পাকিস্তানের সাবেক বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান লম্বা সময় ধরেই বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। দেশটির সরকার ইমরান খানকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আতোকে রেখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, এমন অভিযোগ বহুদিন ধরেই। এদিকে ইংল্যান্ড সফরে ইংলিশদের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলছে পাকিস্তান। সিরিজের মাঝেই স্কাই স্পোর্টস ইমরান খানের ছেলেরা একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) তাদের খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই সাক্ষাৎকারে ঠিক কী এমন ছিল যা পিসিবিকে এত চিন্তিত করে তুলেছিল?
লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টের দুপুরের খাবারের বিরতিতে (লঞ্চ ব্রেক) সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার মাইকেল আথারটনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উপস্থিত হয়ে পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছেন ইমরান খানের দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খান। সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের জোর দিয়ে বলেন যে, পাকিস্তানের সরকার তাঁদের বাবাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে।
কারাগারে ইমরান খানের আশঙ্কাজনক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কাছে দুটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। আথারটনসহ একাধিক সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক সেই চিঠিতে স্বাক্ষর করে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের কাছে ইমরানের প্রতি মানবিক আচরণের আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
সাক্ষাৎকার চলাকালীন কাসিম বলেন যে, কারাগারে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দি মারা গেছেন এবং পাকিস্তান সরকার তাঁর বাবার ক্ষেত্রেও একই পরিকল্পনা করছে।
কাসিম সাক্ষাৎকারে বলেন, "তারা এখন আর কোনো কৌশল বা পরিকল্পনার তোয়াক্কা করছে না। তারা কী করছে তা একদম পরিষ্কার- সেখানে তারা স্পষ্টভাবেই তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। তাকে যত দিন সম্ভব ভেতরে আটকে রাখা এবং তার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। শেষবার যখন তিনি আমাদের ফুফু এবং অন্য কারও সাথে কথা বলতে পেরেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে সম্প্রতি ভেতরের পরিস্থিতি মারাত্মক খারাপ হয়েছে। তিনি এটিকে অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের সাথে তুলনা করছিলেন যাদের হত্যা করা হয়েছে বা যারা কারাগারে মারা গেছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি খারাপ, একটি ছোট সেলে দিনে ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাকে সম্পূর্ণ একাকী বন্দি করে রাখা হয়েছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "এই মুহূর্তে তিনি যেন সঠিক চিকিৎসা পান, সেটি আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চোখের সমস্যার কারণে তাঁর চোখে প্যাচ (আই প্যাচ) লাগানো ছিল, তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপে আছেন। এটি আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন, কারণ আমি তাঁকে যতবার দেখেছি, এমনকি বন্দুকের মুখেও দেখেছি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী। আমরা যে গাড়িতে ছিলাম একবার সেটি ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল, তখনও ডাকাতসহ সেখানকার সবার চেয়ে তিনিই সবচেয়ে শান্ত ছিলেন।"
ইমরান খানের ছেলেরা আরও জানান, দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং কিংবদন্তি অধিনায়ক একটি ছোট সেলে একা একা দিনে ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় পার করছেন। তারা এমনকি দাবি করেন যে, ‘কারিগরি অজুহাতে’ পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ তাঁদের ভিসা দিতে অস্বীকার করছে।
ইমরান খানের অন্য ছেলে সুলাইমান বলেন, "আমরা কিছুটা আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয় যখন তাঁকে যে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে না নিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য সরকারি একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে সরাসরি আবার জেলে ফেরত পাঠানো হয়।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বাস্তবতা হলো, সরকারি কর্মকর্তারা মাত্র এক ঘণ্টার একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন এবং বলেন, 'দারুণ, তিনি একদম ঠিক আছেন'। এরপর তাঁরা বলেছিলেন যে এখন তাঁকে নিরপেক্ষ হাসপাতাল 'শিফা'-তে পাঠানো হবে। কিন্তু তার বদলে তাঁরা সব ডাক্তারদের এবং আমাদের ফুফুকে (যিনি নিজে একজন ডাক্তার) অপেক্ষায় রেখে তাঁকেই সোজা জেলে ফেরত পাঠিয়ে দেন।"
সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হওয়ার পর থেকে পিসিবি স্কাই স্পোর্টসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এমনকি প্রথম দিনের লাঞ্চের পরের সেশনে পাকিস্তান দল মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল বলেও জানা যায়, যদিও পরবর্তীতে ইসিবি (ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড)-র আশ্বাসে তারা খেলা চালিয়ে যেতে রাজি হয়।




