মাদরাসায় পড়েছেন, ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, কোরআন-হাদিস শিখেছেন। অথচ সাধারণ শিক্ষায় আসার পর তাদের কারও কারও মুখে মাদরাসার শিক্ষা, ইসলামি অনুশাসন বা ধর্মীয় জীবনধারা নিয়ে তীর্যক মন্তব্য শোনা যায়। কেউ মাদরাসার শিক্ষাকে তুচ্ছ করেন, কেউ ধর্মীয় চর্চাকে পিছিয়ে থাকার লক্ষণ বলে তুলে ধরেন। কারও কারও বক্তব্যে মনে হয়, সাধারণ শিক্ষায় অগ্রসর হতে হলে যেন ধর্মীয় পরিচয় ও মাদরাসার অতীত থেকে দূরে সরে যেতে হয়।
প্রশ্ন হলো, এমন প্রবণতার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। মাদরাসা থেকে সাধারণ শিক্ষায় আসা মানেই ইসলামবিরোধী হয়ে যাওয়া নয়। বহু মানুষ দুই ধারার শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ান, ধর্মীয় বিশ্বাসও বজায় রাখেন। আবার ইসলাম বা মাদরাসার সমালোচকদের সবাই সাবেক মাদরাসাশিক্ষার্থী নন। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া বলা যায় না যে তারাই বেশি কটাক্ষ করেন। তবু যাদের মধ্যে নিজের আগের পরিবেশকে হেয় করার প্রবণতা দেখা যায়, তাদের আচরণের পেছনে কিছু সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণ কাজ করতে পারে।
১. নতুন পরিবেশে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চাপ
সাধারণ শিক্ষায় এসে একজন শিক্ষার্থী নতুন সামাজিক পরিবেশের মুখোমুখি হন। সেখানে তার পোশাক, ভাষা, ধর্মীয় অনুশীলন বা অতীত পরিচয় নিয়ে ঠাট্টা হলে তিনি অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। কেউ কেউ তখন নিজেকে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করতে আগের পরিচয় থেকে দূরত্ব তৈরি করেন। এমনকি নিজের অতীতকে বিদ্রূপ করে বোঝাতে চান, তিনি এখন আগের জগতের মানুষ নন।
এটি সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। কেউ নিজের পরিচয় নিয়ে সংকোচে ভোগেন, কেউ আবার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দুই পরিবেশেই স্বাভাবিকভাবে চলেন।
আরও পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামি প্রচারণা: ইনফ্লুয়েন্সার না আলেম?
২. আধুনিকতা নিয়ে ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে কখনো কখনো আধুনিকতা বলতে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাওয়াকে বোঝানো হয়। পোশাক, জীবনযাপন বা চিন্তার ধরন দিয়ে মানুষকে ‘আধুনিক’ ও ‘অনাধুনিক’ হিসেবে ভাগ করা হয়। এই পরিবেশে কেউ ভাবতে পারেন, ধর্মীয় চর্চা কমালেই তাকে বেশি আধুনিক দেখাবে।
অথচ আধুনিক জ্ঞান অর্জন ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করা পরস্পরবিরোধী নয়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য বা সমাজবিজ্ঞানে দক্ষ হতে কাউকে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ছোট করতে হয় না।
৩. তিক্ত অভিজ্ঞতা ও জমে থাকা ক্ষোভ
সব মাদরাসার পরিবেশ বা পরিচালনাপদ্ধতি একরকম নয়। কোথাও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে, কোথাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণে কঠোরতা বা অন্যায় থাকে, কোথাও সাধারণ শিক্ষার ঘাটতি থাকে। কারও অভিজ্ঞতা অপমান বা কঠোর শাসনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলে সেই ক্ষোভ দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে এবং পরে তার বক্তব্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা উচিত নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশোধন করা জরুরি। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা থেকে পুরো মাদরাসাব্যবস্থা, সব আলেম বা ইসলামি শিক্ষাকে তুচ্ছ করা ন্যায়সংগত নয়। ব্যক্তিগত কষ্টের কথা বলা এক বিষয়, আর সেই কষ্টের কারণে একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সামগ্রিকভাবে হেয় করা আরেক বিষয়।
৪. নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণের তাগিদ
মাদরাসা ছেড়ে সাধারণ শিক্ষায় আসার পেছনে পারিবারিক চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, কর্মসংস্থানের চিন্তা বা বিশ্বাসের পরিবর্তন থাকতে পারে। নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়লে কেউ কেউ সেটিকে সঠিক প্রমাণের তাগিদ অনুভব করেন। তখন আগের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বেশি তুলে ধরা হয়, ইতিবাচক দিকগুলো উপেক্ষিত থাকে।
তবে সবাই এমন করেন না। অনেকেই মাদরাসা ছেড়ে আসার পরও নিজের অভিজ্ঞতার ভালো-মন্দ দুই দিকই স্বীকার করেন।
আরও পড়ুন: সন্তান অনলাইনে কী দেখছে, নজর রাখার আহ্বান সৌদির গ্র্যান্ড মুফতির
৫. প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা আর ধর্মকে কটাক্ষ এক করে ফেলা
মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করা যাবে না, এমন ধারণা ঠিক নয়। পাঠ্যক্রম, শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান বা শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। যুক্তিনির্ভর সমালোচনা শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করতে সাহায্য করে।
কিন্তু সমালোচনা আর কটাক্ষ এক নয়। পাঠ্যক্রমের ঘাটতি তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তুলে ধরা যায়, শিক্ষকের আচরণের প্রতিকার চাওয়া যায়। কিন্তু এসব বিষয়কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুশাসন, ইসলামি জ্ঞান বা মাদরাসায় পড়া মানুষকে সামগ্রিকভাবে হেয় করা হলে আলোচনা আর গঠনমূলক থাকে না।
আবার কেউ ধর্মীয় বিষয়ে প্রশ্ন তুললেই তাকে ইসলামবিদ্বেষী আখ্যা দেওয়াও ঠিক নয়। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং যুক্তিসংগত সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়াই দায়িত্বশীল আচরণ।
৬. সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কিত বক্তব্যের বাড়তি দৃশ্যমানতা
সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ও বিতর্কিত বক্তব্য সাধারণ বক্তব্যের চেয়ে বেশি মনোযোগ পেতে পারে। সাবেক মাদরাসাশিক্ষার্থী যখন বলেন, ‘আমি ভেতরে ছিলাম, আমি জানি’, তখন শ্রোতারা তাকে ‘ভেতরের মানুষ’ ভেবে বাড়তি গুরুত্ব দিতে পারেন। ফলে তার বক্তব্য দ্রুত আলোচনায় আসে।
অন্যদিকে, যারা মাদরাসা থেকে সাধারণ শিক্ষায় এসে ধর্মীয় অনুশীলন বজায় রেখেছেন এবং দুই ধারার সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা তেমন আলোচনায় আসে না। ফলে কয়েকটি দৃশ্যমান ঘটনা দেখে পুরো গোষ্ঠী সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে। সামাজিক মাধ্যমে কোনো বক্তব্য আলোচিত হলেই সেটিকে বৃহত্তর সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী প্রবণতা ভাবা উচিত নয়।
নিজের অতীতকে ছোট করে কি বড় হওয়া যায়?
শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান, বিচারবোধ ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানো। মাদরাসা থেকে সাধারণ শিক্ষায় এসে নতুন জ্ঞান অর্জন করা, চিন্তাকে সমৃদ্ধ করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রার জন্য নিজের অতীতকে অপমান করা জরুরি নয়।
মাদরাসায় পড়েছেন বলে কেউ সব বিষয়ে সঠিক হবেন, এমন নয়। আবার সাধারণ শিক্ষায় এসেছেন বলে তার সব মূল্যায়নও নির্ভুল হয়ে যায় না। প্রতিটি শিক্ষাব্যবস্থার অর্জন ও সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলো বিচার করতে হবে তথ্য, যুক্তি ও ন্যায়বোধের ভিত্তিতে।
মাদরাসার সমালোচনা সত্য হলে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। আর সমালোচনা বিদ্রূপ বা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়ালে তার জবাব দিতে হবে যুক্তি ও শালীনতার সঙ্গে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও আলেমদেরও আত্মসমালোচনার মানসিকতা রাখতে হবে। শিক্ষার্থীর তিক্ত অভিজ্ঞতা গুরুত্ব দিয়ে শোনা, অন্যায়ের প্রতিকার করা এবং শিক্ষার মান বাড়ানো জরুরি। সব সমালোচনাকে শত্রুতা ভাবলে দূরত্ব আরও বাড়ে।
জেনারেল লাইনে অগ্রসর হওয়া মানে ধর্মীয় পরিচয় অস্বীকার করা নয়, আবার মাদরাসায় পড়া মানে প্রশ্নহীন থাকাও নয়। অতীতকে অস্বীকার করে নয়, তার ভালো দিকগুলো গ্রহণ করে এবং সীমাবদ্ধতাগুলো সংশোধন করেই সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।




