images

কৃষি ও পরিবেশ

‘বাস্তবায়নের ঘাটতিতে জলবায়ু পরিকল্পনার সুফল মিলছে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ মে ২০২৬, ০৭:০২ পিএম

দেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ডেল্টা প্ল্যান, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ), জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যানসহ নানা ধরনের নীতিমালা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে তার কাঙ্ক্ষিত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বরং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বিত যৌথ উদ্যোগ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর গুলশান-২ এ অবস্থিত হোটেল সারিনায় খ্রীস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি) আয়োজিত ‘জলবায়ু সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বিষয়ক জাতীয় পরামর্শ’ শীর্ষক সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় জলবায়ু নিয়ে কাজ করা ৫০টির বেশি সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- সিসিডিবির প্রধান নির্বাহী জুলিয়েট কেয়া মালাকার, জলবায়ু গবেষক ড. হাসিব মোহাম্মদ ইরফানুল্লাহ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর এবং কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর মণীষ আগারওয়াল।

মূল প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি ধরিত্রী কুমার সাহা, কর্ডএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডাউয়ে ডিকস্ট্রা এবং সিসিডিবির নির্বাহী পরিচালক। আলোচনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে তা প্রশমনে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সিসিডিবির প্রধান নির্বাহী জুলিয়েট কেয়া জানান, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত সিসিডিবি ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করছে। বর্তমানে দেশের ২৯টি জেলায় এক লাখের বেশি পরিবারের সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

তিনি বলেন, সিসিডিবি কমিউনিটি রেজিলিয়েন্স, গবেষণা, অ্যাডভোকেসি, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

জুলিয়েট কেয়া মালাকার আরও জানান, সিসিডিবির কার্বন নির্গমন হ্রাস প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৭৬৫টি উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে প্রতি পরিবার বছরে প্রায় ৩ দশমিক ২০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমাতে সক্ষম হচ্ছে। এছাড়া ক্লাইমেট সেন্টার ও ক্লাইমেট পার্কের মাধ্যমে স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

জলবায়ু গবেষক ড. হাসিব মোহাম্মদ ইরফানুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নানা পরিকল্পনা ও নীতিমালা তৈরি করা হলেও বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) ২০২৩-২০৫০ বাস্তবায়নে প্রায় ২৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। অথচ প্রতিবছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রয়োজন হলেও সক্ষমতা উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণে বরাদ্দ খুবই সীমিত।

তিনি জানান, ২০২৬ অর্থবছরের জলবায়ু সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ৬ দশমিক ২২ শতাংশ অর্থ সক্ষমতা উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পাশাপাশি তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ‘ন্যাচার বেইজড সলিউশন’ বা প্রকৃতি নির্ভর সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ সমন্বয়ের আহ্বান জানান।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর বলেন, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও এর মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য তিন শতাংশ জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। তাই জনস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।

কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর মণীষ আগারওয়াল উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক ও সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে তিনি প্রমাণভিত্তিক বা এভিডেন্স বেইজড কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে সিসিডিবির আন্তর্জাতিক মানের জলবায়ু প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সনদ বিতরণ করা হয়। এছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জলবায়ু গবেষক, কৃষি গবেষক, শিক্ষক এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের উদ্বোধন করা হয়।

এএইচ/এমআই