মানুষ অনেক টাকা আয় করেও মানসিক অশান্তিতে থাকতে পারে, আবার সীমিত আয়েও তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করতে পারে। কারণ, রিজিকের বরকত মানে শুধু অর্থের পরিমাণ বেশি হওয়া নয়। উপার্জন দিয়ে প্রয়োজন পূরণ, পরিবারে শান্তি, সুস্থতা, সময়ের সদ্ব্যবহার এবং সম্পদ কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার সামর্থ্যও বরকতের প্রকাশ।
এখন প্রশ্ন হলো, বিয়েবহির্ভূত প্রেমের সম্পর্ক বা হারাম রিলেশনে জড়ালে কি আয়-রোজগারের বরকত কমে যায়? কোরআন-হাদিসের আলোকে বিষয়টি বুঝতে হলে পাপের পরিণতি, তাকওয়া, হালাল উপার্জন এবং তাওবার গুরুত্ব সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
হারাম সম্পর্ক কেন নিষিদ্ধ?
ইসলামে ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়। তবে ভালোবাসার নামে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যভিচার, অশ্লীল আচরণ কিংবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কাজ থাকলে তা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা ইসরা: ৩২)
এখানে শুধু ব্যভিচার করতে নিষেধ করা হয়নি, এর কাছাকাছি নিয়ে যায় এমন কাজ থেকেও দূরে থাকতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই নির্দেশ মুমিন নারীদেরও দেওয়া হয়েছে। (সুরা নূর: ৩০-৩১)
তাই বিয়ের ইচ্ছা থাকলেও হারাম রিলেশন বা নিষিদ্ধ আচরণ বৈধ হয়ে যায় না।
আরও পড়ুন: অবৈধ সম্পর্ক থাকাবস্থায় ইবাদত কবুল হবে?
পাপ কি রিজিকের বরকত কমিয়ে দিতে পারে?
কোরআন-হাদিসে পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর আনুগত্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাপ মানুষের জীবন ও পরিণতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রতিটি পাপের পরই আয় কমে যাবে কিংবা আর্থিক সংকট দেখা দেবে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা আরাফ: ৯৬)
এ আয়াতে ঈমান ও তাকওয়ার সঙ্গে বরকতের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের উচিত পাপ থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকুচিত।’ (সুরা তহা: ১২৪)
এই আয়াত আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে। অর্থসম্পদ থাকার পরও মানুষের জীবনে অতৃপ্তি ও অশান্তি থাকতে পারে। তবে কারও আর্থিক সংকটকে তার পাপের শাস্তি বলে নিশ্চিত করা যায় না।
পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হওয়ার হাদিস
এ বিষয়ে সুনানে ইবনে মাজাহতে একটি বর্ণনা এসেছে, ‘মানুষ তার পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০২২)
তবে এই বর্ণনার বিশুদ্ধতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু মুহাদ্দিস বর্ণনাটিকে দুর্বল বলেছেন, আবার অন্যদের মূল্যায়নে এটি গ্রহণযোগ্য। তাই এই বর্ণনার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে হারাম রিলেশনে জড়ালেই কারও আয় কমে যাবে কিংবা সম্পদের বরকত উঠে যাবে।
আরও পড়ুন: বিয়ের উদ্দেশ্যে প্রেম করা কি জায়েজ?
হারাম সম্পর্ক জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
কোনো সম্পর্ক যদি গোপনীয়তা, মিথ্যা, প্রতারণা, অতিরিক্ত আসক্তি কিংবা নিষিদ্ধ আচরণের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে তা দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা, অপরাধবোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সময়ের অপচয় তৈরি হতে পারে। এর ফলে কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া, দায়িত্ব পালনে সমস্যা কিংবা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এসব সম্ভাব্য প্রভাব, প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটবেই তা নয়। তবে ইসলাম দৃষ্টি সংযত রাখতে, অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকতে এবং আল্লাহর সীমা মেনে চলতে নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ: ২৮)
অন্তরের প্রশান্তিও মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। তাই কোনো সম্পর্ক যদি আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়, তবে নিজের আচরণ ও সম্পর্কের ধরন নিয়ে আন্তরিকভাবে ভাবা প্রয়োজন।
তাওবা করলে কি কল্যাণের আশা করা যায়?
কেউ হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেও তার জন্য তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে ভুল স্বীকার করা, পাপ ছেড়ে দেওয়া এবং পুনরায় সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার সংকল্প করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা যুমার: ৫৩)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন।’ (সুরা নুহ: ১০-১২)
এ আয়াতগুলোতে ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর অনুগ্রহের কথা এসেছে। তাই ভুল বুঝতে পারলে আন্তরিক তাওবা করে জীবন সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। দুজনের মধ্যে বিয়ের বাস্তব সুযোগ থাকলে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর বিয়ে সম্ভব না হলে নিষিদ্ধ সম্পর্ক থেকে সরে আসা উচিত।
আয়-রোজগারে বরকত চাইলে কী করবেন?
হারাম থেকে বেঁচে থাকুন: সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা মেনে চলুন।
আন্তরিক তাওবা করুন: ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং পাপ ছেড়ে দিন।
হালাল উপার্জন করুন: প্রতারণা, সুদ ও অন্যায় উপায়ে আয় করা থেকে বিরত থাকুন।
নামাজ ও আল্লাহর স্মরণে যত্নবান হোন: নিয়মিত ইবাদত করুন এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ চান।
দান-সদকা করুন: সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন এবং সম্পদের হক আদায় করুন।
নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন: সময়, সুস্থতা ও সম্পদকে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্র: সুরা ইসরা: ৩২; নূর: ৩০-৩১; আরাফ: ৯৬; তহা: ১২৪; রাদ: ২৮; যুমার: ৫৩; নুহ: ১০-১২; ইবনে মাজাহ: ৪০২২




