শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

অতিরিক্ত চিন্তা যেভাবে শান্তি কেড়ে নেয়: ইসলাম কী শিক্ষা দেয়

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

অতিরিক্ত চিন্তা যেভাবে শান্তি কেড়ে নেয়: ইসলাম কী শিক্ষা দেয়

জীবনের নানা সমস্যা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, জীবিকা, পরিবার, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক অবস্থান নিয়ে চিন্তা করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তবে যখন এই চিন্তা সীমা অতিক্রম করে উদ্বেগ ও অস্থিরতার রূপ নেয়, তখন তা মানুষের মানসিক শান্তি, ইবাদতের একাগ্রতা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল পরিকল্পনার শিক্ষা দিলেও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কেন ক্ষতিকর?

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষকে বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সে হয় অতীতের ভুল নিয়ে অনুশোচনায় দগ্ধ হয়, নয়তো ভবিষ্যতের আশঙ্কায় আতঙ্কিত থাকে। ফলে অন্তরের প্রশান্তি নষ্ট হয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল দুর্বল হয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ: ২৮)

এ আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, প্রকৃত প্রশান্তি ধন-সম্পদ বা পার্থিব নিরাপত্তায় নয়; বরং আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর প্রতি আস্থার মধ্যেই নিহিত।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভয় মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়

মানুষের ভবিষ্যৎ, রিজিক ও জীবন আল্লাহর হাতে। তাই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করা বৈধ ও প্রয়োজনীয় হলেও অযথা ভয় ও উৎকণ্ঠা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। ইসলাম চেষ্টা-সাধনার পর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে শিক্ষা দেয়।


বিজ্ঞাপন


আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক: ২-৩)

আরও পড়ুন: ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত? কোরআনের এই উপদেশগুলো পড়ুন 

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা অনেক সময় মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। অথচ একজন মুমিন কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ছাড়া আর কেউ নিরাশ হয় না।’ (সুরা ইউসুফ: ৮৭)

তাই কঠিন পরিস্থিতিতেও একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আশা ও আস্থার সঙ্গে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা এবং তাঁর রহমতের প্রত্যাশা করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

‘যদি এমন হতো’ শয়তানের প্ররোচনা

অনেক মানুষ অতীতের ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবতে থাকেন- ‘যদি আমি এমন করতাম’, ‘যদি ওটা না ঘটত’। এ ধরনের চিন্তা মানুষকে আরও হতাশ করে তোলে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘এমন বলো না যে, যদি এমন এমন করতাম তবে এমন হত না। বরং এ কথা বলো যে, আল্লাহ তাআলা যা নির্দিষ্ট করেছেন এবং যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননা যদি শব্দটি শয়তানের কর্মের দুয়ার খুলে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)

আরও পড়ুন: পৃথিবীতে শয়তানের ১২ টার্গেট

দুশ্চিন্তা দূর করার নববি উপায়

১. নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩) রাসুলুল্লাহ (স.) কোনো কঠিন বিষয় সামনে এলে দ্রুত নামাজে মনোনিবেশ করতেন।

২. বেশি বেশি ইস্তেগফার করা: হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন এবং সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮১৯)

৩. বিশেষ দোয়া পাঠ করা: রাসুলুল্লাহ (স.) এই দোয়াটি নিয়মিত পড়তেন- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসাল, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবন, ওয়া দালাইদ্দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে এবং ঋণের ভার ও মানুষের অত্যাচার থেকে আশ্রয় চাই।’ (সহিহ বুখারি: ২৮৯৩)

৪. অধিক হারে দরুদ পাঠ: উবাই ইবনে কাব (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বললেন যে তিনি তাঁর দোয়ার পুরো সময় দরুদে ব্যয় করতে চান। রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘তাহলে তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৪৫৭)

আরও পড়ুন: নবীজির ওপর দরুদ পাঠের ফজিলত ও উপকারিতা

তাওয়াক্কুল: প্রশান্তির সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি

তাওয়াক্কুলের অর্থ দায়িত্ব পালনের পর ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা। এটি একজন মুমিনের মানসিক শক্তি ও প্রশান্তির অন্যতম উৎস।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি প্রকৃতই আল্লাহ তাআলার উপর নির্ভরশীল হতে, তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেয়া হয় সেভাবে তোমাদেরকেও রিজিক দেয়া হতো। এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (জামে তিরমিজি: ২৩৪৪)

বিপদেও মুমিন লাভবান

মুমিনের জীবনে বিপদ-আপদ সবসময় ক্ষতির কারণ নয়; বরং তা গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১)

সুতরাং অতিরিক্ত চিন্তা না করে ধৈর্য ধারণ করলে সেই কষ্টও আখেরাতের পাথেয় হয়ে উঠতে পারে।

চিন্তা মানুষের জীবনের অংশ, কিন্তু অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষের শান্তি ও মানসিক স্থিতি নষ্ট করে দেয়। ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল পরিকল্পনার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা, তাঁর স্মরণ, নামাজ, ইস্তেগফার, দোয়া, দরুদ ও সবরের শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করতে পারে, তার হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে। মুমিনের জন্য তাই কোনো সংকটই স্থায়ী নয়; প্রতিটি কষ্টের পরই আল্লাহ স্বস্তি ও সহজতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬)

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর