সন্তান আল্লাহর নেয়ামত ও মা-বাবার জন্য আমানত। সে নামাজে অবহেলা করলে, ধর্মীয় বিষয়ে আগ্রহ হারালে বা খারাপ সঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে মা-বাবা দুশ্চিন্তায় পড়েন। তখন ধমক বা কঠোরতার বদলে ধৈর্য, ভালোবাসা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তাকে বোঝাতে হবে। হেদায়াত আল্লাহর হাতে, মা-বাবার দায়িত্ব চেষ্টা ও দোয়া চালিয়ে যাওয়া। নিচে সাতটি উপায় তুলে ধরা হলো।
১. নিজের জীবনাচরণে ইসলামের আদর্শ তুলে ধরুন
প্রথমে মা-বাবাকে নিজেদের জীবনাচরণ ঠিক করতে হবে। কারণ শিশুরা উপদেশের চেয়ে মা-বাবার কাজকর্ম বেশি অনুসরণ করে। মা-বাবা নামাজ পড়লে, সত্য কথা বললে, হালাল-হারাম মেনে চললে এবং মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করলে সন্তানও এসব গুণ শেখে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা তাহরিম: ৬)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা নিজেরা করো না? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অসন্তোষজনক।’ (সুরা সাফ: ২-৩)
তাই সন্তানকে ভালো হওয়ার উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের জীবনেও ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়ন করুন।
২. ছোটবেলা থেকেই নামাজের অভ্যাস গড়ে তুলুন
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নামাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫)
সন্তানকে নামাজের গুরুত্ব বোঝান। তাকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে যান, ঘরে জামাতে নামাজ পড়ুন এবং নামাজের সময় হলে স্নেহের সঙ্গে মনে করিয়ে দিন। নামাজে অনীহা দেখালে শুরুতেই ধমক না দিয়ে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। নামাজকে তার কাছে আনন্দদায়ক ও স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে গড়ে তুলুন।
আরও পড়ুন: যে ৩ দোয়ায় সন্তান হবে নেককার ও আদর্শবান: আল্লাহর শেখানো আমল
৩. কোরআন ও ইসলামের মৌলিক জ্ঞান শেখান
সন্তানকে নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত শেখান। পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক আকিদা, ইবাদত, হালাল-হারাম ও নবী-রাসুলদের জীবনী সম্পর্কে বয়স অনুযায়ী ধারণা দিন। শুধু মুখস্থ করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এসব শিক্ষার অর্থ ও প্রয়োজনীয়তাও বুঝিয়ে বলুন।
সন্তান ধর্মীয় বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করলে ধৈর্য ধরে উত্তর দিন। তার প্রশ্ন বা সংশয়কে অবাধ্যতা মনে করবেন না। কোনো বিষয়ে সঠিক উত্তর জানা না থাকলে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে তাকে বুঝিয়ে বলুন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকো।’ (সুরা তহা: ১৩২)
৪. সন্তানের বন্ধু ও পরিবেশের খোঁজ রাখুন
সন্তানের জীবনে বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি। ভালো বন্ধু তাকে ভালো কাজে উৎসাহিত করতে পারে, আবার খারাপ সঙ্গ তাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে এবং অনলাইনে কী ধরনের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
তাকে ভালো বন্ধু বেছে নিতে সাহায্য করুন। মসজিদকেন্দ্রিক শিশু-কিশোরদের কার্যক্রম, খেলাধুলা ও ভালো পরিবারের সন্তানদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ তৈরি করুন। তবে অকারণে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ না করে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখুন।
আরও পড়ুন: গুনাহ ছাড়তে চাইলে খারাপ সঙ্গ ও পরিবেশ বদলানো জরুরি
৫. ভালোবাসা ও কোমলতার সঙ্গে বোঝান
সন্তান ভুল করলে অপমান, ধমক বা কঠোর ভাষা ব্যবহার না করে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন। তার বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী কথা বলুন। ছোটদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করুন, কিশোরদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং যুক্তি দিয়ে বোঝান। বড় সন্তানদের মতামতকে গুরুত্ব দিন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে কাজে নম্রতা থাকে, তা সুন্দর হয়। আর যে কাজে নম্রতা থাকে না, তা ত্রুটিপূর্ণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৯৪)
সন্তানকে শাসন করার প্রয়োজন হলে উদ্দেশ্য যেন হয় তার সংশোধন, প্রতিশোধ বা রাগ প্রকাশ নয়।
৬. ভালো কাজের প্রশংসা করুন, বদদোয়া করবেন না
সন্তান ভালো কোনো কাজ করলে তার প্রশংসা করুন। নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত, সত্য কথা বলা কিংবা কাউকে সাহায্য করার মতো ছোট ছোট ভালো কাজেও তাকে উৎসাহ দিন। এতে ভালো কাজের প্রতি তার আগ্রহ বাড়বে।
পরিবারে ইসলামের পরিবেশ তৈরি করুন। নবী-রাসুল ও সাহাবিদের জীবনী শোনান, একসঙ্গে কোরআন পড়ুন এবং রমজান ও ঈদের মতো উপলক্ষগুলোকে ইবাদত ও আনন্দের মাধ্যমে উদ্যাপন করুন।
সন্তান অবাধ্যতা করলে রাগের মাথায় তার জন্য বদদোয়া করবেন না। রাসুলুল্লাহ (স.) সন্তানদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে নিষেধ করেছেন। (মেশকাত: ২২২৯)
মা-বাবার মুখের কথা সন্তানের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই হতাশ না হয়ে তার সংশোধনের জন্য দোয়া করুন এবং ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যান।
৭. সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করুন
সন্তানের হেদায়াত ও নেককার হওয়ার জন্য নিয়মিত আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। কারণ সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা মা-বাবা করতে পারেন, কিন্তু হেদায়াত আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের একটি দোয়া উল্লেখ করে বলেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখ জুড়ানো প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানান।’ (সুরা ফুরকান: ৭৪)
আরেকটি দোয়া হলো, ‘হে আমার রব! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন।’ (সুরা ইবরাহিম: ৪০)
গুরুতর সমস্যায় বাস্তব উদ্যোগ নিন
সন্তান মাদকাসক্তি, সহিংসতা, আত্মক্ষতি কিংবা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়লে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। শুধু উপদেশ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা না করে পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য, বিশ্বস্ত আলেম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের সহায়তা নিন।
সন্তানকে ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ধৈর্য, ভালোবাসা, সুন্দর পরিবেশ ও নিয়মিত দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবার আন্তরিক চেষ্টা কখনো বন্ধ হওয়া উচিত নয়।
তথ্যসূত্র: সুরা তাহরিম: ৬; সুরা তহা: ১৩২; সুরা ফুরকান: ৭৪; সুরা ইবরাহিম: ৪০; সহিহ মুসলিম: ২৫৯৪; মেশকাত: ২২২৯; সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫




