ঢাকা মেইল ডেস্ক
২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
অনুবাদ সৃজনশীলতার অসাধারণ একটি শিল্প। দেশে অনুবাদকের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অনুবাদ না হলে বাংলা ছাড়া যারা অন্য ভাষা পড়তে পারেন না, তারা বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারতেন না। একজন অনুবাদক দুটি ভাষার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন। তিনি মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব সম্ভব করে তোলেন এবং নতুনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই অনুবাদের কাজে সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেখিয়েছেন আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু (ফেব্রুয়ারি ২, ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে শেরপুর জেলায় তার জন্ম)। তিনি বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্যের একটি বড় জায়গা দখল করে রয়েছেন।
খ্যাতিমান অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩-৭৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স এবং ১৯৭৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র হিসেবে ১৯৮০ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর জার্নালিজম, বার্লিন (সাবেক পশ্চিম বার্লিন), জার্মানি, সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা অর্জন। ১৯৮৮-৮৯ সালে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রথম বাংলাদেশি ফেলো নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতার ওপর উচ্চতর পড়াশোনা, ১৯৯২-৯৩ সালে কমনওয়েলথ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের আওতায় দিল্লিতে ‘ইনস্টিটিউট অফ কন্সটিটিউশন অ্যান্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ’-এ ফেলোশিপে অংশ নিয়েছেন।
তিনি সাংবাদিকতা করছেন প্রায় ৪০ বছর ধরে। কর্মজীবনে তিনি বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংগ্রাম (১৯৯১-৯৬); ফিচার সম্পাদক, দৈনিক মানবজমিন (১৯৯৭); বার্তা সম্পাদক, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা (১৯৯৮-৯৯); বার্তা সম্পাদক, দৈনিক বাংলার বাণী (১৯৯৯-২০০১); বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চিফ রিপোর্টার ও উপপ্রধান বার্তা সম্পাদক (২০০২-২০১০); সম্পাদক, মাসিক নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট (১৯৮৭-২০০৬); উপদেষ্টা সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক (২০১১ থেকে চলমান) প্রভৃতি অন্যতম।
পেশাগতভাবে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি জীবন সদস্য : বাংলা একাডেমি, স্থায়ী সদস্য : জাতীয় প্রেসক্লাব, সদস্য : ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), সদস্য : ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), প্রতিষ্ঠাতা সদস্য : ফোরাম অফ এনভায়রনমেন্টাল জার্নালিস্টস (ভাইস প্রেসিডেন্ট ২০০০ থেকে ২০০৬) এবং এশিয়ার নোবেলখ্যাত (ফিলিপাইন) র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার ১৯৯৮-এর মনোনয়নকারীর (Nominator) দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
অনন্য সাধারণ অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর কৃতিত্ব এই যে, তিনি বিচিত্র আঙ্গিক ও নানা স্বাদের গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন, যা পাঠকদের কৌতূহল নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। তার প্রকাশিত অনুবাদ গ্রন্থ প্রায় সত্তরটি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো : উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল : ১, দ্য লাস্ট মোগল, (প্রকাশকাল ২০০৭); ২. দিল্লি : সিটি অফ জ্বিনস, (২০০১); ৩. হোয়াইট মোগলস, (২০০৬); ৪. দি এনার্কি, (২০২২); নাগিব মাহফুজ (নোবেল বিজয়ী ১৯৮৮), ৫. কায়রো ট্রিলজি (তিন খণ্ড ১৪০০ পৃষ্ঠা), (ক) প্যালেস ওয়াক {(প্রথম খণ্ড), (২০১৬)}; (খ) প্যালেস অফ ডিজায়ার {(দ্বিতীয় খণ্ড), (২০১৭)}; (গ) সুগার স্ট্রিট {(তৃতীয় খণ্ড), (২০১৮)}; ৬. থেবস অ্যাট ওয়ার, (২০০৮); ৭. উইজডম অফ ফারাও খুফু, (২০০৮); ৮. আরশের সামনে, (২০২৪); খুশবন্ত সিং: ৯. ট্রেন টু পাকিস্তান, (২০০৪); ১০. দিল্লি, (১৯৯৭); ১১. আই শ্যাল নট হিয়ার দ্য নাইটিঙ্গেল, (২০০৩); ১২. বারিয়্যাল অ্যাট সী, (২০০৮); ১৩. দ্য সানসেট ক্লাব, (২০১২); ১৪. অবিস্মরণীয় নারী, (২০১০); ১৫. ট্রুথ লাভ অ্যান্ড অ্যা লিটল ম্যালিস, (২০০৩); ১৬. খুশবন্তনামা, (২০১৭); ১৭. মহারাজা রণজিৎ সিং, (২০০৯); ১৮. জোকস, (২০০৩); ১৯. দ্য এন্ড অফ ইন্ডিয়া, (২০০৮); ২০. ভিনটেজ সরদার, (২০০৮); ২১. খুশবন্ত সিং-এর নির্বাচিত গল্প, (২০০৮); ২২. ম্যালিসিয়াস গসিপ, (২০১০); ২৩. প্যাড়াডাইজ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, (২০১০); ২৪. বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ ও শান্তি, (২০২১); মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি : ২৫. দ্য সোল অফ রুমি, (২০০৪)।
২৬. আমি এবং রুমি {(শামস তাবরিজীর আত্মজীবনী), (২০২০)}; ২৭. অ্যা ইয়ার উইথ রুমি, (২০১৮); ২৮. দ্য বুক অফ রুমি, (২০২১); ২৯. রুমির সংলাপ, (২০০৬); ৩০. নিষিদ্ধ রুমি, (২০২২); ৩১. রুমির প্রেমের রীতিনীতি, (২০২৩); ৩২. আমি কেন ঘুমাতে পারি না—জালালুদ্দিন রুমি, (২০২৩); ৩৩. রুমির গভীর প্রেমালাপ, (২০২৪); ৩৪. রুমি’স লিটল বুক অফ উইজডম, (২০২৪); ৩৫. প্রেমের ধর্ম : রুমির ১০০ প্রেমের কবিতা, (২০২৫); ৩৬. মোগল শাহজাদিদের কান্না—খাজা হাসান নিজামি, (২০০২); ৩৭. সিপাহি বিদ্রোহে দিল্লির যন্ত্রণা—খাজা হাসান নিজামি, (২০১৭); ৩৮. ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি—ওরিয়ানা ফালাচি, (১৯৯৬); ৩৯. হাফ অ্যা লাইফ ভি এস নাইপল {নোবেল বিজয়ী (২০০৩)}; ৪০. ইস্তাম্বুল—ওরহান পামুক {নোবেল বিজয়ী (২০০৬)}; ৪১. মেমোরিজ অফ মেলানকোলি হোরস—গর্সিয়া মার্কেজ {১৯৮২ সনের নোবেল বিজয়ী (২০০৯)}; ৪২. দ্য ব্রিজ অন দ্য দ্রিনা—আইভো অ্যানড্রিচ {১৯৬১ সনের নোবেল বিজয়ী (২০১০)}; ৪৩. ইন্টারপ্রেটার অফ ম্যালাডিজ—ঝুম্পা লাহিরি, (২০০৬); ৪৪. দ্য প্রিন্সেস—জীন পি স্যাসন, (২০০২); ৪৫. মাই স্টোরি—কমলা দাশ, (২০০৫)।
৪৬. ডিফিকাল্ট ডটারস—মঞ্জু কাপুর, (২০০৬); ৪৭. অবিস্মরণীয় এক হীরক কোহিনূর—ইরাজদ আমিনি, (২০১০); ৪৮. ব্লাড অফ ফ্লাওয়ার্স—অনিতা আমিরেজওয়ানি, (২০১৪); ৪৯. মোগল ইন্ডিয়া--নিকোলাও মানুচি, (২০০৮); ৫০. টোয়াইলাইট ইন দিল্লি—আহমেদ আলী, (২০০৭); ৫১. ওমর খৈয়ামের সমরকন্দ—আমিন মালোফ, (২০০৮); ৫২. উমরাও জান—মির্জা হাদি রুসওয়া, (২০১০); ৫৩. মির্জা গালিব—গুলজার, (২০০৯); ৫৪. দাস্তান-ই-গদর—জহীর দেহলভি, (২০১৮); ৫৫. কারফিউড নাইট—বাশারত পীর, (২০১৮); ৫৬. টু হিস্টোরিক ট্রায়াল ইন রেডফোর্ট—আইএন অফিসারদের বিচারের শুনানি, ৫৭. দ্য ট্রায়াল অফ বাহাদুর শাহ জাফর—মামলার শুনানি, ৫৮. আই অ্যাম নট অ্যান আইল্যান্ড—খাজা আহমদ আব্বাস, (২০২২); ৫৯. ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত, (২০২২); ৬০. ফিফটিন গভর্নরস আই সার্ভড উইথ—মেজর (অব.) এস জিলানি, (২০২২); ৬১. প্রাচীন গ্রীসে প্রেম বিয়ে ও যৌনজীবন—নিকোলাস ভ্রিসিমটজিস, (২০০৬); ৬২. তাহমাসনামা—তাহমাস বেগ খান, (২০২৪); ৬৩. গান্ধী’স হিন্দুইজম : দ্য স্ট্রাগল অ্যাগেইনস্ট জিন্নাহ’স ইসলাম—এম জে আকবর, (২০২৩)।

৬৪. ভারত ও পাকিস্তানের বিশটি নির্বাচিত গল্প, (২০০৫); ৬৫. কালাম-ই-ইকবাল—২০০ দুই লাইনের কবিতা, (২০২৫); ৬৬. সিপাহি বিদ্রোহের দালালেরা এবং একটি স্মৃতিকথা, (২০২৪); ৬৭. জিন্নাহ’র জীবনের শেষ ৬০ দিন, (২০২২); ৬৮. গালিবের অশ্রু—দুই লাইনের ২০০ নির্বাচিত কবিতা, (২০২৫); ৬৯. ইন্টারভিউ উইথ লিজেন্ডস {(খ্যাতিমান ১৩ ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার), (২০২৫)}; ৭০. রেমন্ড এ মুভি লাইফ আফটার লাইফ {(জীবনের পর জীবন), (২০২৪)} অন্যতম।
আরও পড়ুন
‘বিদ্রোহী’ কবিতা: সমকাল-দর্পণে
বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন স্বাদের অনুবাদ ছাড়াও এ পর্যন্ত তার সাতটি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো : ১. ও আকাশ ও বিহঙ্গ (ভ্রমণকাহিনি) (১৯৯২); ২. মুসলমানের রক্তে লেখা ভারতের ইতিহাস {(ইতিহাস) (২০২৩)}; ৩. মহানবী (সা.) ও শত মুসলিম মনীষী {(জীবনী) (২০০৩)}; ৪. সিপাহি বিদ্রোহের ভুলে যাওয়া ইতিহাস {(ইতিহাস) (২০০৪)}; ৫. জাদুর ট্যাবলেট {(শিশুতোষ) (২০০৫)}; ৬. কাজীর দরবারে আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু {(সাক্ষাৎকার) (২০২২)} অন্যতম।
অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক জগতে পৌঁছে দেওয়ার যে অসাধারণ কাজ আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু করে যাচ্ছেন, তার স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। তিনি প্রায় চার দশক ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে সেবা করেছেন, তার কোনো তুলনা হয় না। এইখানে তিনি ঐরকম বড়ো এক অভাগাও! কারণ এত বড়ো একজন অনুবাদককে রাষ্ট্র আজো তার প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু দেয়নি। আসলে হতভাগা তিনি নন, আমরাই, কারণ আমরা গুণীর কদর করতে জানি না, জানলে অনেক আগেই তাকে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হতে দেখতাম। আমরা মনে করি, এই খ্যাতকীর্তি অনুবাদককে রাষ্ট্র তার প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান করুক। তাকে জাতীয় পুরস্কার বা পদকে ভূষিত করুক এই দাবি রাখছি। তার প্রতি নিরন্তর শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক; অফিসার, বাংলা একাডেমি