গুনাহে অভ্যস্ত হওয়ার শাস্তি শুধু পরকালে নয়, দুনিয়ার জীবনেও তিক্ত পরিণাম ভোগ করতে হয়। সার্বক্ষণিক যন্ত্রণা ও পেরেশানিমূখর জীবন অতিবাহিত করাও শাস্তি হিসেবে কম নয়। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গুনাহের কাজ ছেড়ে দেওয়ার বিকল্প নেই। আপনি গুনাহ ছেড়ে দিতে চান, আবার খারাপ সঙ্গ ও পরিবেশ বদলাতে চান না, এটা হয় না। তাই আপনাকে সবকিছুর আগে খারাপ সঙ্গ ও পরিবেশ বদলাতে হবে।
যদিও প্রথমে তাওবা করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। সুতরাং প্রথমে তাওবা করুন এবং তাওবা কবুলের শর্তগুলো মাথায় রাখুন। শর্তগুলো হলো— ১) কৃত গুনাহের ওপর অনুতপ্ত হওয়া ২) গুনাহ সম্পূর্ণ পরিহার করা ৩) ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা ৪) বান্দার হক নষ্ট করে থাকলে তা আদায় করা। (তিরমিজি: ৪০২, ফতোয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত: ২/২৩৯-২৪০)
বিজ্ঞাপন
খারাপ সঙ্গ ও পরিবেশ বদলান
খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন– ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে, অতঃপর কার সাথে বন্ধুত্ব করছ তা বিবেচনা করে নাও’। (সুনান তিরমিজি: ২৩৭৮)
যেই পরিবেশে ইন্টারনেট মোবাইল কম্পিউটার ব্যবহারের যত্রতত্র সুযোগ রয়েছে, তা ঢেলে সাজাতে হবে। প্রয়োজনীয় নেট-কম্পিউটার ইত্যাদি ব্যবহারের প্রয়োজন হলে তা যেন সবার নজরে পড়ে, এমনভাবে স্থাপন করতে হবে। এছাড়াও যে পরিবেশে অনাত্মীয় নারী, মাদক ইত্যাদি চোখের সামনে পড়ে, তা বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে অথবা সেই পরিবেশ ছেড়ে আপনাকে অন্য পরিবেশে চলে যেতে হবে। কেননা এগুলোই হচ্ছে গুনাহের পথ। কোরআন-হাদিসে আগে গুনাহের এই পথগুলো বন্ধ করার নির্দেশ এসেছে।
আরও পড়ুন
ব্যভিচারসহ ৬ কারণে রিজিক কমে যায়
যেসব অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গেও সহবাস করা হারাম
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা জেনা তথা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৩২) রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, চোখের ব্যভিচার হলো (বেগানা নারীকে) দেখা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো (তার সঙ্গে) কথা বলা (যৌন উদ্দীপ্ত কথা বলা)। (বুখারি: ৬২৪৩) রাসুলুল্লাহ (স.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘জিনাকারী যখন জিনায় লিপ্ত হয়, তখন সে মুমিন থাকে না। যখন কেউ মদপান করে, তখন সে মুমিন থাকে না। কেউ চুরি করার সময় মুমিন থাকে না এবং কোনো ছিনতাইকারী এমনভাবে ছিনতাই করে যে, ভুক্তভোগী তার দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকে; তখন সে (ছিনতাইকারী) মুমিন থাকে না। (সহিহ বুখারি: ৬৭৭২)
দ্রুত বিয়ে করুন
আপনি যদি যৌবনের কারণে গুনাহে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে দ্রুত বিয়ের চিন্তা করুন। প্রয়োজনে অভিভাবককে খোলাখুলি বিয়ের আগ্রহ ব্যক্ত করুন। এ ব্যাপারে দারিদ্র্যকে ভয় পাবেন না; আল্লাহ তার করুণায় অভাবমুক্ত করে দেবেন। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন–وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যবান ও মহাজ্ঞানী।’ (সুরা নুর: ৩২)
বিজ্ঞাপন
আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবতে থাকুন
এছাড়াও গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার অন্যতম উপায় আল্লাহওয়ালাদের সোহবতে থাকা। তাদের মজলিসে আসা যাওয়া করলে নফস নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাওবার উপর অটল থাকা সহজ হয়। নেককার মানুষের সোহবতে থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُواْ اللّهَ وَكُونُواْ مَعَ الصَّادِقِينَ হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক। (সুরা তাওবা: ১১৯)
রাসুলুল্লাহ (স.) জানিয়েছেন, ‘সৎ উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি বিয়ে করল আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৬৫৫)
আরও পড়ুন
গুনাহ নেকিতে পরিণত হয় যে আমলে
নেকি খেয়ে ফেলে যে ৬ গুনাহ
রোজায় অভ্যস্ত হোন
বিয়ে করা সম্ভব না হলে রোজা রাখার অভ্যাস করা যায়। যেমন কমপক্ষে আরবি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ রোজা রাখা এবং প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার অভ্যাস করা যায়। এতে পরকালীন বড় প্রতিদান ছাড়াও ইচ্ছার ওপর দৃঢ় থাকা, ধৈর্য, সহনশীলতা, নফসের খাহেশাত ও আনন্দদায়ক বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার শক্তি অর্জন হয়। অবিবাহিতদের রোজা রাখার এই উপদেশ নবীজি দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিবাহ করে। কেননা, বিবাহ তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং যৌনতাকে সংযমী করে এবং যাদের বিবাহ করার সামর্থ্য নাই, সে যেন রোজা পালন করে। কেননা, রোযা তার যৌনতাকে দমন করে। (বুখারি: ৪৯৯৬)
পরকালীন শাস্তির কথা স্মরণ করুন
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার আরেকটি বড় উপায় হলো- গুনাহের ইচ্ছা জাগলেই পরকালীন শাস্তির কথা স্মরণ করা। এমনকি নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গও কেয়ামতের দিন নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে—এরকম আয়াত ও হাদিসগুলো স্মরণ করা। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের এক আয়াতে এসেছে— ‘অবশেষে যখন তারা জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে, তখন তাদের কান, তাদের চোখ ও তাদের চামড়া তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তখন তারা তাদের চামড়াকে বলবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? উত্তর দিবে, আল্লাহ আমাদেরকে বাকশক্তি দান করেছেন, যিনি বাকশক্তি দান করেছেন প্রতিটি জিনিসকে।’ (সুরা হা-মীম আসসাজদাহ: ২০,২১)
নির্জনে থাকবেন না
এছাড়াও একাকী না থাকার চেষ্টা করা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়। গোপন পাপের শাস্তি সম্পর্কে নবীজি (স.) কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আমি আমার উম্মতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি, যারা কেয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালা সমতুল্য নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবে, কিন্তু মহামহিম আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যাই। তিনি বললেন, তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতোই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক, যারা একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত কর্মে লিপ্ত হবে।’ (ইবনে মাজা: ২/১৪১৮)
আল্লাহকে ভয় করুন
সবসময় আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের প্রত্যেকেরই চিন্তা করা উচিত আগামীকালের জন্য (পরকালের জন্য) সে কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা হাশর : ১৯)
সুতরাং মহান আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর বাণী- أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى ‘সে কি জানে না যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন।’ সবচেয়ে বেশি লজ্জা করা উচিত আল্লাহকে! যিনি ‘আলীম’ সর্বজ্ঞ; ‘সামী’ সর্বশ্রোতা; যিনি পিঁপড়ার পদধ্বনিও শুনতে পান। তিনি ‘বাসীর’ সর্বদ্রষ্টা। তিনি ‘খাবীর’ যিনি সবকিছুর খবর রাখেন। তিনি ‘মুহীত’ সবকিছু তাঁর আয়ত্ত্বাধীন, কোনো কিছু তাঁর পরিধির বাইরে নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গুনাহের কাজ ছেড়ে দেওয়ার তাওফিক দান করুন। কোরআন-হাদিসে বর্ণিত উপায়গুলো অবলম্বন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




