ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র দল হিসেবে পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছে ব্রাজিল। বিশ্বমঞ্চে পেলের যুগ থেকে শুরু করে রোনালদো-রোনালদিনহোদের জাদুকরী ছন্দ সেলেসাওদের এনে দিয়েছে এক চিরন্তন আধিপত্যের তকমা। তবে বিগত পাঁচটি বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তের ব্যর্থতা আর হতাশার পর, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের হেক্সা (ষষ্ঠ শিরোপা) মিশন সফল করতে এবার প্রযুক্তির চরম আশ্রয় নিয়েছে ব্রাজিল দল।
আজ নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আফ্রিকার পরাশক্তি মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করছে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। তবে এই মাঠের লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে খেলোয়াড়দের প্রতি মুহূর্তের শারীরিক ডেটা বা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের এক বিশাল মহাযজ্ঞ।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন- গ্রুপ পর্ব পেরোলে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হবে যে দল
আরও পড়ুন- নেইমারকে ছাড়া আজ মরক্কোর বিপক্ষে যেমন হবে ব্রাজিলের একাদশ
গ্যালারির দর্শকদের আড়ালে ব্রাজিলের ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েক বছর ধরে স্পোর্টস টেকনোলজি কোম্পানি ‘ক্যাটাপুল্ট’- এর তৈরি এক বিশেষ পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছেন। ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগ থেকে শুরু করে জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা তাদের জার্সির নিচে এক ধরণের সেন্সর-যুক্ত ‘স্মার্ট ভেস্ট’ পরে অনুশীলন ও ম্যাচ খেলেন।
এই ভেস্টের ভেতরের সিমগুলোতে থাকে হার্ট-রেট ইলেকট্রোড এবং পকেটে থাকে একটি জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস। এর মাধ্যমে প্রতিটি খেলোয়াড়ের স্প্রিন্ট গতি, হার্টবিট বা হৃদস্পন্দনের হার, ক্লান্তির মাত্রা, পেশির ওপর পড়া শারীরিক চাপ বা প্লেয়ার লোড, ইনজুরি থেকে সেরে ওঠার গতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা হয়।
বিজ্ঞাপন

ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের প্রধান ক্রীড়া বিজ্ঞানী গিলের্মে পাসোস জানান, আন্তর্জাতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারকারা সারা বছর বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের আলাদা আলাদা ক্লাবে খেলেন। কিন্তু এই ট্র্যাকিং প্রযুক্তির কারণে খেলোয়াড়রা হাজার মাইল দূরে থাকলেও তাদের প্রতিদিনের শারীরিক অবস্থার ডেটা সরাসরি চলে আসে জাতীয় দলের ডেটাবেজে। ফলে আনচেলত্তির কোচিং স্টাফরা ঘরে বসেই বুঝতে পারেন কোন খেলোয়াড় কতটুকু ফিট আছেন।
চলমান বিশ্বকাপে কাফ ইনজুরির কারণে দলের সেরা তারকা নেইমার জুনিয়রের প্রথম ম্যাচে ছিটকে যাওয়া কিংবা রাইট-ব্যাক পজিশনে তরুণ ওয়েসলির ইনজুরির মতো বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো এই ডেটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমেই নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফুটবলে সাধারণ সমস্যা ‘হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি’ থেকে কোনো খেলোয়াড় সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে সেরে উঠছেন কি না, তা এই স্প্রিন্টিং ডেটা দেখে নিশ্চিত করা হয়।
এমনকি এই ডেটা কোচের কৌশলগত সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে। কোনো খেলোয়াড় যদি অবিশ্বাস্য গতিসম্পন্ন হন, তবে কোচ তাকে কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবলের জন্য উইঙ্গার হিসেবে শুরুর একাদশে রাখবেন, নাকি ম্যাচের শেষভাগে ‘ইমপ্যাক্ট সাবস্টিটিউট’ (বদলি খেলোয়াড়) হিসেবে নামাবেন তা নির্ধারণ করে দেয় এই প্রযুক্তি। টানা ম্যাচের ক্লান্তির মাঝে কোন খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দেওয়া দরকার, সেটিও লাইভ ডেটা ট্র্যাক করে ধরে ফেলেন বিজ্ঞানীরা।
ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের মতে, শুধু ভালো ডেটা থাকলেই একটি দল ম্যাচ জিতে যায় না। গিলের্মে পাসোস তাঁর একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, একবার ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা গিয়েছিল এক খেলোয়াড় ম্যাচে মাত্র ৬ কিলোমিটার দৌড়েছেন, যেখানে অন্য সতীর্থরা প্রায় দ্বিগুণ দৌড়ান। সংখ্যায় তাকে অলস মনে হলেও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল পজিশনিংয়ের কারণে কম দৌড়েও তিনি ছিলেন ম্যাচের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়।
এবারের বিশ্বকাপে ফিফা এবং লেনোভোর তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘ফুটবল এআই প্রো’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কোচদের মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ন মিলিয়ন ডেটা অ্যানালিসিস করে দেয়। তবে দিনশেষে মাঠের জয়-পরাজয় বা টেকনিক্যাল-মেন্টাল পারফরম্যান্সের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি মানুষের মস্তিষ্ক অর্থাৎ কোচ কার্লো আনচেলত্তিকেই নিতে হবে।
প্রযুক্তি হয়তো ব্রাজিলকে বিশ্বমঞ্চে তাদের সেরা ও সবচেয়ে ফিট দলটিকে মাঠে নামাতে সাহায্য করেছে, কিন্তু হেক্সার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না- তা আজ মাঠের সবুজ গালিচায় ভিনিসিয়ুস-রাফিনহাদের পায়ের জাদুই ঠিক করে দেবে।




