মানুষের উপকার করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অভাবীর প্রয়োজন পূরণ করা ও অসহায়কে সহযোগিতা করা- এসব কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। তবে উপকার করতে গিয়ে অনেকে এমন কিছু ভুল করেন, যা সওয়াব নষ্ট করে দিতে পারে। তাই মানুষের উপকার করার সময় পাঁচটি ভুল থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।
১. উপকার করে খোঁটা দেবেন না
কাউকে সাহায্য করার পর সেই সহযোগিতার কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া কিংবা তাকে অপমান করা গুরুতর অন্যায়। এতে উপকারের উদ্দেশ্য নষ্ট হয় এবং গ্রহীতার মনেও কষ্ট তৈরি হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান বরবাদ করো না।’ (সুরা বাকারা: ২৬৪)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তিন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। তাদের একজন হলো, যে দান করে খোঁটা দেয়। অন্য দুজন হলো, যে মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করে এবং যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করে। (সহিহ মুসলিম: ১০৬)
তাই কাউকে সাহায্য করার পর সেই সহযোগিতার কথা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেবেন না। তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কখনো তাকে ছোট করবেন না।
২. লোকদেখানো উদ্দেশ্যে উপকার করবেন না
মানুষের প্রশংসা পাওয়া, সুনাম অর্জন কিংবা সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে উপকার করা থেকে বিরত থাকুন। একজন মুমিনের ভালো কাজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাবার দান করে। তারা বলে, আমরা তো তোমাদের খাওয়াই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও চাই না।’ (সুরা দাহর: ৮-৯)
আরও পড়ুন: দানের ভিডিও বানালে কি রিয়া হবে?
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। তাদের একজন হলো, যে এত গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কী খরচ করেছে, বাম হাত তা জানতে পারে না। (সহিহ বুখারি: ১৪২৩; সহিহ মুসলিম: ১০৩১)
তাই সাহায্য করে নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা কিংবা প্রশংসা পাওয়ার চেষ্টা করবেন না। সম্ভব হলে গোপনে সহযোগিতা করুন। এতে নিজের নিয়তকে লোকদেখানো মনোভাব থেকে রক্ষা করা সহজ হয়।
৩. সাহায্য করতে গিয়ে মানুষের সম্মান নষ্ট করবেন না
অনেকে সাহায্য করার সময় গ্রহীতাকে ছোট করে কথা বলেন। কেউ কেউ অভাবী মানুষের ছবি তুলে বা তার অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করে প্রচার করেন। এতে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিব্রত ও অপমানিত হতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ভালো কথা ও ক্ষমা সেই দানের চেয়ে উত্তম, যার পরে কষ্ট দেওয়া হয়।’ (সুরা বাকারা: ২৬৩)
তাই কাউকে সাহায্য করার সময় তার আত্মসম্মানের প্রতি খেয়াল রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া তার পরিচয়, অভাব কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা অন্যের কাছে প্রকাশ করবেন না। এমনভাবে সহযোগিতা করুন, যাতে সে নিজেকে ছোট মনে না করে।
আবার অনেক অভাবী মানুষ আত্মসম্মানের কারণে কারও কাছে সাহায্য চান না। তাই লজ্জায় মুখ ফুটে না বলা এমন অভাবীদেরও খোঁজ নেওয়া জরুরি। (সুরা বাকারা: ২৭৩)
৪. অন্যায় কাজে সহযোগিতা করবেন না
মানুষের উপকার করার অর্থ তার সব আবদার পূরণ করা নয়। কেউ সাহায্যের কথা বলে অন্যায় কাজে সহযোগিতা চাইলে তাতে সাড়া দেওয়া যাবে না। যেমন- কারও মিথ্যা বক্তব্য সমর্থন করা, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করতে সাহায্য করা কিংবা জুলুমের কাজে পাশে দাঁড়ানো।
আরও পড়ুন: অন্যায়ের প্রতিবাদ জরুরি ইবাদত
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়েদা: ২)
তাই কেউ অন্যায় করলে তাকে সমর্থন না করে সঠিক পথে ফেরার পরামর্শ দিন। প্রকৃত উপকার হলো মানুষকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে রাখা এবং ভালো কাজে সহযোগিতা করা।
৫. নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব উপেক্ষা করবেন না
অন্যের উপকার করতে গিয়ে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন উপেক্ষা করা ঠিক নয়। অনেকে সাহায্য করার আগ্রহে পরিবারের হক নষ্ট করেন, সামর্থ্যের বাইরে ঋণ করেন কিংবা নিজের জরুরি দায়িত্ব অবহেলা করেন।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ব্যয়ের ভারসাম্য সম্পর্কে বলেন, ‘তারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না, কৃপণতাও করে না। এ দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করে।’ (সুরা ফুরকান: ৬৭)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমার ওপর তোমার পরিবারেরও হক রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৬৮)
তাই অন্যকে সাহায্য করার আগে নিজের সামর্থ্য ও দায়িত্ব বিবেচনা করুন। পরিবারের প্রাপ্য অধিকার নষ্ট করে কিংবা সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সহযোগিতা করবেন না। যতটুকু সম্ভব, আন্তরিকতার সঙ্গে ততটুকুই করুন।
উপকার হোক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
মানুষের উপকার করা মহৎ আমল। তবে উপকারের পাশাপাশি গ্রহীতার সম্মান রক্ষা, নিয়ত শুদ্ধ রাখা এবং নিজের দায়িত্ব পালনের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। মানুষের প্রশংসা বা কৃতজ্ঞতার অপেক্ষা না করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালো কাজ করুন। মনে রাখবেন, মানুষ আপনার উপকারের কথা ভুলে গেলেও আল্লাহ কোনো সৎকর্মের প্রতিদান নষ্ট করেন না।
তথ্যসূত্র: পসুরা বাকারা: ২৬৩-২৬৪, ২৭৩; দাহর: ৮-৯; মায়েদা: ২; ফুরকান: ৬৭; সহিহ মুসলিম: ১০৬, ১০৩১; সহিহ বুখারি: ১৪২৩, ১৯৬৮




