রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

দানের ভিডিও বানালে কি রিয়া হবে? ইসলামের স্পষ্ট জবাব

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ০২:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

দানের ভিডিও বানালে কি রিয়া হবে? ইসলামের স্পষ্ট জবাব

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে দান-খয়রাতের ভিডিও বা ছবি প্রকাশ করা সাধারণ একটি ঘটনা। অনেকেই এটিকে রিয়া বা লোকদেখানো আমল বলে মনে করেন, আবার অনেকে মনে করেন, এ ধরনের ভিডিও মানুষের মধ্যে দানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টির সঠিক মূল্যায়ন কী? কোরআন-হাদিসের দলিলনির্ভর ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো।

রিয়া কী এবং কেন এটি গুরুতর গুনাহ

লোক দেখানো আমলকে রিয়া বলা হয়। এটি ইখলাস বা নিষ্ঠাকে নষ্ট করে দেয় এবং আমলকে আল্লাহর দরবারে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি লোক শোনানো ইবাদাত করে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার লোক শোনানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানো ইবাদাত করবে আল্লাহ তার লোক দেখানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন। (সহিহ বুখারি: ৬৪৯৯) 

অন্য হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘আমি তোমাদের উপর যে জিনিসটিকে বেশি ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক। সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! ছোট শিরক কী? তিনি উত্তর দিলেন, রিয়া। আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন যখন মানুষকে তাদের আমলের বিনিময় দেবেন, তখন রিয়াকারীকে বলবেন- যাও দুনিয়াতে যাদের তোমরা তোমাদের আমল দেখাতে তাদের নিকট যাও, কোনো সাওয়াব পাও কি না দেখো।’ (মুসনাদে আহমদ: ২৩৬৮১)

আরও পড়ুন: যাদের দান করলে সওয়াব বেশি

প্রকাশ্যে দান করা কি নিষিদ্ধ?

ইসলাম প্রকাশ্যে দান করাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং সঠিক নিয়তের ওপর ভিত্তি করে এটি প্রশংসিতও হতে পারে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা প্রকাশ্যে দান করলে তা ভালো; আর গোপনে দান করলে এবং ফকিরকে দিলে সেটা তোমাদের জন্য আরও বেশি ভালো।’ (সুরা বাকারা: ২৭১) কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘যারা নিজের সম্পদ দিনে বা রাতে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে আল্লাহর পথে খরচ করে তাদের পুরস্কার প্রতিপালকের কাছে আছে।’ (সুরা বাকারা: ২৭৪) 

নবীজি (স.) সাহাবিদের প্রকাশ্যে দানে নিরুৎসাহিত করেননি; বরং উৎসাহিত করতেন। এতে বোঝা যায়, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ্য দান করা সওয়াবের কাজ ও সুন্নাহসম্মত। তবে গোপন দান বেশি সওয়াবের ও রিয়ার সম্ভাবনা কম। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় দানের ভিডিও জায়েজ নাকি রিয়া?

আজকাল দানের ভিডিও বা ছবি পোস্ট করার পেছনে মানুষের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যদি উদ্দেশ্য হয় অন্যদের দানে উৎসাহিত করা, মানবিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা, কোনো সংস্থার কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কিংবা দাওয়াহমূলক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া- তাহলে এ ধরনের ভিডিও করা জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ হতে পারে। কারণ উদ্দেশ্য এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের উপকার।

কিন্তু যদি ভিডিও করার উদ্দেশ্য হয় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, লাইক-শেয়ার বাড়ানো, নিজেকে প্রচার করা, দানগ্রহীতাকে হেয় করা বা তার কষ্টকে ব্যবহার করে নিজের সুনাম অর্জন করা- তাহলে এটি রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিখ্যাত হাদিস ‘সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি: ১)—এই নীতিকে স্পষ্ট করে দেয়। নিয়ত সঠিক না হলে আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।

আরও পড়ুন: অন্তত একটি আমল গোপন রাখতে পারলে পরকালে যে লাভ হবে

দানের ভিডিও করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা

দানের ভিডিও করতেই হলে দানগ্রহীতার সম্মান রক্ষা করা প্রথম দায়িত্ব। তাদের মুখ বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করা উত্তম। নিজের প্রশংসা বা অহংকার প্রকাশ হয়—এমন বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, দানের কথা প্রচার করো না এবং কষ্ট দিয়ে (খোঁটা দিয়ে) তোমাদের দান ওই ব্যক্তির মতো ব্যর্থ করো না, যে নিজের ধন সম্পদ কেবল লোক দেখানোর জন্যই ব্যয় করে।’ (সুরা বাকারা: ২৬৪)

তাই ভিডিও তৈরির আগে, তৈরি করার সময় এবং প্রকাশের পরেও নিজের নিয়ত পরখ করা জরুরি; এতে রিয়া থেকে বাঁচা সহজ হয়। তবে যেকোনো অবস্থায় গোপনে দান করাই উত্তম এবং বেশি সওয়াবের কাজ।

সর্বোপরি, দানের ভিডিও নিয়তের উপর নির্ভরশীল। গোপনে দান সর্বোত্তম, তবে সামাজিক উদ্দেশ্যে প্রকাশ্য দানও জায়েজ, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর