বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

আগুনে পুড়িয়ে প্রাণী হত্যা করা কি জায়েজ?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

শেয়ার করুন:

আগুনে পুড়িয়ে প্রাণী হত্যা করা কি জায়েজ?

আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে ইসলামে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর হাদিসে মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ সংশোধন করার পাশাপাশি প্রাণীর ঢিবি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়ও আপত্তি জানানো হয়েছে। তাই কোনো প্রাণী ক্ষতিকর হলেও তাকে আগুনে পুড়িয়ে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কার?

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) এক অভিযানে সাহাবিদের পাঠান এবং দুজন ব্যক্তিকে পেলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে তাঁরা রওনা হওয়ার আগে তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের অমুক দুজনকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু আগুন দিয়ে শাস্তি দেন একমাত্র আল্লাহ। সুতরাং তোমরা তাদের পেলে হত্যা করবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩০১৬)

হাদিসটিতে দেখা যায়, প্রথমে নির্দেশ দেওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (স.) তা সংশোধন করে দেন। এ ঘটনা আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে ইসলামের কঠোর নির্দেশনা তুলে ধরে।

আরও পড়ুন: ইলেকট্রিক ব্যাট দিয়ে মশা মারা কি জায়েজ?

ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র

পবিত্র কোরআনে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের মিথ্যা উপাস্যগুলোর অসারতা তুলে ধরলে তারা তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়।

আল্লাহ বলেন, ‘তারা বলল, তাকে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য করো, যদি তোমরা কিছু করতে চাও।’ (সুরা আম্বিয়া: ৬৮)

এরপর আল্লাহ আগুনকে নির্দেশ দেন, ‘আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া: ৬৯)

এই ঘটনা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে রক্ষা করার বিষয়টি তুলে ধরে।

পিঁপড়ার ঢিবি পুড়িয়ে দেওয়ায় নবীজির আপত্তি

প্রাণীকে আগুনে পুড়িয়ে কষ্ট দেওয়ার বিষয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক সফরে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে থাকা অবস্থায় সাহাবিরা একটি পাখির দুটি ছানা ধরে নেন। মা পাখিটি এসে পাখা ঝাপটাতে থাকে। রাসুলুল্লাহ (স.) ছানা দুটি মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে বলেন। পরে তিনি সাহাবিদের পুড়িয়ে দেওয়া একটি পিঁপড়ার ঢিবি দেখে জানতে চান, কে এটি পুড়িয়েছে। সাহাবিরা নিজেদের কথা জানালে তিনি বলেন,

‘আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া একমাত্র আগুনের রবেরই অধিকার।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৬৭৫)

আরও পড়ুন: কুকুর বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণী হত্যা: ইসলাম কী বলে

এই হাদিসে প্রাণীর প্রতি দয়া দেখানোর শিক্ষা যেমন রয়েছে, তেমনি আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে সতর্কতাও রয়েছে। পিঁপড়ার ঢিবি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আপত্তি থেকে প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় কষ্ট ও নিষ্ঠুরতা পরিহারের গুরুত্ব বোঝা যায়।

ক্ষতিকর প্রাণী হলে কী করবেন?

কোনো প্রাণী মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য বা সম্পদের জন্য বাস্তব হুমকি সৃষ্টি করলে তাকে প্রতিরোধ করা কিংবা প্রয়োজনে হত্যা করার বিধান পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করাকে স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।

ঘরে সাপ, ইঁদুর বা ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উপদ্রব হলে নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন। লক্ষ্য থাকবে বিপদ দূর করা, প্রাণীকে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা দেওয়া নয়। নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে কী করা যাবে, তা জানতে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

প্রাণীর প্রতিও দয়া দেখানোর শিক্ষা

ইসলাম মানুষকে ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার অধিকার দিয়েছে। একইসঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সীমা মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার শিক্ষাও দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর হাদিসে আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই রাগ, প্রতিশোধ কিংবা অজ্ঞতার কারণে কোনো প্রাণীকে আগুনে পুড়িয়ে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। ক্ষতিকর প্রাণী দমন করা প্রয়োজনীয় হলেও নিরাপদ ও শরিয়তসম্মত বিকল্প পদ্ধতি বেছে নেওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র: সুরা আম্বিয়া: ৬৮-৬৯; সহিহ বুখারি: ৩০১৬; সুনানে আবু দাউদ: ২৬৭৫

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর