সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার আগেই তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ, সন্দেহ ও বিভ্রান্তি। এর ফলে ব্যক্তির সম্মানহানি থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা পর্যন্ত সৃষ্টি হচ্ছে। গুজবের ক্ষতি ঠেকাতে তাই সংবাদ যাচাই জরুরি। কোরআন ও সুন্নাহয় সংবাদ যাচাই, ভিত্তিহীন সন্দেহ পরিহার এবং প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলাম এই দায়িত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। কোরআন মানুষকে সংবাদ যাচাই করতে, ভিত্তিহীন সন্দেহ এড়িয়ে চলতে এবং প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিতে নির্দেশ দেয়।
শোনা কথা প্রচারও মিথ্যা
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৫)
এই হাদিসের শিক্ষা স্পষ্ট যে, কোনো কথা নিজে বানিয়ে না বললেও যাচাই ছাড়াই প্রচার করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। কারণ ব্যক্তিগত আলাপের একটি কথা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা অল্প সময়েই বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে তথ্যটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও প্রথম প্রচারের ক্ষতি সব সময় পূরণ করা সম্ভব হয় না।
গুজবকে তুচ্ছ মনে করার বিপদ
অনেকে মনে করেন, একটি পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা কারও সম্পর্কে শোনা কথা অন্যকে জানানো তেমন গুরুতর কিছু নয়। অথচ অপবাদ ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রচারের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সে বিষয়ে কোরআন সতর্ক করেছে।
সুরা নূরে অপবাদের একটি ঘটনার প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ব্যাপারটিকে তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ তা আল্লাহর কাছে ছিল গুরুতর।’ (সুরা নূর: ১৫)
আরও পড়ুন: ধর্মীয় গুজব যাচাই করুন এই ৭ উপায়ে
আয়াতটি নির্দিষ্ট একটি অপবাদের ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাজিল হলেও এর শিক্ষা হলো, কোনো কথা মানুষের কাছে তুচ্ছ মনে হলেই তা নৈতিকভাবে তুচ্ছ হয়ে যায় না। কারও সম্মান নিয়ে কথা বলা কিংবা প্রমাণহীন অভিযোগ ছড়ানোর পরিণতি ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই গুরুতর হতে পারে।
এ কারণে কোনো তথ্য প্রচারের আগে সেটি সত্য কি না এবং প্রচার করলে কারও ক্ষতি হতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
গুজবের বিস্তার কেন দ্রুত হয়
মানুষ সাধারণত এমন তথ্যের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, যা তার আবেগকে নাড়া দেয়, ভয় বা ক্ষোভ তৈরি করে কিংবা আগে থেকে থাকা ধারণাকে সমর্থন করে। ফলে উত্তেজনাপূর্ণ কোনো দাবি যাচাইয়ের আগেই অনেকে ছড়িয়ে দেন।
২০১৮ সালে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টুইটারে ছড়ানো প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার সত্য ও মিথ্যা খবর বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, মিথ্যা খবর সত্য খবরের তুলনায় বেশি দূর, দ্রুত ও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক খবরের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ছিল আরও স্পষ্ট। গবেষকেরা আরও দেখেছেন, মিথ্যা খবরের বিস্তারে মানুষের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে গবেষণাটি টুইটারে ছড়ানো খবর নিয়ে, তাই এর ফল সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রে হুবহু একই বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
এই ফলাফল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে- কোনো তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। অনেক সময় নতুন, চমকপ্রদ কিংবা আবেগ উসকে দেওয়া দাবিই বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
অনুমান ও সন্দেহ থেকে অপবাদের জন্ম
গুজবের অন্যতম উৎস হলো ভিত্তিহীন সন্দেহ ও মন্দ ধারণা। কোনো ঘটনার পূর্ণ তথ্য না জেনেই কাউকে দোষী ভাবা, উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান করা কিংবা সেই অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রচার করা অন্যায়ের পথ খুলে দেয়।
আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ।’ (সুরা হুজুরাত: ১২)
আরও পড়ুন: নারীর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে অপমান: ইসলাম কী বলে
একই আয়াতে অন্যের গোপন বিষয় অনুসন্ধান ও পরনিন্দা থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভিত্তিহীন সন্দেহ ছড়ানো কিংবা প্রমাণ ছাড়া কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী।
কোনো বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হলেই তা প্রকাশ করা জরুরি নয়। অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকলে সেটিকে সত্য হিসেবে প্রচার না করাই দায়িত্বশীল আচরণ।
সংবাদ যাচাই কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা হুজুরাত: ৬)
এই আয়াত সংবাদ যাচাইয়ের একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে। কোনো তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে সেই তথ্যের কারণে কারও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে।
কোরআন আরও নির্দেশ দিয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর এগুলোর প্রতিটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৬)
এই নির্দেশনা শুধু মুখে বলা কথার ক্ষেত্রে নয়, তথ্য শোনা, দেখা, বিশ্বাস করা এবং প্রচারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কোনো পোস্টের সঙ্গে ছবি বা ভিডিও থাকলেই সেটির বক্তব্য সত্য প্রমাণিত হয় না। পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার বলে প্রচার করা, ছবি থেকে ভুল সিদ্ধান্ত টানা কিংবা সম্পাদিত দৃশ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
গুজবের দায় দুনিয়াতেই শেষ নয়
যাচাইহীন অভিযোগ কারও সম্মান, সম্পর্ক ও সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাউকে অপবাদ দেওয়া বা অন্যের ক্ষতির কারণ হওয়ার দায়কে শুধু অনলাইন আচরণের ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত ‘মুফলিস’ বা প্রকৃত দেউলিয়া ব্যক্তির হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) এমন ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে, কিন্তু দুনিয়ায় অন্যকে গালি দেওয়া, অপবাদ দেওয়া, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা কিংবা আঘাত করার কারণে তার নেকি ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)
এই হাদিস দেখিয়ে দেয়, ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষাও জরুরি। যাচাইহীন অপবাদ ছড়িয়ে কারও ক্ষতি করলে তার পরিণতি খুব খারাপ হতে পারে।
গুজব ঠেকাতে করণীয়
১. কোনো খবর শোনামাত্র ছড়িয়ে না দিয়ে মূল উৎস ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে যাচাই করা।
২. ছবি, ভিডিও ও পর্দার ছবিতে ধরা তথ্যের সময়, স্থান এবং প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখা। পুরোনো বা সম্পাদিত বিষয়বস্তু নতুন ঘটনার নামে ছড়ানো হচ্ছে কি না, তা খেয়াল করা।
৩. উত্তেজনাপূর্ণ দাবি দেখলে আবেগের বশে প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দায়িত্বশীল সূত্রের বক্তব্য খোঁজা।
৪. নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকলে অভিযোগ প্রচার না করা। প্রয়োজন হলে বিষয়টি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে জানানো, নিজে বিচারকের ভূমিকা না নেওয়া।
৫. আগে কোনো ভুল তথ্য ছড়িয়ে থাকলে সেটি মুছে ফেলা বা সংশোধনের পাশাপাশি যাদের কাছে ছড়ানো হয়েছে, তাদেরও যথাসম্ভব জানানো।
তথ্য প্রচারের ক্ষমতা যত সহজ হয়েছে, দায়িত্বও তত বেড়েছে। একটি শেয়ার, মন্তব্য কিংবা অসতর্ক বাক্য অন্যের জীবনে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই কোনো তথ্য প্রচারের আগে সত্যতা যাচাই করা নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। গুজবমুক্ত সমাজ গড়তে হলে আবেগের আগে প্রমাণ, অনুমানের আগে যাচাই এবং প্রচারের আগে দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোরআন-সুন্নাহ ও গবেষণার শিক্ষা একই বিষয়ে সতর্ক করে যে, কোনো কথা শুনলেই তা সত্য ধরে নেওয়া কিংবা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
তথ্যসূত্র: সুরা হুজুরাত ৬, ১২; সুরা বনি ইসরাইল ৩৬; সুরা নূর ১৫; সহিহ মুসলিম: ৫, ২৫৮১; ‘অনলাইনে সত্য ও মিথ্যা খবরের বিস্তার’ শীর্ষক গবেষণা




