ইসলামে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ফরজ গোসলের বিধান রয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তোমরা অপবিত্র অবস্থায় থাকো, তবে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করো।’ (সুরা মায়েদা: ৬) কিন্তু সঠিক নিয়ম না জানার কারণে অনেকে এমন ভুল করেন যে, গোসলের ফরজ আদায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শরীরের সব জায়গায় পানি পৌঁছানো থেকে শুরু করে চুলের গোড়া ভেজানো পর্যন্ত কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। জেনে নিন, ফরজ গোসলের সময় যে পাঁচটি ভুল এড়িয়ে চলবেন।
১. কুলি ও নাকে পানি দিতে ভুলে যাওয়া
অনেকে গোসলের সময় শুধু শরীরে পানি ঢালেন, কিন্তু কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়ার বিষয়টি ভুলে যান। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ফরজ গোসলের তিনটি ফরজের মধ্যে কুলি করা ও নাকের ভেতরে পানি পৌঁছানো অন্যতম।
করণীয়: মুখের ভেতরে পানি নিয়ে কুলি করুন এবং নাকের নরম অংশ পর্যন্ত পানি পৌঁছান। নাকে পানি দেওয়ার পর বাম হাত দিয়ে পরিষ্কার করা যায়। রোজা অবস্থায় গোসল করলে নাকে পানি দেওয়ার সময় অতিরিক্ত গভীরে পানি টানা থেকে বিরত থাকুন।
২. শরীরের কোনো অংশ শুকনো রাখা
ফরজ গোসলের সময় পুরো শরীরে পানি পৌঁছানো জরুরি। অসতর্কতার কারণে নাভি, বগল, কানের ভাঁজ, আঙুলের ফাঁক কিংবা শরীরের অন্য কোনো অংশ শুকনো থেকে যেতে পারে। শরীরে পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় এমন কোনো আবরণ থাকলেও গোসল অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
করণীয়: গোসলের সময় শরীরের ভাঁজ ও আড়ালে থাকা অংশগুলোতে পানি পৌঁছেছে কি না, খেয়াল রাখুন। নখে নেইলপলিশ বা ত্বকে শক্ত আঠার মতো পানি প্রতিরোধী আবরণ থাকলে তা সরিয়ে নিন। আংটি বা অন্য কোনো অলংকারের নিচে পানি পৌঁছাতেও খেয়াল রাখুন। তবে মেহেদির মতো শুধু রং থেকে গেলে এবং পানি পৌঁছাতে বাধা না দিলে তা সরানোর প্রয়োজন নেই।
আরও পড়ুন: অসুস্থ ব্যক্তি ফরজ গোসল করতে না পারলে অজু করলেই পবিত্র হবে?
৩. চুলের গোড়ায় পানি না পৌঁছানো
ফরজ গোসলের সময় মাথার চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো জরুরি। অনেকে মনে করেন, মাথায় পানি ঢাললেই গোসল সম্পন্ন হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ফরজ গোসলের সময় নারীদের বেণী বা খোঁপা খুলতেই হবে। আসলে বিষয়টি এমন নয়।
উম্মে সালামা (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-কে ফরজ গোসলের সময় চুলের বেণী খোলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, মাথায় তিন আঁজলা পানি ঢেলে এরপর পুরো শরীরে পানি ঢাললেই পবিত্রতা অর্জন করা যাবে। (সহিহ মুসলিম: ৩৩০)
করণীয়: নারীদের বেণী বা খোঁপা বাঁধা থাকলে তা না খুলেও গোসল করা যায়, যদি চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তবে চুলের গোড়ায় পানি না পৌঁছালে বেণী বা খোঁপা খুলতে হবে। আর চুল খোলা থাকলে গোড়াসহ পুরো চুলে পানি পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। (আল-বাহরুর রায়েক: ১/৫৪)
৪. গোসলে পানির অপচয় করা
ফরজ গোসলের সময় শরীরের সব অংশে পানি পৌঁছানো জরুরি। তবে এ জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা উচিত নয়। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় শাওয়ার চালিয়ে রাখেন বা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি ঢালেন।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) পাঁচ মাকুক পানি দিয়ে গোসল করতেন এবং এক মাকুক পানি দিয়ে অজু করতেন। (সহিহ মুসলিম: ৩২৫)
করণীয়: শরীরের সব অংশে পানি পৌঁছানো নিশ্চিত করে প্রয়োজনমতো পানি ব্যবহার করুন। হাদিসে বর্ণিত পানির পরিমাণকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক সীমা মনে করা ঠিক নয়। মূল বিষয় হলো, পবিত্রতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার করা এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা।
আরও পড়ুন: যেসব কারণে গোসল ফরজ হয়
৫. গোসলের পর অযথা সন্দেহ করা
গোসল শেষ করার পর কারও মনে সন্দেহ হয়, শরীরের কোনো অংশে পানি পৌঁছেছে কি না। এরপর অনেকে আবার গোসল করেন। এভাবে বারবার গোসল করার অভ্যাস অযথা মানসিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
করণীয়: গোসলের সময় স্বাভাবিকভাবে সব ফরজ আদায় করার চেষ্টা করুন। গোসল শেষ হওয়ার পর শুধু সন্দেহের কারণে আবার গোসল করার প্রয়োজন নেই। তবে নিশ্চিতভাবে জানা গেলে যে কোনো ফরজ অংশে পানি পৌঁছায়নি, তাহলে সেই অংশে পানি পৌঁছাতে হবে।
সুন্নত পদ্ধতিতে গোসল করুন
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) জানাবাতের গোসলের সময় প্রথমে দুই হাত ধুতেন। এরপর ডান হাতে পানি নিয়ে বাম হাতে ঢেলে লজ্জাস্থান পরিষ্কার করতেন। তারপর নামাজের অজুর মতো অজু করতেন। এরপর চুলের গোড়ায় আঙুল দিয়ে পানি পৌঁছাতেন এবং মাথায় তিন আঁজলা পানি ঢালতেন। সবশেষে পুরো শরীরে পানি ঢেলে পা ধুতেন। (সহিহ মুসলিম: ৩১৬)
গোসলের এই সুন্নত পদ্ধতি অনুসরণ করলে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করা সহজ হয়।
ফরজ গোসলের কিছু বিধানে মাজহাবভেদে পার্থক্য রয়েছে। তাই নিজের অনুসৃত মাজহাব অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে নেওয়া ভালো। আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে পবিত্রতা অর্জন করে ইবাদত করার তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সুরা মায়েদা: ৬; সহিহ বুখারি: ২৪৮; সহিহ মুসলিম: ৩১৬, ৩২৫, ৩৩০।




