সাপ, হিংস্র প্রাণী, শত্রু, রোগ কিংবা কোনো অত্যাচারী ব্যক্তিকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভয় পায়। আবার কোরআনে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশও এসেছে। তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় পেলেই কি শিরক হয়ে যায়?
উত্তর হলো- না। সব ধরনের ভয় শিরক নয়। ভয়টি কেন হচ্ছে এবং এর পেছনে কী বিশ্বাস কাজ করছে, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
আল্লাহকে ভয় করা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের ভয় করো না, আমাকে ভয় করো।’ (সুরা বাকারা: ১৫০)
আরও বলেন, ‘সে তো শয়তান। সে তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৭৫)
আল্লাহকে ভয় করা মানে শুধু আতঙ্কিত থাকা নয়। এই ভয় মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর আনুগত্যে উদ্বুদ্ধ করে। এর সঙ্গে আল্লাহর প্রতি আশা ও ভরসাও থাকে।
স্বাভাবিক ভয় শিরক নয়
কোনো শত্রু ক্ষতি করতে পারে, সাপ কামড়াতে পারে, আগুনে পুড়ে যেতে পারে কিংবা কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে- এসব কারণে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। এ ধরনের ভয় শিরক নয়।
মুসা (আ.)-এর ঘটনা কোরআনে এর একটি উদাহরণ। তিনি মিসর থেকে বের হওয়ার সময় ‘ভীত ও সতর্ক অবস্থায়’ বের হয়েছিলেন। (সুরা কাসাস: ২১)
তাই বিপদের আশঙ্কায় সতর্ক হওয়া, নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়া কিংবা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া ইসলামের বিরোধী নয়।
আরও পড়ুন: কথাবার্তায় শিরক: শব্দচয়নে ঈমানি সতর্কতা
যে ভয় তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
বিষয়টি গুরুতর হয় যখন কেউ কোনো সৃষ্টিকে এমন অদৃশ্য ও স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী মনে করে, যে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে উপকার বা ক্ষতি করতে পারে।
আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? অথচ তারা আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের ভয় দেখায়।’ (সুরা জুমার: ৩৬)
অর্থাৎ কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নিজস্ব অদৃশ্য ক্ষমতায় নিশ্চিতভাবে ক্ষতি করার ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করা তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই শুধু কাকে ভয় করা হচ্ছে, তা নয়- কেন এবং কী বিশ্বাস থেকে ভয় করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বিনদের কাছে আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারেও কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর কতিপয় মানুষ কতক জ্বিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিত।’ (সুরা জ্বিন: ৬)
মানুষের ভয়ে আল্লাহর হুকুম ছেড়ে দেওয়া
মানুষের ভয় যদি কাউকে আল্লাহর ফরজ বিধান ছেড়ে দিতে বা হারাম কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে, তাহলে তা নিন্দনীয় ও গুনাহের কাজ।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো।’ (সুরা মায়েদা: ৪৪)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আনুগত্য তো শুধু ন্যায়সঙ্গত কাজে।’ (সহিহ বুখারি: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১৮৪০)
তবে মানুষের ভয়ে কোনো ভুল হয়ে গেলেই তাকে সরাসরি শিরক বলা ঠিক নয়। এখানে ব্যক্তির বিশ্বাস, পরিস্থিতি ও কাজের ধরন বিবেচনা করতে হবে। জীবন বা গুরুতর ক্ষতির বাস্তব আশঙ্কার ক্ষেত্রেও শরিয়তে বিশেষ বিধান রয়েছে।
আরও পড়ুন: শিরকে আসগর থেকে বাঁচার যে দোয়া শিখিয়েছেন নবীজি (স.)
ভয় থাকলেও ভরসা আল্লাহর ওপর
বিপদকে ভয় পাওয়া মানুষের স্বাভাবিক বিষয়। তাই সতর্কতা অবলম্বন করা যাবে, আত্মরক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে। একই সঙ্গে বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো সৃষ্টি স্বাধীনভাবে ক্ষতি করতে পারে না।
আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক: ৩)
শিরক থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (স.) এই দোয়াটি শিখিয়েছেন, ‘হে আল্লাহ, আমি জেনে-শুনে তোমার সঙ্গে কাউকে শরিক করা থেকে তোমার আশ্রয় চাই এবং যা জানি না, তার জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাই।’ (মুসনাদ আহমদ: ৪/৪০৩)
মূল কথা, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেলেই শিরক হয় না। শত্রু, রোগ, সাপ, আগুন বা অন্যকোনো বাস্তব বিপদের আশঙ্কায় ভয় পাওয়া স্বাভাবিক ও বৈধ। তবে কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে অদৃশ্য ও স্বাধীনভাবে উপকার-অপকার করার ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করা তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আর মানুষের ভয়ে আল্লাহর বিধান ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ। একজন মুমিন বিপদ থেকে সতর্ক থাকবেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন এবং অন্তরের চূড়ান্ত ভয়, আশা ও ভরসা আল্লাহর ওপর রাখবেন।
তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা ১৫০; সুরা আলে ইমরান: ১৭৫; সুরা মায়েদা: ৪৪; সুরা জুমার: ৩৬; সুরা কাসাস ২১, সুরা জ্বিন: ৬; সুরা তালাক ৩; সহিহ বুখারি: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১৮৪০; মুসনাদ আহমদ: ৪/৪০৩




