একটা প্রদীপ আছে, তেল আছে, সলতেও আছে, কিন্তু আগুন নেই। ঘর অন্ধকারই থেকে যায়। ইলম আর আমলের সম্পর্কও এমন। জ্ঞান মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি আমলে পরিণত না হয়, তাহলে একসময় তা নাজাতের পথ দেখানোর বদলে মানুষের বিরুদ্ধেই দলিল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কোরআনের প্রথম নাজিল হওয়া আয়াত ‘ইকরা’, অর্থাৎ ‘পড়ো’। রাসুলুল্লাহ (স.) জ্ঞান অন্বেষণের গুরুত্ব অত্যন্ত জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে গুরুত্ব দিয়েছে এই জন্য যে, মানুষ জ্ঞানের আলোয় সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল, হালাল-হারাম চিনবে, জেনে-বুঝে আমল করবে, নিজের ভেতর থেকে জাহেলিয়াত দূর করবে এবং সমাজকে আলোকিত করবে।
তাই ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়। জানা বিষয়কে জীবনে বাস্তবায়ন করাই ইলমের প্রকৃত ফল।
যে প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান অর্জন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, সে তার ওপর ফরজ হওয়া জ্ঞান না শেখার কারণে গুনাহগার হতে পারে। আর যে ব্যক্তি জেনে-বুঝেও আমল থেকে দূরে থাকে, তার জন্য বিপদ আরও ভয়াবহ। কারণ তার কাছে সত্য পৌঁছেছে, সে তা চিনেছে, তারপরও জীবনকে সেই সত্য অনুযায়ী পরিচালিত করেনি।
আরও পড়ুন: ইলম ও আমলের সার্থক রূপকার: নবীযুগের আলেমদের আচরণ ও জীবনদর্শন
ইলম ও আমল: জানা আর মানার ফারাক
নামাজ ফরজ- এটা জানা এক বিষয়। সময়মতো নামাজ আদায় করা আরেক বিষয়।
গিবত হারাম- এটা জানা এক বিষয়। নিজের জবানকে গিবত থেকে বাঁচিয়ে রাখা আরেক বিষয়।
মানুষের হক নষ্ট করা অন্যায়- এটা জানা এক বিষয়। বাস্তবে সেই হক আদায় করা আরেক বিষয়।
ইলমের পূর্ণতা আসে যখন জানা বিষয় আমলে রূপ নেয়। জ্ঞান মানুষের চিন্তা বদলাবে, আর সেই পরিবর্তনের ছাপ পড়বে তার কথা, চরিত্র ও কাজে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা করো না? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অসন্তোষজনক।’ (সুরা সফ: ২-৩)
তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘যাদের তাওরাতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, অতঃপর তারা তা যথাযথভাবে বহন করেনি (অর্থাৎ অনুসরণ করেনি), তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধার মতো, যে কিতাব বহন করে।’ (সুরা জুমুআ: ৫)
এই আয়াতে তাওরাতের জ্ঞান ও দায়িত্ব পেয়েও তা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। কিতাব বহন করলেই তার শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা হয় না।
একজন মানুষ অনেক দ্বীনি বিষয় জানতে পারেন, নিয়মিত কোরআন-হাদিস পড়তে পারেন, বহু মাসয়ালা মুখস্থ রাখতে পারেন। কিন্তু নামাজে অবহেলা, কথায় মিথ্যা, আচরণে অহংকার কিংবা মানুষের অধিকারের ব্যাপারে উদাসীনতা থাকলে সেই জ্ঞানের আলো তার জীবনে কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে ভাবা জরুরি।
ইলমের সঙ্গে আমল না থাকার পরিণতি
১. কেয়ামতের দিন ইলম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ
আবু বারজা আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দার পদযুগল সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে- তার জীবনকাল কীভাবে অতিবাহিত করেছে, তার জ্ঞান দিয়ে কী করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে ও কীসে খরচ করেছে এবং তার শরীর কীভাবে ক্ষয় করেছে।’ (তিরমিজি: ২৪১৭)
খেয়াল করুন, প্রশ্নটা শুধু ‘কত জেনেছ’ নয়, ‘জেনে কী করেছ’।
ইলমের সঙ্গে দায়িত্বও আছে। তাই জ্ঞান যত বাড়বে, সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমলের দায়িত্বও তত বাড়বে।
আরও পড়ুন: আলেমদের জন্য ৬টি বড় সতর্কবার্তা
২. নিয়ত নষ্ট হলে ইলমও বিপদের কারণ হতে পারে
সহিহ মুসলিমের দীর্ঘ হাদিসে কেয়ামতের দিন প্রথম যাদের বিচার হবে, তাদের একজনের কথা এসেছে। সে ইলম শিখেছিল, অন্যকে শিখিয়েছিল এবং কোরআন পড়েছিল। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের প্রশংসা পাওয়া।
আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘এর বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছ?’ সে বলবে, ‘আমি ইলম শিখেছি, তা শিখিয়েছি এবং আপনার জন্য কোরআন পড়েছি।’ তখন তাকে বলা হবে, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি ইলম শিখেছিলে যাতে মানুষ তোমাকে আলেম বলে এবং কোরআন পড়েছিলে যাতে মানুষ তোমাকে কারী বলে। আর তা তো বলা হয়েছে।’ এরপর তাকে মুখের ওপর উপুড় করে টেনে-হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম: ১৯০৫)
এই হাদিসের ভয়াবহ শিক্ষা হলো- শুধু ভালো কাজ করাই যথেষ্ট নয়, নিয়তও বিশুদ্ধ হতে হবে। ইলম মানুষের প্রশংসা পাওয়ার মাধ্যম হয়ে গেলে সেই ইলম নাজাতের কারণ না হয়ে ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
তাই ইলমের সঙ্গে আমল যেমন জরুরি, তেমনি ইলম অর্জনের সঙ্গে ইখলাসও জরুরি।
৩. আল্লাহর অসন্তোষের কারণ
ইলম অনুযায়ী আমল না করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়। কোরআনে এমন লোকদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা সত্য জেনেও তা অনুসরণ করেনি।
বনী ইসরাইলের একটি গোষ্ঠীর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তাকে এমনভাবে চেনে, যেমন তারা নিজেদের সন্তানদের চেনে।’ (সুরা আনআম: ২০)
অর্থাৎ সত্য চিনে ফেলার পরও তা গ্রহণ না করা মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপদের বিষয়।
নিজের জানা সত্যকে জীবনে অস্বীকার করা আত্মিক পতনের একটি বড় কারণ। তাই ইলম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অন্তর ও আমলও পরীক্ষা করা দরকার।
৪. অন্যকে বলা, নিজে না করা
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসবে এবং সে তা নিয়ে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা চাকির চারপাশে ঘোরে।
জাহান্নামের লোকেরা তাকে ঘিরে বলবে, ‘তুমি কি আমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে না?’ সে বলবে, ‘হ্যাঁ। আমি সৎকাজের আদেশ দিতাম, কিন্তু নিজে তা করতাম না। অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতাম, কিন্তু নিজেই তাতে লিপ্ত থাকতাম।’ এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- নিজের কোনো দুর্বলতা আছে বলে ভালো কাজের কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। কেউ কোনো আমলে দুর্বল হলেও অন্যকে সেই আমলের দিকে আহ্বান করতে পারে। একই সঙ্গে তাকে নিজের সংশোধনের চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে।
বিপদ হলো- অন্যকে উপদেশ দিয়ে নিজের ক্ষেত্রে সেই বিধানকে উপেক্ষা করা এবং নিজের ভুলকে স্বাভাবিক মনে করা।
আরও পড়ুন: বয়স্কদের দ্বীন শিক্ষার গুরুত্ব ও পদ্ধতি
৫. ইলম যখন অহংকারের কারণ হয়
ইলম মানুষের বিনয় বাড়ানোর কথা। আল্লাহভীতি বাড়ানোর কথা। নিজের অজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করানোর কথা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।’ (সুরা ফাতির: ২৮)
তাই ইলম যদি আল্লাহভীতি ও বিনয় বাড়ানোর বদলে মানুষকে অহংকারী করে, অন্যকে তুচ্ছ ভাবতে শেখায়, নিজের ভুল স্বীকারে বাধা দেয়, তাহলে সেই ইলমের প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।
সত্যিকারের ইলম মানুষকে বড় হওয়ার আগে বিনয়ী হতে শেখায়।
৬. কোরআন পক্ষে অথবা বিপক্ষে
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোরআন তোমার পক্ষে দলিল অথবা তোমার বিপক্ষে দলিল।’ (সহিহ মুসলিম: ২২৩)
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু তেলাওয়াত, মুখস্থ বা আলোচনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন নামাজের দিকে ডাকে, সত্যবাদিতা শেখায়, মানুষের হক আদায়ের নির্দেশ দেয়, অন্যায় থেকে দূরে থাকতে বলে।
তাই কোরআন পড়েও যদি তার নির্দেশনা আমাদের জীবনে পরিবর্তন না আনে, তাহলে নিজেদের সম্পর্কটি নিয়ে ভাবা দরকার।
সালাফ ও মনীষীদের বক্তব্য
ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ. বলেন, ‘মানুষের জন্য শিক্ষা অর্জন করা আবশ্যক। আর যখন শিখবে, তখন তাদের আমল করা আবশ্যক।’
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুতায রহ. বলেন, ‘আমল ছাড়া ইলম ফলহীন বৃক্ষের মতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুনাফিকের জ্ঞান তার কথায়, আর মুমিনের জ্ঞান তার কর্মে।’
আবু আব্দিল্লাহ রুজবারি রহ. বলেন, ‘ইলম আমলের ওপর নির্ভরশীল, আমল ইখলাসের ওপর নির্ভরশীল। আর আল্লাহর জন্য ইখলাস আল্লাহর পক্ষ থেকে বোঝার ক্ষমতা এনে দেয়।’
ইলমকে আমলে রূপ দেবেন কীভাবে
একসঙ্গে জীবনের সবকিছু বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে ইলমকে আমলে রূপ দেওয়া যায়।
১. যা জানলাম, আগে তা মানব। নতুন কিছু শেখার আগে নিজেকে প্রশ্ন করব- পুরোনো যা জানি, তার কতটুকু মানছি?
২. ছোট থেকে শুরু করব। নামাজের কোনো মাসয়ালা শিখলে তা নামাজে প্রয়োগ করব। আখলাকের কোনো শিক্ষা জানলে আচরণে ফুটিয়ে তুলব। একটি গুনাহ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেব।
৩. ফরজ ঠিক করব, হারাম থেকে বাঁচব। নফল আমলের প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি ফরজ আমল ঠিক করব। জবান ও আচরণ সংযত রাখব, মানুষের হক আদায় করব এবং নিয়মিত তাওবা করব।
৪. নিজেকে আগে উপদেশ দেব। অন্যকে যে কথা বলতে যাচ্ছি, তা আগে নিজের জন্য শুনব। নিজের দুর্বলতা চিনব এবং সংশোধনের চেষ্টা করব।
৫. ইখলাস ধরে রাখব। ইলম শেখা, শেখানো ও আমল করা যেন মানুষের প্রশংসার জন্য না হয়। উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
৬. উপকারী ইলমের জন্য দোয়া করব। রাসুলুল্লাহ (স.) এমন ইলম থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন, যা উপকার করে না। (সহিহ মুসলিম)
তাই শুধু বেশি জানার জন্য নয়, উপকারী ইলমের জন্যও দোয়া করতে হবে। নিজের আমল নিয়ে আত্মতুষ্ট না হয়ে আল্লাহর কাছে কবুলিয়তের দোয়া করতে হবে।
শেষ কথা, ইলম আল্লাহর বড় নেয়ামত। আর প্রতিটি নেয়ামতের সঙ্গে দায়িত্বও আছে। যে ইলম আমাদের বদলায় না, আল্লাহর দিকে টেনে নেয় না, গুনাহ থেকে দূরে রাখে না, মানুষের হক আদায়ে সচেতন করে না, সেই ইলম নিয়ে আমাদের ভয় পাওয়া উচিত। কেউ হয়তো কম জানেন, কিন্তু যা জানেন তা আন্তরিকভাবে মানেন। আবার কেউ অনেক জানেন, অনেক বলতে পারেন, অনেক উদ্ধৃতি দিতে পারেন, কিন্তু জীবনে সেই জ্ঞানের ছাপ খুব সামান্য।
ইসলামের দৃষ্টিতে কাম্য হলো- ইলম ও আমলের সমন্বয়। তাই ‘আরও কী জানব’ এই প্রশ্নের পাশাপাশি নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার, ‘যা জানি, তার কতটুকু আমল করছি?’ হয়তো আমাদের নাজাতের জন্য আরও অনেক তথ্য জানা দরকার নেই। দরকার হলো, যে সত্যগুলো ইতিমধ্যে জানি, সেগুলোকে জীবনের অংশ করে নেওয়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের উপকারী ইলম দান করুন, জানা অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিন, আমাদের ইলমে ইখলাস দান করুন এবং আমাদের ইলমকে আমাদের বিরুদ্ধে নয়, নাজাতের কারণ বানিয়ে দিন। আমিন।




