বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বাবা ও সন্তানের কার কী দায়িত্ব?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

বাবা ও সন্তানের কার কী দায়িত্ব?

ইসলাম বাবা ও সন্তানের সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসার পাশাপাশি অধিকার ও দায়িত্বও নির্ধারণ করেছে। বাবা যেমন সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি করবেন, তেমনি সন্তানকেও বাবার প্রতি কর্তব্য পালন করতে হবে। কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে অন্যজনের অবহেলার অজুহাত হয় না।

সন্তানের প্রতি বাবার দায়িত্ব

সন্তান আল্লাহর দেওয়া এক মূল্যবান উপহার। সন্তান যেমন মা-বাবার জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে, তেমনি তাকে সঠিকভাবে লালন-পালন করে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও মা-বাবার। আল্লাহ তাআলা সন্তানদের দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সুরা কাহাফ: ৪৬)

১. ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা

সন্তানের খাবার, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে। সন্তানকে অভাবের মধ্যে ফেলে রাখা বা তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা ঠিক নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সীমিত করা হয়েছে, সে যেন আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা তালাক: ৭)

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির গুনাহগার হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যাদের ভরণপোষণের দায়িত্বে রয়েছে, তাদের অবহেলা করে।’ (সুনান আবু দাউদ: ১৬৯২)

২. দ্বীনি শিক্ষা ও উত্তম চরিত্র গড়ে তোলা

সন্তানকে লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি ঈমান, নামাজ, হালাল-হারাম, শিষ্টাচার ও মানুষের অধিকার সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে। ছোটবেলা থেকেই ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো শেখানো এবং নিজের আচরণের মাধ্যমে ভালো উদাহরণ তৈরি করা বাবার দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম: ৬)

রাসুলুল্লাহ (স.) সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দিতে বলেছেন। (সুনান আবু দাউদ: ৪৯৪)

আরও পড়ুন: ইসলামে যে শিক্ষা শিশুদের অধিকার

৩. সন্তানদের জন্য দোয়া করা

সন্তানের ঈমান, চরিত্র ও কল্যাণের জন্য বাবার নিয়মিত দোয়া করা উচিত। শুধু দুনিয়ার সাফল্য নয়, সন্তান যেন দ্বীনের ওপর চলতে পারে এবং আখেরাতে সফল হয়, সে জন্যও দোয়া করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এই দোয়া শিখিয়েছেন, ‘হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানান।’ (সুরা ফুরকান: ৭৪)

৪. সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা

একাধিক সন্তান থাকলে তাদের প্রতি আচরণে ন্যায়বিচার করতে হবে। উপহার বা সম্পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অকারণে একজনকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা উচিত নয়। প্রত্যেক সন্তানের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

নুমান ইবনে বশির (রা.)-এর বর্ণনায়, তাঁর বাবা তাঁকে বিশেষ উপহার দিলে রাসুলুল্লাহ (স.) জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি সব সন্তানকে একইভাবে দিয়েছেন? তিনি না বললে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।’ (সহিহ বুখারি: ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম: ১৬২৩)

৫. ভালোবাসা ও সময় দেওয়া

সন্তানের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভুল করলে বুঝিয়ে বলা, ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং বিপদে পাশে থাকাও বাবার দায়িত্ব। সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে নির্ভয়ে নিজের সমস্যা বাবাকে জানাতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (স.) শিশুদের প্রতি স্নেহশীল ছিলেন। একবার তিনি হাসান (রা.)-কে চুমু দিলে এক ব্যক্তি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমার দশটি পুত্র রয়েছে, আমি তাদের কোনোদিন চুমু দেইনি। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৯৭)

৬. নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের ব্যবস্থা করা

সন্তানকে শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করা বাবার দায়িত্ব। তার শিক্ষা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে হবে। উপযুক্ত বয়সে বিয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে এ বিষয়েও সহযোগিতা করা উচিত।

আরও পড়ুন: সন্তানের জন্য পাঁচটি দোয়া করতে ভুলবেন না

আল্লাহ তাআলা অবিবাহিত নারী-পুরুষের বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা নুর: ৩২)। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে সন্তানের সম্মতি ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। জোর করে বিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব

১. সম্মান ও সদাচরণ করা

বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় ভদ্রতা বজায় রাখা, তাকে অপমান না করা এবং দুর্ব্যবহার থেকে বিরত থাকা সন্তানের কর্তব্য। মতের অমিল হলেও গালাগাল বা অপমানজনক আচরণ করা যাবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের উফ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৩)

এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা মা-বাবার জন্য দোয়া করতে বলেছেন, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৪)

২. বৈধ বিষয়ে বাবার আনুগত্য করা

বাবা-মায়ের বৈধ নির্দেশ মান্য করা সন্তানের দায়িত্ব। তবে কোনো নির্দেশে আল্লাহর অবাধ্যতা করতে হলে তা মানা যাবে না। এ ক্ষেত্রেও বাবার সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাদের আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করো।’ (সুরা লুকমান: ১৫)

অর্থাৎ, গুনাহের কাজে বাবার আনুগত্য করা যাবে না। তবে এ কারণে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অনুমতিও নেই।

৩. প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা

বাবা বৃদ্ধ, অসুস্থ বা অসহায় হয়ে পড়লে তার সেবা করা, প্রয়োজনীয় খরচে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা এবং দেখাশোনা করা সন্তানের দায়িত্ব। বিশেষত বাবা যখন নিজের প্রয়োজন পূরণে অক্ষম হন, তখন তাকে অবহেলা করা গুরুতর অন্যায়।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করেন, তার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসুলুল্লাহ (স.) পরপর তিনবার বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৭১; সহিহ মুসলিম: ২৫৪৮)

রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি তার মা-বাবার একজন বা উভয়কে বার্ধক্যে পেয়েও তাদের সেবা করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না, সে বড়ই দুর্ভাগা। (সহিহ মুসলিম: ২৫৫১)

৪. বাবার সম্মান ও সম্পদের অধিকার রক্ষা করা

বাবার অনুপস্থিতিতে তার সম্মানহানি হয়, এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। তার ব্যক্তিগত বিষয় অকারণে প্রকাশ করা বা তার সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না। বাবার জীবদ্দশায় তার সম্পদ নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার অধিকারও সন্তানের নেই।

বাবার সঙ্গে মতবিরোধ হলে তা শালীনভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। তার ভুল দেখলে অপমান না করে সম্মানের সঙ্গে বোঝানো উচিত।

৫. বাবা অন্যায় করলে কী করবে?

বাবা হলেই তার প্রতিটি আচরণ সঠিক হয়ে যায় না। তিনি সন্তানের প্রতি অন্যায় করলে সন্তান সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে। তবে প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতিতে শালীনতা বজায় রাখা উচিত।

বাবা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করলে নিজের নিরাপত্তার জন্য দূরত্ব বজায় রাখা বৈধ। প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে থাকা এবং বিশ্বস্ত মানুষের সহায়তা নেওয়া যাবে। বাবার প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ নিজের জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা নয়।

বাবার মৃত্যুর পর সন্তানের দায়িত্ব

বাবা মারা যাওয়ার পরও তার প্রতি সন্তানের কিছু দায়িত্ব থাকে। তার জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা, বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন করা, ঋণ থাকলে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় এর ব্যতিক্রম। এর মধ্যে একটি হলো নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)

তাই বাবার মৃত্যুর পর তার জন্য নিয়মিত দোয়া করা, মানুষের পাওনা আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া এবং তার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সদাচরণ করা উচিত।

বাবা ও সন্তানের পারস্পরিক দায়িত্ব

বাবা সন্তানের অধিকার আদায় করবেন, তাকে স্নেহ ও সঠিক শিক্ষা দেবেন। সন্তান বাবাকে সম্মান করবে, বৈধ বিষয়ে আনুগত্য করবে এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াবে। প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করলে বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক ভালোবাসা, সম্মান ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: সুরা কাহাফ: ৪৬, সুরা তালাক: ৭; তাহরিম: ৬; ফুরকান: ৭৪; নুর: ৩২; বনি ইসরাইল: ২৩-২৪; লুকমান: ১৫; সহিহ বুখারি: ২৫৮৭, ৫৯৯৭, ৫৯৭১; সহিহ মুসলিম: ১৬২৩, ২৫৪৮, ২৫৫১, ১৬৩১; আবু দাউদ: ৪৯৪, ১৬৯২

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর