images

কৃষি ও পরিবেশ

৭৯ শতাংশ মাটিতে পুষ্টি নেই, নদী দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে ইলিশ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

১৯ জুন ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

* মাটির পুষ্টি বাড়াতে জৈব সার ব্যবহারের পরামর্শ
* নদীর মাছ বাঁচাতে অবৈধ জাল নিষিদ্ধ সময়ের দাবি
* ২০০ পরিবেশ আইনকে যুগপযোগী করার পরামর্শ

মাটিতে যেসব খনিজ উপাদান থাকার কথা তা থাকছে না। দিন দিন মাটির গুনাগুন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাটিতে পুষ্টি মিলছে না। ফলে গাছ পুষ্টি পাচ্ছে না। আবার সেই গাছের ফলে ঠিকমতো পুষ্টি মিলছে না। ফল খেলেও স্বাদ নেই। অন্যদিকে নদীগুলো দখলে দূষণে পর্যদস্তু। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির মাছ। ইলিশের অভয়ারণ্যের নদীগুলোর তীরে উন্নয়ন প্রকল্প করায় ইলিশ আর ডিম পাড়তে মিঠা পানিতে আসছে না। ফলে ইলিশ কমছে। 

এছাড়া কালখানার খানার ক্যামিকেল যুক্ত পানির কারণে দেশি মাছের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এজন্য শুধু পরিবেশ অধিদফতর নয়, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও দেশের মানুষকে নিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। সেইসঙ্গে পরিবেশ সংক্রান্ত যে ২০০ আইন রয়েছে সেগুলাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইনগুলাকে সংস্কার করে যুগপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। 

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, জীববৈচিত্রের অবক্ষয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান ক্ষয় দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর প্রেক্ষাপটে সংকট মোকাবেলায় কার্যকর করণীয় নির্ধারণ এবং উত্তরণের উপায় এ নিয়ে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে বক্তাদের কথায় এসব উৎকন্ঠা ও সমাধানের কথা উঠে আসে। 

জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি এই আয়োজন করে। এতে দেশের প্রকৃতি বিজ্ঞানী, নদী গবেষক, পরিবেশবিদ, শিক্ষক, কৃষিবিদ,  মেরিন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান। 

প্রাকৃতিক কৃষির  অন্যতম পথিকৃৎ গবেষক দেলোয়ার জাহান বলেন, আমরা আজ খেজুর ও তালের রসে কোনো মিষ্টি পাই না। শশা খেলে কুমড়ার মতো লাগছে। স্বাদ নেই। কারণ মাটিতে পুষ্টি নেই। গাছের যা পুষ্টি থাকার দরকার তা ৭৯ শতাংশ মাটিতে নেই। মাটিতে ৯০ শতাংশ ধরনের পুষ্টির ঘাটতি। ফলে গাছ মাটি থেকে সেই পুষ্টি পাচ্ছে না। গাছের পুষ্টি ঘাটতির কারণে মানুষ, প্রাণীর শরীরেও পুষ্টির ঘাটতি ঘটছে। ফলে অল্পতে মানুষের নানা রোগ হচ্ছে। একটি বাচ্চা জন্মের পর থেকে বাংলাদেশে পুষ্টির ঘাটতি নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। মাটিতে আজ ক্যালসিয়াম ঘাটতি। ফলে খাবারে ক্যালসিয়াম না থাকায় মানুষের প্রতি চার থেকে পাঁচজনে কিডনিজনিত সমস্যায় ভুগছে। 

দেলোয়ার জাহান বলেন, প্রতি বছর দেশে ৬০ লাখ টন সার ব্যবহার হচ্ছে। ফলে মাটির টবসয়েল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাটিকে ঠিক করতে তিনি মাটিতে বেশি পরিমাণে জৈব সার বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি কৃষিতে বিষের ব্যবহার বন্ধের জন্যও তিনি আহ্বান জানান।  

লেখক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, আমরা একটি নদী নিয়ে গবেষণা করে বের করেছি বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ২ হাজার ৪২০টি। সেটার তালিকা জেলা ও উপজেলা ওয়ারী করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নদী রক্ষী কমিটি করেছে ১ হাজার ৮টি অন্যদিকে আরেকটি প্রতিষ্ঠান বের করেছে ১ হাজার ৪১৩টি নদী। এতগুলো নদী অথচ সেগুলোকে বাঁচানো ও রক্ষার জন্য কোন উদ্যোগ নেই। 

জিয়াউর রহমানের নদী নিয়ে চিন্তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান তার সময়ে ৩০০ হারানো নদী খনন করে সেগুলোকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিসের খাল খনন। নদীগুলোকে গত ৫০ বছরে দখল করে শেষ করা হয়েছে। সেগুলোর সঙ্গে অধিকাংশ আমলারা জড়িত। ফলে তারা এখন নদী খনন না করে খাল খননের কথা বলছেন। 

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলীর বলেন, উপকূলের প্রায় ৫ লাখ মানুষ মৎস পেশার সঙ্গে জড়িত। যা এক শতাংশ জিডিপিতে এবং ১১ শতাংশ কৃষিতে ভুমিকা রাখছে। 

আমরা যদি বিগত সময়গুলোতে দেখি তাহলে যতো উন্নয়ন প্রকল্প হয়েছে সব ইলিশের অভয়াশ্রমের আশপাশে হয়েছে। আন্দামানিক যে ইলিশের অভয়াশ্রম তার আশপাশে পায়রাসহ আরও তিনটি উন্নয়ন প্রকল্প হয়েছে। বিষখালী নদীর তীরে বরিশাল বিদ্যুৎ প্লান্ট হয়েছে। ফলে আন্দারমানিকের ৪০ কিলোমিটার জুড়ে এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। আমরা ইলিশের অভয়াশ্রমগুলো নষ্ট করে ফেলার কারণে আর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। যে বিদ্যুৎপ্লান্টগুলো করা হয়েছে সেগুলোর ময়লা নদীতে ফেলায় নদীর পানিতে লেয়ারে যে মাছের খাবার থাকে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানি নষ্ট হওয়ায় মাছ খাবার না পাওয়ায় আর নদীতে আসছে না। এরপরও সরকারী কোন পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। 

তিনি এসময় কারেন্টজাল, দেউরি জাল ও টানা জাল বন্ধের পরামর্শ দিয়ে বলেন, উপকূলে এমন কোন অবৈধ জাল নেই যা ব্যবহার হয় না। নদীতে ৪০মিটার পানিতে কোন ট্রলিং বোড মাছ ধরতে পারবে না কিন্তু সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। ট্রলিং বোডে ছোট ছোট মাছগুলোও মারা যাচ্ছে। ট্রলিং জালগুলা আসলে কোন জেলেদের জাল নয়, এগুলো প্রভাবশালীদের জাল। তাই এসব জাল বন্ধ করতে হবে।

 সংবাদ সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স এর সভাপতি পরিকল্পনাবিদ জনাব আরিফুল ইসলাম। এসময় আরও বক্তব্য রাখেন 

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং ক্যাপসের নির্বাহী পরিচালক  অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, বিজিএমইএফ ফ্যাশান টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডিন  অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিল, মার্কস মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ছায়েদুল হক, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার খান শরিফ সোহেল রায়হান, ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. সবুর আহমেদ, হরিরামপুর শ্যামল নিসর্গের প্রনব পাল, তেতুল তলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি  সৈয়দা রত্না। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা।

এমআইকে/ক.ম