গ্রীষ্মের দলবদলের বাজার মানেই ইউরোপীয় ফুটবলে এক অন্যরকম উত্তেজনা। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই উত্তেজনার পারদ যেন এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ (ইপিএল)। স্প্যানিশ কিংবা ইতালিয়ান পরাশক্তিরা যখন আর্থিক হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, ইংলিশ ক্লাবগুলো তখন টাকার থলি নিয়ে রীতিমতো উৎসবে মেতেছে। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো গ্রীষ্মকালীন দলবদলে নিজেদের পুরনো সব রেকর্ড ধূলিসাৎ করে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে প্রিমিয়ার লিগ, যা বিশ্বমঞ্চে তাদের অসীম অর্থনৈতিক শক্তিরই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
বিবিসি স্পোর্টস ও ফুটবল ট্রান্সফার্স ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা পল ম্যাকডোনাল্ডের দেওয়া তথ্যমতে, এবারের উইন্ডোতে ইংলিশ ক্লাবগুলোর মোট খরচের অঙ্ক অবিশ্বাস্য ৩.৪৬ বিলিয়ন পাউন্ডে গিয়ে ঠেকেছে। মাত্র পাঁচ বছর আগেও এই খরচের পরিমাণ ছিল ১.১৩ বিলিয়ন পাউন্ড। সময়ের সাথে এই পাহাড়সম উল্লম্ফন প্রমাণ করে যেকোনো বিশ্বমানের খেলোয়াড়কে দলে টানতে ইপিএল কতটা অপ্রতিরোধ্য। শুধু দলবদলের শেষ দিনেই ক্লাবগুলোর পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে রেকর্ড ৪৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। এভারটন থেকে ৬০ মিলিয়ন পাউন্ডে ইলিমান এনদিয়ায়ের ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগদানের মধ্য দিয়েই মূলত লিগের আগের রেকর্ডটি (৩.১৪ বিলিয়ন) ভেঙে যায়। আর উইন্ডো বন্ধ হওয়ার পরপরই চেলসি থেকে ১২৫ মিলিয়নে এনজো ফার্নান্দেজের সিটিতে যাওয়ার খবর চমকে দেয় গোটা ফুটবল বিশ্বকে।
আরও পড়ুন-রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে ম্যানসিটিতে আর্জেন্টাইন তারকা এনজো
আরও পড়ুন-আর্জেন্টিনায় মেসির ১০ নম্বর জার্সি এখন পরবেন কে?
এবারের গ্রীষ্মের দলবদল যেন মেগা চুক্তির এক অনন্য প্রদর্শনী। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে দামি দশটি ট্রান্সফারের তিনটিই ঘটেছে এবার, আর প্রতিটিই হয়েছে ইংলিশ ক্লাবগুলোর ঘরে। এনজো ফার্নান্দেজের আকাশছোঁয়া মূল্যের পাশাপাশি নটিংহ্যাম ফরেস্টের ইলিয়ট অ্যান্ডারসন ১১৬ মিলিয়ন ও অ্যাস্টন ভিলার মরগান রজার্স ১১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে নতুন ঠিকানা পেয়েছেন। পিছিয়ে ছিল না লিভারপুলও; ফরাসি ক্লাব পিএসজি থেকে ব্র্যাডলি বারকোলাকে তারা উড়িয়ে এনেছে ১০৬ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রাথমিক চুক্তিতে, যা শর্তসাপেক্ষে ১২৩ মিলিয়ন পর্যন্ত ছুঁতে পারে।
দলবদলের এই মহোৎসবে সবচেয়ে বেশি সরব ছিল ম্যানচেস্টার সিটি। নতুন কোচ এনজো মারেসকার অধীনে স্কোয়াড ঢেলে সাজাতে তারা রেকর্ড ৪৫৮ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করেছে। তবে খেলোয়াড় বিক্রির মাধ্যমে ৩০৪ মিলিয়ন পাউন্ড পকেটেও পুরেছে সিটিজেনরা। ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা চেলসি ৩৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করলেও, খেলোয়াড় বিক্রি থেকে তারা ৩৮২ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করেছে। ফলে ব্লুজরা দিনশেষে ৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড লাভের মুখ দেখেছে।
অন্যদিকে, টটেনহ্যাম হটস্পার স্কোয়াড শক্তিশালী করতে ৩০২ মিলিয়ন খরচ করে সন্দ্রো তোনালি (১০০ মিলিয়ন পর্যন্ত হতে পারে), মাতেউস ফার্নান্দেজ ও স্যাভিওদের মতো তারকাদের দলে টেনেছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে প্রিমিয়ার লিগে সদ্য ফেরা ইপসউইচ টাউন। অবনমন এড়ানোর লড়াইয়ে তারা একাই খরচ করেছে ১৭১ মিলিয়ন পাউন্ড, যা বার্সেলোনা, এসি মিলান, জুভেন্টাস কিংবা পিএসজির মতো ইউরোপিয়ান জায়ান্টদের মোট খরচের চেয়েও অনেক বেশি! ঐতিহ্যবাহী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খরচ সেখানে ছিল ১৪৮ মিলিয়ন পাউন্ড।
এবারের দলবদলের একটি চোখধাঁধানো বৈশিষ্ট্য হলো, প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর নিজেদের মধ্যকার লেনদেন। ট্রান্সফার ফি যুক্ত মোট চুক্তির ৩৫ শতাংশই হয়েছে লিগের অভ্যন্তরীণ ক্লাবগুলোর মাঝে। বিদেশি লিগ থেকে চড়া দামে খেলোয়াড় কিনে আনার চেয়ে প্রিমিয়ার লিগের চেনা পরিবেশের পরীক্ষিত খেলোয়াড়দের ওপর বিনিয়োগ করাটাই এখন বেশি নিরাপদ মনে করছে ক্লাবগুলো। এছাড়া ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপুল আর্থিক সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে বিদেশি ক্লাবগুলো অনেক সময় অযৌক্তিক দাম হাঁকায়। আর এসব কারণেই ঝুঁকি এড়াতে ঘরের লিগের তারকাদের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন ইপিএলের ক্লাব কর্তারা।
এসটি




