সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ইমরান খানের মুক্তিতে একাট্টা ক্রিকেট দুনিয়া

প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৯ এএম

শেয়ার করুন:

ইমরান খানের মুক্তিতে একাট্টা ক্রিকেট দুনিয়া

ইমরান খান যখন বল হাতে রানআপ নিতেন, প্রতিপক্ষের বাঘা বাঘা ব্যাটারদের বুকেও কাঁপন ধরতো। আর ব্যাট হাতে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলায় তার জুড়ি ছিল মেলা ভার। ১৯৯২ সালে খাদের কিনারা থেকে ফিরে পাকিস্তানকে রূপকথার বিশ্বকাপ জেতানো সেই ‘ক্যাপ্টেন’ আজ রাজনীতির মারপ্যাঁচে বন্দি চার দেয়ালের মাঝে। তবে বাইশ গজের সেই লড়াকু যোদ্ধাকে কঠিন এই সময়ে ভুলে যাননি তার একসময়ের সতীর্থ থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটাররা। রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে স্পোর্টস আইকন হিসেবে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে এবার যেন এক ছাতার নিচে জড়ো হয়েছে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব।

রাজনীতির মাঠের হিসাব-নিকাশ বা আইনি জটিলতা যাই হোক না কেন, ক্রিকেটীয় চেতনার জায়গা থেকে ইমরানের প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি ক্রীড়াঙ্গনে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সাবেক ও বর্তমান তারকাদের কণ্ঠে জোরালো হচ্ছে একটাই সুর, ক্রিকেটের এই বরপুত্রের দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তি। রাজনৈতিক রেষারেষির জেরে একজন কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ এভাবে কারাবন্দি থাকবেন, তা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে ক্রিকেট অনুরাগীদের।

২০২৩ সালের আগস্ট থেকে একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তবে তার কারাবাসের অবস্থা নিয়ে পরিবার, দল (পিটিআই) এবং সরকারের বক্তব্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। এই বিতর্কের মধ্যেই ক্রিকেট দুনিয়া তার মানবিক চিকিৎসার আওয়াজ তুলেছে।

আরও পড়ুন- ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, যা বলেছিলেন

পরিবার ও পিটিআই নেতারা বলছেন, ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানকে দিনে প্রায় ২২ থেকে ২৩ ঘণ্টা একাকী কুঠুরিতে রাখা হচ্ছে। চোখের সমস্যা গুরুতর। এক চোখে প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়েছে বলে দাবি তাদের। পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ সীমিত। ছেলেদের সঙ্গে দীর্ঘদিন দেখা হয়নি। আইনজীবীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত। মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তার ছেলে কাসিম খান। তিনি আশঙ্কা করেছেন, এভাবে চলতে থাকলে বাবা কারাগারে টিকতে পারবেন না।

অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, ইমরান খানকে একাকী কুঠুরিতে রাখা হয়নি। তাকে একটি বিশেষ সাত কক্ষের কম্পাউন্ডে রাখা হয়েছে। দিনের বেলা তিনি সেখানে ঘোরাফেরা করতে পারেন। শুধু রাতে লকআপ হয়। নিরাপত্তার কারণে অন্য সাধারণ বন্দীদের থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। বাড়ির রান্না করা খাবার ব্যায়ামের সরঞ্জাম, বই, সংবাদপত্র ও টিভির সুবিধাও রয়েছে।

image-411662

সরকারি হিসাবে, কারাবাসের শুরু থেকে প্রায় ৩০ বার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে তার পরীক্ষা করানো হয়েছে। চোখের সমস্যার জন্য ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। স্ত্রী বুশরা বিবির সঙ্গে সাপ্তাহিক সাক্ষাতের ব্যবস্থা আছে। বোনদের সঙ্গেও সম্প্রতি দেখা হয়েছে।

আগস্টের মাঝামাঝি সুপ্রিম কোর্ট তাকে নির্দিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু তাকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা শেষে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়। পিটিআই এটিকে আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে। এই বিতর্কিত কারাবাসের অবস্থাই ক্রিকেট দুনিয়ার সাবেক তারকাদের একাত্ম হওয়ার মূল কারণ। তারা রাজনীতির বাইরে গিয়ে শুধু মানবিক চিকিৎসা ও মর্যাদার দাবি তুলেছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে ইমরান খানের ক্রিকেটীয় সত্তার প্রতি সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটাররা। নিচে তাদের উল্লেখযোগ্য মন্তব্য এবং মন্তব্যের উৎসগুলো তুলে ধরা হলো-

আরও পড়ুন-ইমরান খানের জন্য ক্রিকেটারদের আওয়াজ তুলতে বললেন মঈন 

সাবেক অধিনায়কদের সমন্বয়ে ইমরানের পাশে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন সেটি জানিয়ে অজি কিংবদন্তি চ্যাপেল ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, আমার পুরোনো বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী ইমরান খানের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে বুঝলাম, অন্ধকার ভেদ করতে একটি প্রদীপ যথেষ্ট নয়। ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রকে ঘিরে যে অন্ধকার নেমে এসেছে, তা কাটাতে প্রয়োজন একাধিক কণ্ঠস্বর। এমন একদল অধিনায়কের সম্মিলিত আহ্বান, যাদের যৌথ ইতিহাস উপেক্ষা করা যাবে না।

ইমরান এমন আচরণ প্রাপ্য নন এবং তার পাশে দাঁড়াতে গাভাস্কার-কপিলরা কোনো দ্বিধা করেননি বলেও দাবি চ্যাপেলের, এটি সাবেক কোনো জাতীয় নেতার প্রাপ্য আচরণ নয়, আর বিশ্বকে এতকিছু দেওয়া একজন বৈশ্বিক ক্রীড়া আইকনের জন্যও উপযুক্ত নয়। এই অন্যায়ের বোধই আমাকে অন্য অধিনায়কদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রতিবেশী দেশকে ঘিরে তাদের দেশে (ভারত) যে চাপ রয়েছে, তা সত্ত্বেও তারা (গাভাস্কার-কপিল) এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। তারা তাদের বন্ধুকে ও উপমহাদেশে অসংখ্য লড়াইয়ের স্মৃতিকে মনে রেখেই ইমরানের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক কিংবদন্তি স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস এজ বিবৃতিতে বলেন, ইমরান আমার অন্যতম সেরা প্রতিপক্ষ ছিল, আবার মাঠের বাইরে আমরা ভালো বন্ধু। ক্রিকেট বিশ্বের একজন আইকন এভাবে কারাবন্দি থাকবে, তা দেখতে মোটেও ভালো লাগে না।

imran-khan-miandad

অজি ক্রিকেটার কামিন্স লিখেছেন, গ্রেগ চ্যাপেল এবং অন্য সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়কদের সঙ্গে আমিও আমার সমর্থন জানাচ্ছি। আমি আশা করি, আদালতের নির্দেশে যে চিকিৎসাসেবার কথা বলা হয়েছে, সেটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎও অব্যাহত থাকবে। আমি আশা করি, ইমরান খানের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা হবে, যে মর্যাদা প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য।

ইমরান প্রসঙ্গে কথা বলেন ভারতীয় কিংবদন্তি কপিল দেব। তিনি বলেন, ইমরানের সঙ্গে তারা ক্রিকেট খেলেছেন এবং তার অসাধারণ ক্রিকেটীয় প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ আইন সম্পর্কে তারা অবগত না হলেও একজন বন্দির মৌলিক মানবিক অধিকার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত। ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে কপিল বলেন, আমরা চাই তিনি যেন সর্বোত্তম চিকিৎসা পান। আমরা আর কিছু চাইছি না, কোনো জবাবও চাইছি না। আমরা শুধু অনুরোধ করছি।

জাভেদ মিয়াঁদাদ পাকিস্তানের সাংবাদিকদের প্ল্যাটফর্ম ‘ন্যারেটিভস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কেউ আমাকে এটা বুঝিয়ে বলুন। তিনি (ইমরান খান) কি পাকিস্তানকে খেয়ে ফেলবে? আমরা সবাই পাকিস্তানি। একসঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধান করা উচিত। সমস্যা যা-ই হোক, পাকিস্তানের এখন সেটিই প্রয়োজন। পরিস্থিতিকে অযথা দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে, এটা ঠিক নয়। তিনি একজন সৎ মানুষ। দুর্নীতিতে জড়িত এমন কেউ নন। চাইলে তিনি অনেক কিছুই করতে পারতেন।

ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর ওয়াকার ইউনুসের ভেরিফায়েড এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া স্ট্যাটাস। তিনি আমাদের একটি পুরো প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। রাজনীতির ভেদাভেদ থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় বীরদের সঙ্গে এমন আচরণ দেখতে পাওয়াটা হৃদয়বিদারক। আমি উনার সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।
 
শোয়েব আখতারের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল এবং টুইটারে আপলোড করা ভিডিও বার্তায় বলেন, যিনি দেশের জন্য বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন, বিশ্বমঞ্চে দেশের মাথা উঁচু করেছেন, তাকে এভাবে বন্দি রাখাটা কোনোভাবেই সম্মানজনক হতে পারে না। আমরা তার দ্রুত মুক্তি চাই।

images_(21)

পাকিস্তানের বর্তমান তারকা বাবর আজম, আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে ইমরান খানের মতো রূপকথার গল্প শুনে। রাজনীতিতে না ঢুকলেও উনার ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্ব ক্রিকেটে অবদানকে সম্মান করাটা আমাদের সবার দায়িত্ব। উনার শারীরিক সুস্থতা ও মুক্তির জন্য প্রার্থনা রইল।

শাহিন শাহ আফ্রিদি, বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উনার সেই ছবিটা পাকিস্তান ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ছবি। বর্তমান ক্রিকেটারদের কাছে উনি অনুপ্রেরণা। উনার এই কঠিন সময়ে আমরা সবাই উনার পাশে আছি।

সব মিলিয়ে চিত্রটা একদম পরিষ্কার। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইমরান খান হয়তো অনেকের কাছেই সমালোচিত বা বিতর্কিত হতে পারেন, কিন্তু ক্রিকেটার ইমরান খানের আবেদন আজও বিশ্বজুড়ে অমলিন। আর তাই তো, রাজনীতির সব ভেদাভেদ ও কাঁটাতার পেরিয়ে প্রিয় ‘ক্যাপ্টেন’-এর মুক্তির দাবিতে আজ এক বিন্দুতে মিলেছে পুরো ক্রিকেট দুনিয়া।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর