ইসলামে কোনো কাজ ভালো মনে হলেই সেটিকে ধর্মীয় আমল বা সুন্নত হিসেবে পালন করা যায় না। কোনো আমলকে নির্দিষ্ট সময়, সংখ্যা, পদ্ধতি বা বিশেষ ফজিলতের সঙ্গে সুন্নত হিসেবে পালন করতে হলে কোরআন-সুন্নাহতে তার ভিত্তি থাকতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুনভাবে চালু করে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
এই নীতির আলোকে মুসলিম সমাজে প্রচলিত কিছু আমলের নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে আলোচনা রয়েছে। কোনো কোনো পদ্ধতিকে বিদআত বলা হয়েছে, আবার কিছু বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে। তাই সাধারণ নফল ইবাদত আর কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে সুন্নত বা বিশেষ ফজিলতের আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।
১. নামাজের পর সবাই মিলে একই সুরে জিকির
ফরজ নামাজের পর জিকির করা সুন্নত। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সময়ে ফরজ নামাজের পর উচ্চৈঃস্বরে জিকির করা (‘আল্লাহু আকবর’ বলা) হতো এবং এর মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারতেন যে নামাজ শেষ হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ৫৮৩)
নামাজের পর উচ্চৈঃস্বরে জিকিরের এ বর্ণনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে অবকাশ রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট সম্মিলিত পদ্ধতিকে এমনভাবে নিয়মিত করা, যাতে সেটিকেই নামাজ-পরবর্তী নির্ধারিত বা একমাত্র সুন্নত পদ্ধতি মনে করা হয়, তার জন্য আলাদা দলিল প্রয়োজন।
অতএব, আলোচনার বিষয় জিকির করা বা উচ্চস্বরে জিকির করা নয়। বিষয়টি হলো- কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে এমনভাবে ধর্মীয় রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কি না, যার পক্ষে নির্দিষ্ট শরিয়তসম্মত প্রমাণ নেই।
আরও পড়ুন: দেশে প্রচলিত ১১ বিদআত ও ভিত্তিহীন প্রথা: ইসলামের নির্দেশনা
২. প্রতি নামাজের পর ‘আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল’ বলা
নামাজ শেষে পাশের মুসল্লিকে নিয়ম করে ‘আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল’ বলা কিছু এলাকায় প্রচলিত। তবে রাসুলুল্লাহ (স.) বা সাহাবিদের নিয়মিত আমল হিসেবে প্রতি নামাজের পর এভাবে বলার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তাই এ বাক্যকে নামাজ-পরবর্তী নির্ধারিত সুন্নত হিসেবে চালু করার পক্ষে শক্ত দলিল নেই। একইভাবে নামাজ শেষে নিয়মিত করমর্দনকেও নামাজের সুন্নত হিসেবে নির্দিষ্ট করার প্রমাণ নেই।
তবে কাউকে সাধারণভাবে দোয়া করা বা ভালো কথা বলা নিষিদ্ধ নয়। ‘আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল’ অর্থপূর্ণ একটি দোয়া। আপত্তির বিষয় হলো, এটিকে প্রতি নামাজের পরের নির্ধারিত ধর্মীয় রীতি বা সুন্নত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
৩. শাবানের ১৫ তারিখে নির্দিষ্ট রাকাতের বিশেষ নামাজ
শাবানের ১৫ তারিখের রাতকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট রাকাত ও নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিশেষ নামাজ পড়ার প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে ১০০ রাকাত নামাজের যে বর্ণনা প্রচলিত, তা নির্ভরযোগ্য হাদিসের ভিত্তিতে প্রমাণিত নয়।
ইমাম নববী ১৫ শাবানের রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ১০০ রাকাত নামাজ পড়াকে বিদআত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এ-সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। (আল-মাজমু)
তবে ১৫ শাবানের রাতের ফজিলতসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন অনেক আলেম। ফলে এ রাতে সাধারণ নফল নামাজ, দোয়া, জিকির বা অন্যান্য ইবাদত করাকে নিষিদ্ধ বা বিদআত বলা যায় না।
মূল আপত্তি হলো, নির্দিষ্ট রাকাত, নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট ফজিলতকে শরিয়ত নির্ধারিত আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
৪. রজবের প্রথম জুমার রাতে ‘সালাতুর রাগায়েব’
রজবের প্রথম জুমার রাতে মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে ১২ রাকাত বিশেষ নামাজকে ‘সালাতুর রাগায়েব’ বলা হয়। এ নামাজের বিশেষ ফজিলত নিয়ে যে বর্ণনাগুলো প্রচলিত, সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয় বলে মুহাদ্দিস ও ফকিহরা উল্লেখ করেছেন।
হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’-এ রজবের প্রথম জুমার রাতে ‘সালাতুর রাগায়েব’-এর জন্য সম্মিলিত হওয়ার বিষয়টিকে বিদআত বলা হয়েছে। সেখানে এ সংক্রান্ত প্রচলিত বর্ণনাগুলোকেও বাতিল ও জাল বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বিদআতের গুনাহ ক্ষমা পাওয়ার উপায়
ইমাম নববীও এ নামাজকে বিদআত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর ফজিলতসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। (আল-মাজমু)
তাই রজব মাসে সাধারণ নফল নামাজ পড়া বৈধ। কিন্তু প্রথম জুমার রাতকে নির্দিষ্ট করে ১২ রাকাত নামাজকে সুন্নত বা বিশেষ ফজিলতের আমল হিসেবে পালন করার জন্য আলাদা শরিয়তসম্মত দলিল প্রয়োজন।
৫. ২৭ রজবকে বিশেষ ইবাদতের দিন মনে করা
২৭ রজবকে মেরাজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে বিশেষ রোজা বা বিশেষ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করার প্রচলন রয়েছে। তবে ২৭ রজবের রোজা বা ওই রাতের বিশেষ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট ফজিলত প্রমাণ করে এমন নির্ভরযোগ্য নববী নির্দেশনা পাওয়া যায় না।
হানাফি ফিকহের ফতোয়াগুলোতেও ২৭ রজবকে বিশেষ ফজিলতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করে রোজা রাখার প্রমাণিত সুন্নত নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কেউ সাধারণ নফল রোজা রাখার নিয়তে ২৭ রজবে রোজা রাখতে পারেন। একইভাবে সাধারণ নফল নামাজ বা দোয়া করা নিষিদ্ধ নয়। আপত্তির বিষয় হলো, দিনটিকে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ ইবাদতের দিন মনে করে এর জন্য আলাদা ফজিলত নির্ধারণ করা।
বিদআত বোঝার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মনে রাখা জরুরি
কোনো নতুন বা প্রচলিত কাজ দেখলেই সেটিকে বিদআত বলা যায় না। দেখতে হবে, কাজটি কি সাধারণ ইবাদত হিসেবে করা হচ্ছে, নাকি এটিকে দ্বীনের বিশেষ আমল বা সুন্নত হিসেবে নির্দিষ্ট করা হচ্ছে। সেই নির্দিষ্ট সময়, সংখ্যা, পদ্ধতি বা বিশেষ ফজিলতের পক্ষে শরিয়তসম্মত দলিল আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
দোয়া, জিকির, নফল নামাজ ও দান-সদকা সাধারণভাবে সওয়াবের কাজ। তবে এসব ইবাদতের কোনো একটি পদ্ধতিকে নির্দিষ্ট সময় বা সংখ্যার সঙ্গে বেঁধে ‘এটাই সুন্নত’ বা ‘এতে বিশেষ ফজিলত রয়েছে’ বলে প্রচলন করার বিষয়টি আলাদা। তাই কোনো আমল নিয়ে কথা বলার সময় মূল ইবাদত এবং তার নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
উপরের কিছু আমলের নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে হানাফি ফিকহের গ্রহণযোগ্য ফকিহরা সুন্নত হিসেবে স্বীকৃতি দেননি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদআত বলেছেন। আবার ১৫ শাবানের রাতের ফজিলতের মতো কিছু বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই কোনো আমল করার আগে এর দলিল আছে কি না এবং এটি সুন্নত হিসেবে প্রমাণিত কি না, তা জেনে নেওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ৫৮৩, ১৭১৮; আল-মাজমু; রদ্দুল মুহতার; হানাফি ফিকহের সংশ্লিষ্ট ফতোয়া ও গ্রন্থসমূহ




