কথায়, আচরণে কিংবা কোনো মন্তব্যের মাধ্যমে কেউ আপনাকে অপমান করল; এরপর নিজের ভুল বুঝতে পেরেও ক্ষমা চাইল না। এমন ঘটনায় কষ্ট পাওয়া, রাগ হওয়া কিংবা পাল্টা জবাব দেওয়ার ইচ্ছা জাগা স্বাভাবিক। তবে একজন মুমিনের জন্য প্রশ্ন হলো- এমন পরিস্থিতিতে তার করণীয় কী?
ইসলাম অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে নিষেধ করেনি। একই সঙ্গে অন্যায়ের জবাবে সীমা ছাড়িয়ে যেতেও অনুমতি দেয়নি। তাই এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য, সংযম এবং ন্যায়সংগত আচরণই হওয়া উচিত মুমিনের পথ।
অপমান করা অন্যায়
কাউকে হেয় করা, উপহাস করা কিংবা অপমানজনক নামে ডাকা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্যকোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ একই আয়াতে একে অপরকে নিন্দা করা এবং মন্দ নামে ডাকার ব্যাপারেও নিষেধ করা হয়েছে। (সুরা হুজরাত: ১১)
অর্থাৎ মানুষের সম্মান নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে তুচ্ছ বিষয় নয়। কথার মাধ্যমেও অন্যের প্রতি জুলুম হতে পারে।
জবাব দিতে গিয়ে সীমা ছাড়ানো যাবে না
কেউ অন্যায় করলেই তার জবাবে ইচ্ছামতো প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ নেওয়া উচিত না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে।’ (সুরা শুরা: ৪০)
আরও পড়ুন: অনর্থক তর্কে ধ্বংস, সংযমে জান্নাত
অর্থাৎ অন্যায়ের প্রতিকার করার সুযোগ থাকলেও জবাব দিতে গিয়ে নতুন অন্যায় করা যাবে না। অপমানের জবাবে গালাগালি, মিথ্যা অপবাদ কিংবা আরও বড় অপমান তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
রাগ নিয়ন্ত্রণ করাও শক্তি
অপমানের মুহূর্তে নিজের রাগ সামলানো কঠিন। অথচ রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সে-ই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৪; সহিহ মুসলিম: ২৬০৯)
তাই উত্তেজনার মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কিছু সময় নেওয়া, পরিস্থিতি থেকে সরে আসা এবং শান্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয়।
ক্ষমা করলে মর্যাদা বাড়ে
অপমানকারী ক্ষমা না চাইলেও তাকে ক্ষমা করে দেওয়া যেতে পারে। কারণ ক্ষমা করার জন্য অপর পক্ষের আগে ক্ষমা চাওয়া শর্ত নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত চিন্তা যেভাবে শান্তি কেড়ে নেয়: ইসলাম কী শিক্ষা দেয়
আরও বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা নুর: ২২)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)
তবে ক্ষমা করা মানে অন্যায়কে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। এটি ব্যক্তিগত আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিহিংসা ছেড়ে দেওয়ার একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত।
মন্দের জবাব ভালো দিয়ে
কোরআন মন্দ আচরণের জবাব উত্তম আচরণ দিয়ে দেওয়ারও শিক্ষা দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মন্দকে প্রতিহত করুন যা উত্তম তা দিয়ে। তখন দেখবেন, যার সঙ্গে আপনার শত্রুতা ছিল, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।’ (সুরা ফুসসিলাত: ৩৪)
সব পরিস্থিতিতে এটি করা সহজ নয়। তবু সুযোগ থাকলে কঠোরতার বদলে ভালো আচরণ বেছে নেওয়া সম্পর্কের তিক্ততা কমাতে পারে এবং নিজের চরিত্রকেও উন্নত রাখে।
সবসময় উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই
কিছু মানুষকে বোঝানো কঠিন। তাদের সঙ্গে বারবার তর্কে জড়ালে বিরোধ আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়িয়ে চলাই ভালো।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যা বলে সে বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করুন এবং সুন্দরভাবে তাদের পরিহার করুন।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল: ১০)
তাই নীরব থাকা কিংবা প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়। কখনো এটি পরিস্থিতি সামলানোর সবচেয়ে বিচক্ষণ উপায়।
জুলুম হলে অধিকার রক্ষার সুযোগ আছে
ক্ষমা করা মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়। অপমানের সঙ্গে যদি মানহানি, সম্পদের ক্ষতি, নির্যাতন বা অন্যকোনো অধিকারহরণ যুক্ত হয়, তাহলে নিজের অধিকার রক্ষায় ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মন্দ কথা বলা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে কারো ওপর জুলুম করা হলে সেটা ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা: ১৪৮)
তবে প্রতিকার চাইতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করা যাবে না। ন্যায়বিচার চাওয়া এবং প্রতিশোধপরায়ণ হওয়া এক বিষয় নয়।
মোটকথা, কেউ আপনাকে অপমান করেছে, সেটি তার কাজের পরিচয়। আপনি তার জবাবে কী করলেন, সেটিই আপনার চরিত্রের পরিচয়। রাগের বশে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজেকে সামলে নেওয়া, সীমা না ছাড়ানো এবং সম্ভব হলে ক্ষমা করে দেওয়া মুমিনের উত্তম পথ। অন্যায় গুরুতর হলে ন্যায়সংগতভাবে নিজের অধিকারও রক্ষা করা যায়।
তথ্যসূত্র: সুরা হুজরাত; সুরা শুরা; সুরা ফুসসিলাত; সহিহ বুখারি ও মুসলিম




