মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। শয়তানের প্ররোচনা, প্রবৃত্তির তাড়না কিংবা দুর্বলতার কারণে একজন মুমিন একই গুনাহ বারবার করে ফেলতে পারেন। গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার পরও কখনো আবার সেই গুনাহে জড়িয়ে পড়েন। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, বারবার তাওবা করলে কি তা কবুল হবে?
ইসলাম এ অবস্থায় হতাশ হতে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা যুমার: ৫৩)
গুনাহের পর তাওবা করতে হবে
গুনাহ হয়ে গেলে তাতে অটল থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং দ্রুত আল্লাহর কাছে ফিরে এসে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা নিজেদের ওপর জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে- আল্লাহ ছাড়া আর কে গুনাহ ক্ষমা করবে? তারা জেনে-বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অটল থাকে না।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৫)
পরের আয়াতেই আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও জান্নাতের প্রতিদানের কথা উল্লেখ করেছেন। (সুরা আলে ইমরান: ১৩৬)
আরও পড়ুন: তাওবা ছাড়াও যেসব ভালো কাজে গুনাহ মাফ হয়
বারবার গুনাহ হলেও তাওবার দরজা খোলা
একই গুনাহ পুনরায় হয়ে গেলেও নতুন করে তাওবা করতে হবে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে এসেছে, এক বান্দা গুনাহ করার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। পরে আবার গুনাহ করে ক্ষমা চায়। এভাবে বারবার গুনাহ ও ক্ষমা প্রার্থনার ঘটনা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, তাঁর বান্দা জানে তার এমন একজন রব আছেন, যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের কারণে পাকড়াওও করেন। হাদিসের শেষে আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ২৭৫৮)
এ হাদিস মুমিনকে তাওবার ব্যাপারে আশাবাদী করে। তাই ‘আমি তো একই গুনাহ বারবার করছি, আমার আর তাওবা করে লাভ কী’ এমন চিন্তায় তাওবা ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।
তাওবা হতে হবে আন্তরিক
তাওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার নাম নয়। গুনাহ থেকে ফিরে আসা, কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প থাকা তাওবার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো।’ (সুরা তাহরিম: ৮)
আর কারও অধিকার নষ্ট করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুনাহ হলে তার হক ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাযথভাবে তা আদায় করাও জরুরি।
তবে তাওবার সময় সত্যিই গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরে দুর্বলতার কারণে আবার সেই গুনাহ হয়ে গেলে নতুন করে তাওবা করতে হবে। আগের তাওবার কারণে পরবর্তী গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে-এমন নয়।
আরও পড়ুন: তাওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য কী? আস্তাগফিরুল্লাহ বললে তাওবা হবে?
গুনাহ থেকে বাঁচতে কারণও এড়াতে হবে
একই গুনাহ বারবার হওয়ার পেছনে কোনো কারণ বা পরিবেশ কাজ করতে পারে। খারাপ সঙ্গ, নির্দিষ্ট অভ্যাস, অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার, একাকিত্ব কিংবা কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি যদি গুনাহের দিকে টেনে নেয়, তাহলে সেগুলো চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে।
শুধু ‘আবার গুনাহ করব না’ বলার পাশাপাশি গুনাহের পথগুলোও বন্ধ করার চেষ্টা করা জরুরি।
তাওবার সঙ্গে নেক আমল
গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হয়ে ইবাদত ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং তাওবার পাশাপাশি নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক আমল বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সৎকর্মগুলো অসৎকর্মগুলোকে মিটিয়ে দেয়।’ (সুরা হুদ: ১১৪)
রাসূলুল্লাহ (স.) নিজেও নিয়মিত তাওবা ও ইস্তেগফার করতেন। তিনি বলেছেন, ‘হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে একশবার তাওবা করি।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩০৭)
সবচেয়ে বড় ভুল হলো তাওবা ছেড়ে দেওয়া
একই গুনাহ বারবার হয়ে যাওয়ার কারণে কেউ যদি মনে করেন যে তার আর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ নেই, সেটিই হতে পারে আরও বড় বিপদের কারণ। মুমিনের কর্তব্য হলো গুনাহকে ভয় করা, দ্রুত তাওবা করা এবং আল্লাহর রহমতের আশা রাখা।
তাওবা করার পর আবার গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আবারও ফিরে আসতে হবে। একই সঙ্গে গুনাহের কারণ দূর করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
সারকথা, একই গুনাহ বারবার হয়ে গেলেও তাওবার দরজা বন্ধ হয় না। আন্তরিকভাবে গুনাহ ছেড়ে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে হবে। পরে আবার গুনাহ হয়ে গেলে নতুন করে তাওবা করতে হবে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে গুনাহের পথ এড়িয়ে নেক আমল বাড়ানোই মুমিনের করণীয়।
গুনাহের পর তাওবা করা থামিয়ে দেওয়া নয়, প্রতিবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের কর্তব্য।



