ইসলামের সূচনাই হয়েছিল জ্ঞানার্জনের আদেশের মাধ্যমে। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি নাজিলকৃত প্রথম বাণী ছিল ‘পড়ুন’। এই আদেশ সকল মুসলমানের জন্যই প্রযোজ্য। ইসলাম প্রতিটি মুসলমানের উপর দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে ফরজ করেছে, আর এই নির্দেশ বয়স্কদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)
বয়স্কদের দ্বীন শেখার তাৎপর্য
দ্বীনি শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর বিধান ও শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিকভাবে জীবনযাপন করা। জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে এই জ্ঞানের প্রয়োজন আরও বেশি তীব্র হয়। বয়স্কদের কাছে এটা ভাবার সুযোগ নেই যে ‘পরে শিখে নেব’; বরং তাদের জন্য জরুরি হলো, বাকি জীবনটি নির্ভুলভাবে ইবাদত-বন্দেগি দিয়ে সাজানো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত: ৫৬)
জ্ঞানার্জনে বয়স কোনো বাধা নয়
কোরআন ও হাদিসে জ্ঞানার্জনের যে ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে বয়সের কোনো সীমারেখা টানা হয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন।’ (সুরা মুজাদালাহ: ১১)
আরও পড়ুন: আল্লাহ যাদের দ্বীনি জ্ঞান দান করেন
বিজ্ঞাপন
দ্বীন শিক্ষায় বয়স কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়
ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র ‘দারুল আরকাম’-এর শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (স.) এবং শিক্ষার্থী ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন বয়স্ক। যেসব সাহাবি উচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন, যেমন আবু বকর (রা.), ওমর (রা.), আবু জর (রা.) ও আবু দারদা (রা.) প্রমুখ, তারাও বয়স্ক অবস্থায় জ্ঞানার্জন করেছেন। ইমাম বুখারি (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বয়স বেশি হওয়ার পরও ইলম শিক্ষা করো। কারণ সাহাবায়ে কেরামও বয়স বেশি হওয়ার পরই দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।’ (সহিহ বুখারি, পৃ ৩৯)
জীবনভর জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব
মুসলিম মনীষীরা জ্ঞানার্জনকে জীবনের মতোই অপরিহার্য মনে করতেন। তাই তাঁরা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জ্ঞানসাধনায় নিয়োজিত থাকতেন। আবু আমর ইবনুল আলা (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘বৃদ্ধ বয়সে ইলম শিক্ষা করা কি উত্তম?’ তিনি জবাব দিলেন, বেঁচে থাকা যদি তার জন্য উত্তম হয় তাহলে ইলম অর্জন করা কেন উত্তম হবে না? (আল ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ: ২/১৬৭)
আরও পড়ুন: জ্ঞানার্জন: যে ইবাদত আপনাকে করে আল্লাহর 'পরিবারের' সদস্য
সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত
ইসলামের ইতিহাসে অনেক মনীষী বয়স বেশি হওয়ার পরও দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করে সফলতার চূড়ায় পৌঁছেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আরবি ব্যাকরণ ও কিরাত শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম আলী ইবনে হামজা আল কিসায়ি (রহ.) এবং ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)। (আমবাউর রুয়াত: ২/২৭১)
বয়স্কদের দ্বীন শেখার সহজ উপায়
বর্তমানে বয়স্কদের জন্য দ্বীন শেখার অনেক সহজ ও সুবিধাজনক মাধ্যম রয়েছে:
১. মসজিদভিত্তিক কোরআন শিক্ষা: অনেক মসজিদে বয়স্কদের জন্য স্বল্পমেয়াদি (১৫ দিন থেকে ৩ মাস) কোরআন শিক্ষার কোর্স চালু আছে। এসব কোর্সে বিশুদ্ধ কোরআন তেলাওয়াত, প্রয়োজনীয় মাসয়ালা, দোয়া ও হাদিস শেখানো হয়।
আরও পড়ুন: যে দোয়া পড়লে আল্লাহ জ্ঞান বাড়িয়ে দেন
২. আলেমদের সান্নিধ্য: হক্কানি আলেম ও আল্লাহভীরু ওলামায়ে কেরামের সান্নিধ্যে থেকে অজানা বিষয়গুলো জেনে নেওয়া বয়স্কদের জন্য খুবই কার্যকরী একটি পদ্ধতি।
৩. বিশুদ্ধ বই-পুস্তক অধ্যয়ন: নির্ভরযোগ্য আলেম ও বুজুর্গদের লেখা বই পড়ে জ্ঞানার্জন করা যায়। তবে কোন বই পড়বেন, সে বিষয়ে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
৪. দ্বীনি মজলিসে অংশগ্রহণ: হক্কানি আলেমদের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত দ্বীনি মজলিস ও ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিলে অল্প সময়ে অনেক জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা সকল বয়স্ক ভাই-বোনকে দ্বীন শেখার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

