উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশে জেঁকে বসেছে শীত। কোথাও কোথাও কয়েক দিন ধরে দেখা নেই সূর্যের। ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত জনজীবন। অন্যবারের তুলনায় এবারের শীত অনুভূত হচ্ছে বেশি। ফলে শীতে কাবু দেশের বড় অংশের মানুষ। শীতের এই প্রকোপ আরও কিছু দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। অস্বাভাবিক এই শীতের কারণে ফসলের ক্ষতি হতে পারে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কৃষকের কপালে।
শীতে বেশি বিপর্যস্ত উত্তরের কয়েকটি জেলা। এর মধ্যে দিনাজপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছে কয়েক দিন ধরে। রোববার (১৪ জানুয়ারি) বিকেল ৪টায় দিনাজপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এটিই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এই অঞ্চলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কনকনে হাড়কাপাঁনো শীতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা আরও তিন থেকে পাঁচ দিন থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
শীতে বিপর্যস্ত উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামও। এই জেলার রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানান, আজ ভোর ৬টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জেলায় টানা ছয় দিন দেখা মেলেনি সূর্যের। হিমেল হাওয়া, মেঘলা আকাশ ও ঘন কুয়াশার কারণে ঠান্ডায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনপদ। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকায় হিমেল বাতাসের কারণে কাবু হয়ে পড়েছে শিশু, নারী ও বয়স্করা।
বিজ্ঞাপন
কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আতিকুল ইসলাম জানান, শীত বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগী ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ৬২ জন ও শিশু ওয়ার্ডে ১৪ জন নিউমোনিয়া রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
আরও পড়ুন
শীতে বিপর্যস্ত উত্তর-পশ্চিমের জেলা চুয়াডাঙ্গাও। এই জেলার আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক রকিবুল হাসান জানান, রোববার সকাল ৯টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আর্দ্রতা ৯৪ ভাগ। জেলায় বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, সেই সাথে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। সন্ধ্যার পর থেকে কুয়াশার মাত্রা বাড়তে থাকায় দূরের কোনো কিছু দেখা যায় না। হাড়কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা কাবু হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। রাত পেরিয়ে সকাল আসার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতা যেন আরও বেড়ে যায়। দিনের বেলায় যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে।
উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে তাপমাত্রা নিরূপণের কোনো কার্যালয় নেই। তবে কৃষি সম্প্রসাারণ অধিদফতর জানিয়েছে, গত ৬-৭ ধরে প্রথমে মৃদু ও পরে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ চলছে জেলায়। রোববার সকাল ৯টায় জেলায় সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ১ আবার কোথাও ৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৪-৯৬ শতাংশ। ফলে গত দুই দিনে ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে। তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও ঠান্ডা বেড়ে গিয়ে বিপর্যস্ত জেলার জনজীবন। কর্মজীবী শ্রমিকরা ঠান্ডায় কাজ করতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছে।
গত কয়েক দিন ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রার পার্থক্য ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম। বেশিরভাগ জেলাতেই সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়াতে শীতের অনুভূতি বাড়ছে এবং কোথাও কোথাও তা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে আসে, সেখানে শীতের অনুভূতি বাড়তে থাকে। পার্থক্য পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এলে শীতের অনুভূতি প্রকট থেকে প্রকটতর হয়। অর্থাৎ হাড়কাঁপানো শীত অনুভূত হয়।
ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
এই সময়ে কৃষকেরা জমিতে আলু, বেগুন, সরিষা, লাল শাক, চিয়া সিডসহ শীতের বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন। কিছুদিন আগে বৃষ্টিতে আলুর বেশ ক্ষতি হয়েছে। এখন আবার তীব্র শীতের কারণে ফসল নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন তারা
জানুয়ারির এ সময় বোরো ধান, আলু, ডাল, তৈলবীজ জাতীয় ফসলসহ মাঠে রয়েছে শীতকালীন বেশ কিছু ফসল। নিম্ন তাপমাত্রা ও কুয়াশা-যুক্ত আবহাওয়ার কারণে এসব ফসল বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। তাই কৃষি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এসব ফসল রক্ষায় বাড়তি যত্ন ও ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন
সারা দেশব্যাপী নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মে মাস পর্যন্ত বোরো ধানের মৌসুম চলে। এ সময় বীজতলায় বীজ বপন করা হয়। ধানের বয়স ৪০ দিন বা ৪৫ দিন হলে চারা তুলে মাঠে রোপণ করা হয়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোসাম্মৎ সালমা পারভীন বিবিসিকে বলেন, সপ্তাহব্যাপী তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে বীজতলায় থাকা চারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাপমাত্রা ১৩ ডিগ্রির নিচে চলে গেলে ধানের চারাগাছ হলুদ হয়ে যেতে পারে, তখন তা খাদ্য তৈরি করতে পারবে না। চারা মরে যেতে পারে। চারা যাতে মরে না যায় সেজন্য স্বচ্ছ সাদা পলিথিন দিয়ে বাঁশের মাচার মতো তৈরি করে বীজতলা ঢেকে রাখার পরামর্শ দিচ্ছি আমরা।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, তাছাড়া এই তীব্র শীতের কারণে চারাগাছ যাতে মরে না যায় তাই আরও এক সপ্তাহ পরে বীজতলা থেকে চারা তুলে রোপণ করতেও বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ফারুক বিন হোসেন বলেন, রাতের তাপমাত্রা যখন ২০ ডিগ্রির নিচে চলে আসে ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার জন্য আর্দ্রতা ৮০ বা ৯০ পারসেন্ট হয়ে যায় তখন শীতকালীন ফসলে বিভিন্ন রোগের আক্রমণ হয়। এ সময় মূলত আলু, ডাল ও তেল জাতীয় ফসল চাষ হয়। ঠান্ডা ও ভেজা আবহাওয়া এসব ফসলে রোগ বিস্তারের জন্য অনুকূল। তাই ফসল রক্ষায় বাড়তি সতর্কতা নিতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ফারুক বলেন, এই তীব্র শীতে আলুতে ব্যাপক হারে মড়ক রোগের আক্রমণ হয়। কুয়াশা-যুক্ত আবহাওয়ায় মড়ক রোগে আক্রান্ত আলু গাছ দ্রুত লতাপাতা ও কাণ্ডসহ পচে যায়। দুই-তিন দিনের মধ্যেই মাঠের সমস্ত গাছই মরে যেতে পারে। এছাড়া তাপমাত্রা আরও নেমে গেলে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় মসুর ডাল। গোড়া পচা রোগে আক্রান্ত হয়। তাই রোগের আক্রমণ এড়াতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, নতুবা ব্যাপক ফসলহানি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তার পরামর্শ, মসুর ডালে গোড়া পচা রোগ দমনে অটোস্টির-৫০ ডাব্লিউ পি নামে ওষুধটি প্রতি লিটার পানিতে দশমিক দুই গ্রাম মিশিয়ে সাত থেকে দশদিন পরপর দুই -তিনবার গাছের গোড়া ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি থেকে ১৮ ডিগ্রি ও আর্দ্রতা ৮০ থেকে ৯০ পারসেন্ট হলে সরিষাতে কাণ্ড পচা রোগ দেখা দেয়। এ রকম আবহাওয়ায় যদি এ রোগ দেখা দেয় তাহলে ধ্বংসাত্মক অবস্থা দেখা দেয়। কাণ্ড পচা রোগ দেখা দিলে সাথে সাথে প্রতি লিটার পানিতে রোভরাল দুই গ্রাম মিশিয়ে তিনবার ফসলে স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
জেবি