ইসলামে আত্মীয় স্বজনের হক আদায়ের কঠিন নির্দেশনা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১২:২১ পিএম
ইসলামে আত্মীয় স্বজনের হক আদায়ের কঠিন নির্দেশনা

আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা নিয়েই মানুষ এ পার্থিব জীবনে বেঁচে থাকে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় না থাকলে জীবন হয়ে যায় নীরস, আনন্দহীন, একাকী ও বিচ্ছিন্ন। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে হাদিসে। ইসলামি শরিয়তে সাধ্যানুযায়ী আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব। তবে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে অধিক নিকটতম আত্মীয়রা অগ্রাধিকার পাবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর নিকটাত্মীয়ের অধিকার রক্ষা করো।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৬)

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১৩৮)

আরও পড়ুন: কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়

আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতে হলে তাদের হক পুরোপুরি আদায় করতে হবে। কোনো রকম টালবাহানা করা যাবে না। এতে সম্পর্ক নষ্ট হয়। যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তাদের সঙ্গে আল্লাহ সম্পর্ক ছিন্ন করেন বলে কঠিন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে পবিত্র কোরআনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো, কোনো কিছুকেই তার সঙ্গে অংশীদার বানিয়ো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো, যারা (তোমাদের) ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন, আত্মীয় প্রতিবেশী, কাছের প্রতিবেশী, পাশের লোক, পথচারী ও তোমার অধিকারভুক্ত (দাস দাসী, তাদের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করো), অবশ্যই আল্লাহ তাআলা এমন মানুষকে কখনও পছন্দ করেন না, যে অহংকারী ও দাম্ভিক।’ (সুরা নিসা: ৩৬)

আরও পড়ুন: অহংকার জাহান্নামিদের চরিত্র, নিজেকে যাচাই করুন একবার

যোগাযোগ রক্ষা করা আত্মীয় স্বজনের অধিকার। এই হক আদায় না করলে গুনাহগার হতে হবে। এমনকি কেউ বিচ্ছিন্ন থাকলেও তার সঙ্গে অন্যরা যোগাযোগ রক্ষা করবে—এটাই ইসলামি নির্দেশনা। যে নিজের উদ্যোগে যোগাযোগ রক্ষা করে সে উত্তম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘... প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী সেই যে ব্যক্তি তার আত্মীয় তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সে তা রক্ষা করে চলে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৯১)

কোরআনের বর্ণনামতে সুন্দর আচরণ আত্মীয় স্বজনের অন্যতম অধিকার। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করো, আর উত্তম আচরণ করো নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে।’ (সুরা নিসা: ৩৬)

যদি আত্মীয় স্বজনের মধ্যে কেউ অভাবগ্রস্ত থাকেন, তাকে সহযোগিতার তাগিদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘কোনো মিসকিনকে দান করলে শুধু দানের সওয়াব আর আত্মীয়কে সহযোগিতা করলে দুটি সওয়াব—দান ও আত্মীয়তা রক্ষা।’ (সুনানে নাসায়ি: ২৫৮২)

আরও পড়ুন: দান-সদকার যত উপকার নগদে পাওয়া যায়

আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং খোঁজখবর নেওয়া আবশ্যক। কেননা রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে আহার করাও, রোগীর শুশ্রূষা করো এবং বন্দিদের মুক্ত করো।’ (সহিহ বুখারি: ৫৩৭৩)

ইসলামে আত্মীয়-স্বজনের মেহমানদারি অনেক বড় বিষয়। মেহমানদারি সাধারণ মুসলমানের অধিকার। আত্মীয় স্বজনের ব্যাপারে তা আরও দৃঢ়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে সে যেন মেহমানকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১৩৮)

দীনের ব্যাপারে সতর্ক করাও আত্মীয়ের হক। আত্মীয়রা পরস্পরের জাগতিক কল্যাণ কামনার মতো পরকালীন কল্যাণের ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক করবেন। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা তাহরিম: ৬)

আরও পড়ুন: জাহান্নামের আগুন থেকে পরিবারকে বাঁচাবেন যেভাবে

মুসলিম হিসেবে অন্যদের যেসব অধিকার রয়েছে আত্মীয়রা তাতে অগ্রাধিকার পাবে। শায়খ আবদুর রহমান বিন আয়িদ এমন ১৪টি অধিকার বর্ণনা করেছেন। যার মধ্যে আছে—সালাম আদান-প্রদান, স্নেহ ও সম্মান করা, আনন্দ-বেদনার অংশীদার হওয়া, দাওয়াত কবুল করা, জানাজায় অংশ নেওয়া, পরস্পর হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া, বিবাদ হলে মিটিয়ে দেওয়া, অনুপস্থিতিতে দোয়া করা ইত্যাদি। (http://www.saaid.net/rasael/252.htm)

মনে রাখতে হবে, যারা আত্মীয় স্বজনের অধিকার যারা রক্ষা করে না, সুসম্পর্ক বজায় রাখে না, তাদের জীবিকা সংকীর্ণ হয়ে যায়। এছাড়া হায়াত বৃদ্ধির জন্য আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা ইসলামে একটি বিশেষ আমল। এই আমলের যে যত গুরুত্ব দেবে, সে ততই রিজিকপ্রাপ্ত ও দীর্ঘ হায়াতপ্রাপ্ত হবে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রিজিক (জীবিকা) প্রশস্ত হওয়ার এবং আয়ু বৃদ্ধির প্রত্যাশা করে সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)

আলোচ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা বলেন, ‘এখানে জীবিকা ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির অর্থ হলো বরকত লাভ করা। ভালো কাজের সুযোগ হওয়া। সময় যথাযথ কাজে লাগানো এবং অপচয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া।’ (জাওয়াহিরুল হারিরিয়্যা: ২/৩৫২)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আত্মীয় স্বজনের হক আদায়ে সচেতনতা দান করুন। আত্মীয়তার সম্পর্ক পুরোপুরি রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।