এই গানটির প্রতিটি পঙক্তিতে ১৪-১৬ মাত্রা বিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। স্থায়ীতে প্রতিটি পঙক্তি ১৫ মাত্রাবিশিষ্ট। তবে প্রথম পঙক্তিতে অতিপর্ব ২মাত্রা বিশিষ্ট হলেও দ্বিতীয় পঙক্তিতে অতিপর্ব ১ মাত্রার। কিন্তু প্রথম পঙক্তির অপূর্ণ পর্ব ১ মাত্রার হলেও দ্বিতীয় পঙক্তির অপূর্ণ পর্ব ২ মাত্রা সম্বলিত। সব মিলে প্রথম ও দ্বিতীয় পঙক্তির প্রত্যেকটিতে সর্বমোট ১৫টি মাত্রা বিদ্যমান। প্রথম- তৃতীয় অন্তরা পর্যন্ত প্রত্যেক পঙক্তির মাত্রা বিন্যাস (১)+৪+৪+৪+১=১৪। অর্থাৎ এখানে অতিপর্ব ১ মাত্রা এবং অপূর্ণ পর্ব ১ মাত্রা বিশিষ্ট। চতুর্থ ও পঞ্চম অন্তরার পঙক্তির মাত্রা বিন্যাস যথাক্রমে (২)+৪+৪+৪+২=১৬; (১)+৫+৪+৪+১=১৫; (১)+৪+৪+৪+২=১৫; (১)+৪+৪+৪+১=১৪। অর্থাৎ, চতুর্থ অন্তরার প্রথম পঙক্তির মাত্রা সংখ্যা ১৬ হলেও দ্বিতীয় পঙক্তির মাত্রা সংখ্যা ১৫। চতুর্থ অন্তরার প্রথম পঙক্তির অতিপর্ব ও অপূর্ণ পর্বের মাত্রা সংখ্যা ২ হলেও দ্বিতীয় পঙক্তির অতিপর্ব ও অপূর্ণ পর্বের মাত্রা সংখ্যা ১। মাত্রাবিন্যাসের এই সামান্য হেরফের হতেই পারে। এতে এমন চঞ্চল সুরের কোনো বিচ্যুতি ঘটে না। তবে চতুর্থ অন্তরার প্রথম পঙক্তির শেষ শব্দটি ‘উপবাসী’ যা মাত্রা বিশ্লেষণে ৪ মাত্রার হলেও সুরের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ‘পো’ কে এক মাত্রার মতো সময় দিয়েছেন। যে কারণে বর্ণিত পঙক্তিও ১৫ মাত্রার সমান সময় পেয়েছে। শেষ অন্তরার মাত্রা বিন্যাস প্রথম-তৃতীয় অন্তরার অনুরূপ।
প্রত্যেকটি পঙক্তির প্রতিটি পর্ব ৪ মাত্রা হলেও চতুর্থ অন্তরার শেষ পঙক্তির প্রথম পর্বটি ৫ মাত্রাবিশিষ্ট। গাণিতিক হিসেবে এর বাইরে গানটির কোন ছন্দগত ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয় না।
সাহিত্য ও সংগীতে নন্দনতত্ত্ব (Aesthetics) বলতে সাধারণত শব্দ-বাক্যের বাহ্যিক ও অন্তরস্থ সৌন্দর্য, অনুভূতি, রস, সুর ও ভাবের সম্মিলিত শিল্পরূপকে বোঝায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত ও গীত বহু গান আছে, যার মধ্যে অন্যতম ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ ইসলামী ভাবধারার এই গানটি মূলত ঈদের আনন্দ, আত্মত্যাগ, মানবতা এবং সাম্যের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। নন্দনতত্ত্বের আলোকে গানটির আলোচনা করলে এর নান্দনিক সৌন্দর্য, রস, চিত্রকল্প ও মানবিক আবেদন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নন্দনতত্ত্ব হলো শিল্পের সৌন্দর্য উপলব্ধির অনুপম দর্শন। সংগীতে এই সৌন্দর্য প্রকাশ পায় সুর, ভাষা, ছন্দ, ভাব, রস ও আবেগের সমন্বয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম তার ইসলামী সংগীতে ধর্মীয় চেতনা ও মানবিক আবেগকে এমনভাবে মিশিয়েছেন, যা কেবল ধর্মীয় অনুভূতিই নয়, বরং একটি গভীর নান্দনিক অভিজ্ঞতাও সৃষ্টি করে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটির শব্দ-বাক্য, সুর, তাল, লয়, মাত্রা, রূপ-রস, ভাব-বিভাব-অনুভাব এই নান্দনিক ঐতিহ্যের একটি অনন্য উদাহরণ। এখানে ঈদের আনন্দ কেবল উৎসবের আনন্দ নয়, বরং ত্যাগ ও মানবতার নিরুপম সৌন্দর্যের অনবদ্য প্রকাশ। নন্দনতত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রস। বাংলা কাব্যতত্ত্বে ‘রস’ বলতে শিল্পের মাধ্যমে মানব-মনের অনুভূতির পরিপূর্ণ আস্বাদনকে বোঝায়। এই গানে প্রধানত ৩ ধরনের রস লক্ষ্য করা যায়। ১. আনন্দ রস: গানটি ঈদের আনন্দের ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ এখানে ১ মাস সিয়াম পালন শেষে ঈদের আগমন মুমিন মুসলমানের মনে অপার আনন্দের দারুণ অনুভূতি সৃষ্টি করে। এই আনন্দ ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিক। এই গানটির নিবেদন নিঃসন্দেহে সামাজিক। এটি সীমাবদ্ধ নয়। অসীম আনন্দের উৎস।
২. সামাজিক করুণা ও সহমর্মিতার রস: গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ- ‘তোর সোনা-দানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ/ দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ।’ এখানে দরিদ্র মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও দানশীলতার আহ্বান রয়েছে। এই দানশীলতার মাঝে ইসলামিক আইনের বিষয়টি সন্নিবিষ্ট হয়েছে। কারণ যাকাত ও ফিতরা প্রদানের বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে নির্দিষ্টহারে দেওয়ার নির্দেশ আছে। এই অংশটি মানবিক করুণা নয়, বরং ইসলামী আইনের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। এটি করুণ রস হিসেবে পরিচিত। ৩. ভক্তি রস: গানটিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি আনুগত্য ও ধর্মীয় অনুভূতি স্পষ্ট। ঈদের নামাজ, যাকাত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ভক্তির নান্দনিক রূপ ফুটে উঠেছে। ‘সব রাহে লিল্লাহ’, ‘তৌহিদ’, ‘শহীদ’, ‘মুফিদ’, শব্দাবলি মূলত মহান আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিশ্বাসের সহিত সম্পর্কিত। প্রেম-ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি ভক্তির অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুতরাং এটি ঐশ্বরিক ভক্তিরস।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কাব্যে চিত্রকল্প ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। এই গানেও আমরা সুন্দর চিত্রকল্প দেখতে পাই। গানটি শোনার সময় ঈদের দিনের কোলাহলময় স্মৃতি, কোলাকুলি, স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশ, যাকাত-ফিতরা আদায়ের স্মৃতি এবং শহীদ-গাজী ও যুদ্ধ-বিগ্রহের স্মৃতি চোখে ভেসে ওঠে। যেমন: ঈদের আনন্দকে আসমানি তাগিদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দান-খয়রাতকে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই গানটির ভাষা অত্যন্ত সহজ, আবেগময় ও সংগীতধর্মী। এতে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার ইসলামী সংস্কৃতির আবহ তৈরি করেছে। শব্দবৈচিত্র্য গানটিকে বহুমাত্রিক ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ করেছে। মানবতাবাদী নন্দনতত্ত্ব: এই গানটির অন্যতম বড় নান্দনিক দিক হলো মানবতাবাদ। নজরুল এখানে ঈদের আনন্দকে কেবল ধনী মানুষের উৎসব হিসেবে দেখেননি। তিনি বলেছেন, ঈদ তখনই সাফল্যমণ্ডিত হবে যখন দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। অর্থাৎ, গানটির সৌন্দর্য নিহিত আছে সমতা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের ধারণায়। ইনসাফ ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও বাস্তবতার মাঝে সুর ও সংগীত ধর্মিতার সৌন্দর্য: গানটির সুর অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও উদ্দীপনাময়। এটি সাধারণত ঈদের সময় সমবেতভাবে গাওয়া হয়। সুরের গতি, ছন্দ এবং কণ্ঠের উচ্ছ্বাস ঈদের আনন্দকে আরও জীবন্ত করে তোলে। এই সুরের মধ্যেও নন্দনতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে তা হলো, শ্রোতার হৃদয়ে প্রবল আবেগ ও মানবিক বোধ জাগিয়ে তোলা। সামষ্টিক সংস্কৃতির নন্দন: ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ কেবল একটি গান নয়; এটি বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি বছর ঈদের সময় এই গানটি মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। এখানে ধর্মীয় আচার, সামাজিক দায়িত্ব এবং আনন্দ, সব মিলিয়ে একটি সামষ্টিক নন্দনবোধ সৃষ্টি হয়।
নন্দনতত্ত্বের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষ’ গানটি কেবল একটি ধর্মীয় সংগীত নয়; এটি মানবতা, দানশীলতা, সাম্য এবং আনন্দের এক অনন্য নান্দনিক প্রকাশ। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর শিল্পীসত্তার মাধ্যমে ঈদের উৎসবকে কেবল ধর্মীয় আনন্দে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি এটিকে মানবিক সৌন্দর্য ও সামাজিক ন্যায়বোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফলে এই গানটি বাংলা ইসলামী সংগীতের ইতিহাসে একটি চিরন্তন নন্দনতত্বের অন্তর্গত বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লেখক: নজরুল গবেষক ও কবি