পবিত্র কোরআন পড়ার সময় কিছু আরবি শব্দ বারবার চোখে পড়ে। এসব শব্দের অর্থ জানা থাকলে আয়াতের বক্তব্য ও বাক্যগঠন বুঝতে কিছুটা সুবিধা হয়। তবে কোরআনে কোন শব্দ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, তা নির্ভর করে কীভাবে শব্দগুলো গণনা করা হচ্ছে তার ওপর। একই শব্দের বিভিন্ন রূপ ও ব্যাকরণগত ব্যবহার আলাদাভাবে বা একসঙ্গে গণনা করলে সংখ্যায় পার্থক্য হতে পারে।
কোরআনিক আরবি করপাসের লেমা-ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, কোরআনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ২৫টি শব্দ নিচে তুলে ধরা হলো। এখানে লেমা বলতে একই শব্দের বিভিন্ন ব্যাকরণগত রূপকে একসঙ্গে বোঝানো হয়েছে।
১. مِنْ (মিন) ৩,২২৬ বার
অর্থ: থেকে, মধ্য থেকে। এটি মূলত একটি অব্যয়। উৎস, স্থান, অংশ বা সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
২. اللَّه (আল্লাহ) ২,৬৯৯ বার
অর্থ: আল্লাহ। এটি আল্লাহ তাআলার বিশেষ নাম। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে তাঁর সত্তা, গুণাবলি, ক্ষমতা, বিধান এবং বান্দার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
৩. مَا (মা) ২,১৭৭ বার
প্রসঙ্গভেদে ‘যা’, ‘যে বিষয়’, ‘না’ বা ‘কী’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আরবি ভাষায় এটি বিভিন্ন ব্যাকরণগত ভূমিকায় আসে।
৪. فِي (ফি) ১,৭০১ বার
অর্থ: মধ্যে, ভেতরে। স্থান, অবস্থা বা কোনো কিছুর অন্তর্ভুক্তি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘ফিল আরদ’ পৃথিবীতে।
৫. لَا (লা) ১,৬৯১ বার
অর্থ: না। অস্বীকৃতি বা নিষেধ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ব্যাকরণগত ব্যবহারের কারণে এর মোট সংখ্যা গণনার পদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হতে পারে।
৬. إِنَّ (ইন্না) ১,৬৮২ বার
অর্থ: নিশ্চয়ই, অবশ্যই। কোনো বক্তব্যকে জোরালোভাবে প্রকাশ করতে ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘ইন্নাল্লাহা গাফুরুর রাহিম’ নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আরও পড়ুন: পবিত্র কোরআনে কার নাম কতবার এসেছে
৭. الَّذِي (আল্লাজি) ১,৪৬৪ বার
অর্থ: যে, যিনি, যা। কোনো ব্যক্তি বা বিষয়কে নির্দিষ্ট করে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
৮. عَلَىٰ (আলা) ১,৪৪৫ বার
অর্থ: ওপর, উপরে। প্রসঙ্গভেদে এর ব্যবহার ও অর্থের পার্থক্য হতে পারে। যেমন ‘আলাল্লাহি তাওয়াক্কালনা’ আমরা আল্লাহর ওপরই ভরসা করি।
৯. رَبّ (রব) ৯৭৫ বার
অর্থ: প্রতিপালক, পালনকর্তা। কোরআনে আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে ‘রব’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
১০. مَنْ (মান) ৮২৪ বার
প্রসঙ্গভেদে অর্থ হয় ‘যে’, ‘যিনি’, ‘যে ব্যক্তি’ বা ‘কে’। প্রশ্ন, শর্ত কিংবা কোনো ব্যক্তিকে বোঝানোর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।
১১. إِلَىٰ (ইলা) ৭৪২ বার
অর্থ: দিকে, প্রতি, অভিমুখে। স্থান বা গন্তব্যের দিকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়।
১২. إِنْ (ইন) ৬৯৭ বার
প্রসঙ্গভেদে ‘যদি’ বা ‘না’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আরবি বাক্যে শর্ত বা অস্বীকৃতি প্রকাশেও এটি আসে।
১৩. إِلَّا (ইল্লা) ৬৬৩ বার
অর্থ: ছাড়া, ব্যতীত। কোনো বিষয়কে সাধারণ বক্তব্য থেকে আলাদা বা ব্যতিক্রম হিসেবে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
আরও পড়ুন: কোরআনে যে ১০ শহরের নাম আছে
১৪. أَنْ (আন) ৬২৫ বার
এর অর্থ ও ব্যবহার বাক্যের প্রসঙ্গের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত পরবর্তী ক্রিয়া বা বক্তব্যকে বাক্যের অন্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করতে এটি ব্যবহৃত হয়।
১৫. ذَٰلِكَ (জালিক) ৫২০ বার
অর্থ: তা, সেটি, ওই। কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়কে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়।
১৬. عَنْ (আন) ৪৬৫ বার
অর্থ: থেকে, সম্পর্কে, সম্বন্ধে। প্রসঙ্গ অনুযায়ী এর অর্থের পার্থক্য হতে পারে।
১৭. أَرْض (আরদ) ৪৬১ বার
অর্থ: পৃথিবী, ভূমি বা জমিন। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে পৃথিবী ও ভূমি বোঝাতে শব্দটি এসেছে।
১৮. إِذَا (ইজা) ৪০৯ বার
অর্থ: যখন। সময় বা কোনো ঘটনার সংঘটনের প্রসঙ্গ বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
১৯. قَدْ (কদ) ৪০৬ বার
এটি আরবি ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অব্যয়। প্রসঙ্গভেদে অতীত কাজের সংঘটন বা কোনো বক্তব্যে জোর বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
আরও পড়ুন: পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত একমাত্র সাহাবি
২০. يَوْم (ইয়াওম) ৪০৫ বার
অর্থ: দিন। কোরআনে সাধারণ দিন, নির্দিষ্ট সময় এবং বিশেষভাবে কিয়ামতের দিনের প্রসঙ্গেও শব্দটি এসেছে।
২১. قَوْم (কওম) ৩৮৩ বার
অর্থ: জাতি, সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন নবী ও তাঁদের সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গে শব্দটি বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে।
২২. آيَة (আয়াহ) ৩৮২ বার
অর্থ: নিদর্শন, চিহ্ন বা আয়াত। কোরআনে আল্লাহর নিদর্শন এবং কোরআনের আয়াত উভয় অর্থেই প্রসঙ্গ অনুযায়ী শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
২৩. أَنَّ (আন্না) ৩৬২ বার
অর্থ: যে, নিশ্চয়ই। কোনো বক্তব্যকে অন্য বাক্যের সঙ্গে যুক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
২৪. كُلّ (কুল্ল) ৩৫৯ বার
অর্থ: প্রত্যেক, সব, সমগ্র। কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়ের ব্যাপকতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
২৫. لَمْ (লাম) ৩৫৩ বার
অর্থ: না। অতীতে সংঘটিত কোনো কাজের অস্বীকৃতি প্রকাশে আরবি ভাষায় এটি ব্যবহৃত হয়।
তালিকা থেকে কী বোঝা যায়?
তালিকাটি দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, কোরআনে সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দের বড় একটি অংশই ব্যাকরণগত পদ। যেমন ‘মিন’, ‘ফি’, ‘লা’, ‘ইন্না’, ‘আলা’ ও ‘ইলা’। এগুলো বাক্যের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে এবং বক্তব্যের অর্থ স্পষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে ‘আল্লাহ’, ‘রব’, ‘আয়াহ’, ‘আরদ’ ও ‘কওম’-এর মতো অর্থবহ শব্দও তালিকায় রয়েছে। তাই কোনো শব্দ কতবার এসেছে, তার ওপর ভিত্তি করে তার ধর্মীয় গুরুত্ব নির্ধারণ করা ঠিক নয়। বেশি ব্যবহৃত হওয়া আর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া এক বিষয় নয়।
একই শব্দের সংখ্যা কেন ভিন্ন হতে পারে?
কোরআনের শব্দ গণনার ক্ষেত্রে ‘লেমা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। লেমা হলো একই শব্দের এমন বিভিন্ন রূপকে একত্রে গণনা করা, যেগুলো ব্যাকরণগত পরিবর্তনের কারণে ভিন্ন হলেও একই শব্দের রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কোরআনিক আরবি করপাসের শব্দের ব্যবহারের তালিকায় লেমাগুলোকে পদভেদে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। আবার একটি লেমার অধীনে একাধিক ব্যাকরণগত ব্যবহারও থাকতে পারে। যেমন ‘মা’ শব্দটি সম্পর্কবাচক সর্বনাম, নেতিবাচক অব্যয়, প্রশ্নবোধক অব্যয় ও সংযোজক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে ‘লা’ শব্দটি নেতিবাচক অব্যয় এবং নিষেধবাচক অব্যয় উভয়ভাবেই ব্যবহৃত হয়েছে।
এ কারণে অন্য কোনো পদ্ধতিতে কোরআনের শব্দ গণনা করলে সংখ্যা বা তালিকার ক্রম ভিন্ন হতে পারে। তাই ‘কোরআনে সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ’ বলার সময় কোন গণনাপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা জরুরি।
শুধু এসব শব্দ জানলেই কি কোরআন বোঝা যাবে?
না। কোরআনের ভাষা বুঝতে শব্দের অর্থের পাশাপাশি আরবি ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, শব্দের প্রসঙ্গ এবং আয়াতের সামগ্রিক বক্তব্য বোঝাও জরুরি। একই শব্দ ভিন্ন প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থ বা ভূমিকা নিতে পারে।
তবে বহুল ব্যবহৃত শব্দ দিয়ে আরবি শেখা শুরু করা কার্যকর একটি পদ্ধতি হতে পারে। বারবার দেখা শব্দগুলোর অর্থ জানা থাকলে ধীরে ধীরে আয়াতের বাক্যগঠন ও বক্তব্য ধরাও সহজ হয়। এভাবে শব্দভান্ডার বাড়ার সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি অর্থ বোঝার সুযোগও বাড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: কোরআনিক আরবি করপাস, ‘ব্যবহারের হার অনুযায়ী শব্দতালিকা’ ও ‘কোরআন শব্দকোষ’




