সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

দোয়া করেও ফল পাচ্ছেন না? ইসলাম কী বলে

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

দোয়া করেও ফল পাচ্ছেন না? ইসলাম কী বলে

অনেক দিন ধরে একটি বিষয় চেয়ে দোয়া করছেন। নামাজের পর হাত তুলছেন, রাতের নীরবতায় আল্লাহর কাছে মনের কথা বলছেন। তবু কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। একসময় মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আল্লাহ কি আমার দোয়া শুনছেন না?’

দীর্ঘ অপেক্ষা মানুষকে ক্লান্ত করে। জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা কোনো চাওয়া পূরণ না হলে হতাশা আসতে পারে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে দোয়ার ফল শুধু নিজের চাওয়া পূরণ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)

দোয়ার প্রতিদান আসে তিনভাবে

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মুসলিম এমন দোয়া করলে, যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দান করেন। হয় তার দোয়ার ফল দুনিয়ায় দ্রুত দান করেন, অথবা তা আখেরাতের জন্য জমা রাখেন, অথবা সমপরিমাণ কোনো অকল্যাণ তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন। সাহাবিরা বললেন, ‘তাহলে আমরা আরও বেশি দোয়া করব।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আরও বেশি দানকারী।’ (মুসনাদ আহমদ: ১১১৩৩)

আমরা সাধারণত দোয়ার উত্তর বলতে নিজের চাওয়া পূরণ হওয়াকেই বুঝি। অথচ দোয়ার প্রতিদান এমনভাবেও আসতে পারে, যা আমাদের চোখে পড়ে না। কোন বিপদ থেকে আল্লাহ রক্ষা করেছেন কিংবা আখেরাতের জন্য কী প্রতিদান জমা রেখেছেন, তা আমাদের জানা নেই।

দেরি মানেই কি দোয়া কবুল হয়নি?

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হলো না।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)

আরও পড়ুন: ৩ পদ্ধতিতে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন

কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা দীর্ঘ সময় দোয়া করার পরও প্রত্যাশিত ফল না এলে অনেকে হতাশ হয়ে দোয়া কমিয়ে দেন। অথচ দোয়ার প্রতিদান কখন এবং কীভাবে আসবে, তা আমাদের জানা নেই। তাই অপেক্ষার সময়েও আল্লাহর কাছে চাওয়া অব্যাহত রাখা উচিত। দেরি হচ্ছে বলে দোয়া ছেড়ে দেওয়া মুমিনের জন্য সমীচীন নয়।

যা চাই, তা কি সবসময় কল্যাণকর?

ধরুন, একটি চাকরির জন্য অনেক দোয়া করলেন, কিন্তু চাকরিটি পেলেন না। আপনার মনে হলো, দোয়া কবুল হয়নি। কিন্তু সেই চাকরি আপনার ভবিষ্যতের জন্য কতটা কল্যাণকর হতো, তা কি আপনি জানেন?

আল্লাহ বলেন, ‘হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আবার হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয়কে পছন্দ করো অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা: ২১৬)

আমরা যা চাই, তা সবসময় আমাদের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। তাই নিজের চাওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে কল্যাণকর ফয়সালাও প্রার্থনা করা উচিত। কোনো কিছু না পাওয়ার অর্থই যে তাতে অকল্যাণ ছিল, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো ঠিক নয়। আমাদের জ্ঞান সীমিত, আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী।

নিজের জীবনও পর্যালোচনা করুন

দোয়ার পাশাপাশি নিজের জীবন ও কাজকর্মও পর্যালোচনা করা দরকার। উপার্জন হালাল কি না, কারও অধিকার নষ্ট হচ্ছে কি না, কোনো গুনাহে জড়িয়ে আছি কি না, এসব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। ভুল হয়ে থাকলে তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (স.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ও ধুলিমলিন অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে রব, হে রব’ বলে ডাকে। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম উপার্জনেই সে লালিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)

আরও পড়ুন: শিরক ও হারাম উপার্জন: ঈমান ও আমল নষ্টকারী দুই মহাবিপদ

এই হাদিস আমাদের হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনযাপনের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে কারও জীবনে কোনো গুনাহ থাকলে তার কোনো দোয়াই কবুল হতে পারে না। বরং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার চেষ্টা করা উচিত।

দোয়ার আদব

দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করা, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর দরুদ পড়া এবং বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রার্থনা করা উত্তম। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো অনুনয়-বিনয় করে ও চুপিসারে।’ (সুরা আরাফ: ৫৫)

নিজের ভাষায় মনের কষ্ট, অসহায়ত্ব ও প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যায়। দোয়ার সময় আন্তরিকতা, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দোয়ার আদব রক্ষা করার পাশাপাশি আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী থাকতে হবে।

দোয়া নিজেই ইবাদত

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দোয়াই ইবাদত।’ (সুনান আবু দাউদ: ১৪৭৯)

আল্লাহর কাছে হাত তুলে চাওয়ার মধ্য দিয়ে বান্দা নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে এবং তাঁর সাহায্য ও রহমতের ওপর ভরসা রাখে। তাই দোয়া শুধু কোনো প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়, এটি নিজেই একটি ইবাদত। কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে দেরি হলেও দোয়ার এই মূল্য নষ্ট হয়ে যায় না।

দোয়ার সঙ্গে চেষ্টাও জরুরি

অসুস্থ হলে দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা নিতে হবে। জীবিকার সংকট দেখা দিলে হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। কোনো সমস্যার সমাধান চাইলে সাধ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিতে হবে। দোয়া মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই মুমিনের করণীয়।

অতএব, দোয়া কবুল হচ্ছে না ভেবে হতাশ হবেন না। আল্লাহর কাছে চাওয়া অব্যাহত রাখুন, নিজের ভুল সংশোধন করুন এবং হালাল পথে চেষ্টা চালিয়ে যান। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করুন।

আল্লাহ আমাদের সবার দোয়া কবুল করুন এবং বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: সুরা গাফির: ৬০; সুরা বাকারা: ২১৬; সুরা আরাফ: ৫৫; সহিহ বুখারি: ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫, ১০১৫; সুনান আবু দাউদ: ১৪৭৯; মুসনাদ আহমদ: ১১১৩৩

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর