বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। কিন্তু সেই সাফল্যের পরও সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে আলোচনা থামছে না। গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডের খেলার ধরন বদলে যাওয়া, প্রতিপক্ষের চাপ সামলানোর কৌশল এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়গুলো এখনো বিশ্লেষণের কেন্দ্রে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে প্রথমে এগিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে সেই লিড ধরে রাখতে পারেনি টমাস টুখেলের দল। এনজো ফার্নান্দেজ ও লাওতারো মার্টিনেজের গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
এগিয়ে থেকেও কেন নিয়ন্ত্রণ হারাল ইংল্যান্ড?
সেমিফাইনালের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে গোল পাওয়ার পর ইংল্যান্ডের ম্যাচ পরিচালনার ধরন নিয়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, লিড নেওয়ার পর ইংল্যান্ড আগের মতো আক্রমণাত্মক অবস্থানে না থেকে তুলনামূলক রক্ষণনির্ভর হয়ে পড়ে।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনার মতো অভিজ্ঞ ও চাপ তৈরিতে দক্ষ দলের বিপক্ষে শুধু রক্ষণ সামলানোর ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির আক্রমণভাগকে পাল্টা আক্রমণে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল কি না, সেটি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফাইনালের আগে মেসিকে নিয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী এমবাপের
বেঞ্চে থাকা কিছু গতিশীল খেলোয়াড়কে আরও আগে মাঠে নামানো যেত কি না, সেটিও বিশ্লেষকদের আলোচনার অংশ ছিল। বিশেষ করে বুকায়ো সাকার মতো একজন খেলোয়াড়ের গতি ও একের বিপক্ষে লড়াইয়ের সক্ষমতা বড় ম্যাচে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, সেটি নতুন করে সামনে আসে।
টুখেলের ব্যাখ্যা
নিজের কৌশল নিয়ে ওঠা আলোচনার জবাবে টুখেল জানান, বিষয়টি শুধু কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বড় ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও এর সঙ্গে জড়িত।
স্কাই স্পোর্টসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ইংল্যান্ড কোচ বলেন, ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনা আক্রমণে ঝুঁকি বাড়ায় এবং সেই চাপ সামলাতে গিয়ে ইংল্যান্ড কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি।
তবে টুখেল দলের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, খেলোয়াড়রা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইংল্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন এবং ভবিষ্যৎ বড় টুর্নামেন্টে আরও শক্তিশালীভাবে ফেরার প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছেন।
তবে টুখেলের ব্যাখ্যার পরও বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। বিশ্লেষকদের একটি অংশের প্রশ্ন, আর্জেন্টিনার মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এগিয়ে থাকার পর ইংল্যান্ড কি আরও সাহসী অবস্থান নিতে পারত? সেই উত্তর এখনো আলোচনার বিষয় হয়ে আছে।
আরও পড়ুন: ইংল্যান্ডকে হারানোর পর রেফারিং বিতর্কে আর্জেন্টিনা
ফ্রান্সের বিপক্ষে বদলে গেল চিত্র
সেমিফাইনালের হতাশার পর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইংল্যান্ডকে দেখা যায়। মায়ামিতে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৬-৪ গোলের জয়ে টুখেলের দল শুধু ব্রোঞ্জ পদকই নিশ্চিত করেনি, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডও গড়েছে।
ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে হ্যাটট্রিক করেন বুকায়ো সাকা। ইংল্যান্ডের অন্য গোলগুলো করেন ডেকলান রাইস, এজরি কনসা ও জুড বেলিংহাম।
ফ্রান্সের হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে দুটি গোল করেন। একটি করে গোল করেন ব্র্যাডলি বার্কোলা ও উসমান দেম্বেলে।
সাকার এই অসাধারণ পারফরম্যান্স নতুন করে আলোচনায় এনেছে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তাঁর সীমিত ব্যবহারের বিষয়টিও। বড় ম্যাচে তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং পাল্টা আক্রমণে কার্যকারিতা ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের অন্যতম বড় অস্ত্র হতে পারে- ফ্রান্স ম্যাচে সেটিই আবার প্রমাণিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বসেরার মুকুটের লড়াইয়ে বিরল রেকর্ডের সামনে আর্জেন্টিনা-স্পেন
টুখেলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের অভিযানকে ব্যর্থ বলা যাবে না। টুখেলের দল সেমিফাইনালে পৌঁছেছে এবং শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। তবে বড় ম্যাচে এগিয়ে যাওয়ার পর কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে, সেটি এখনো দলের জন্য বড় শিক্ষা।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক সাফল্য দুটি অভিজ্ঞতাই টুখেলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী বড় টুর্নামেন্টগুলোতে চাপের মুহূর্তে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে ইংল্যান্ড কোচের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
তথ্যসূত্র: ফিফা ডট কম; স্কাই স্পোর্টস; দ্য গার্ডিয়ান; এপি নিউজ




