রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নিজেকে কষ্ট দেওয়া, ইসলামের শিক্ষা কী

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

নিজেকে কষ্ট দেওয়া, ইসলামের শিক্ষা কী

জীবনের কোনো ঘটনা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। প্রিয়জনের বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা, অপমান, অপরাধবোধ কিংবা দীর্ঘদিনের হতাশা থেকে কেউ কেউ নিজের প্রতিই কঠোর হয়ে ওঠেন। কেউ নিজেকে আঘাত করেন, কেউ নিজের যত্ন নেওয়া ছেড়ে দেন। কখনো পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে মানুষ নিজের জীবন শেষ করার কথাও ভাবতে শুরু করেন।

ইসলাম মানুষের এমন কঠিন সময়কে কীভাবে দেখে? কষ্টে পড়ে নিজেকে শাস্তি দেওয়া কিংবা নিজের জীবন নষ্ট করার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনাই বা কী?

জীবন আল্লাহর আমানত

মানুষ নিজের জীবন ও শরীরের প্রতি ইচ্ছামতো আচরণ করার অধিকারী নয়। আল্লাহ তাকে জীবন দিয়েছেন এবং সেই জীবনের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা নিসা: ২৯)

আয়াতটি আত্মহত্যার ব্যাপারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। জীবনের সংকট যত কঠিনই হোক, নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া ইসলামে গ্রহণযোগ্য পথ নয়। রাগ, হতাশা বা অপরাধবোধ থেকে নিজের শরীরে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করাও নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতার ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নিজের শরীরেরও অধিকার রয়েছে

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি: ৫১৯৯) এই হাদিস মানুষের প্রতি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। একজন মানুষকে ইবাদত করতে হবে, দায়িত্ব পালন করতে হবে, পাশাপাশি নিজের শরীরের প্রয়োজনও বিবেচনা করতে হবে।

তাই মানসিক কষ্টের কারণে নিজের শরীরকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা কিংবা নিজের সুস্থতাকে নষ্ট করা কোনো সমাধান নয়।

আরও পড়ুন: সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বললেন কেন আল্লাহ?

কষ্টের মধ্যেও রয়েছে আশার বার্তা

কষ্টে থাকা মানুষের জন্য ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- জীবনে অনিচ্ছাকৃতভাবে আসা কষ্টও অর্থহীন নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, শোক, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি তার শরীরে যে কাঁটা ফুটে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১)

এই হাদিস মানুষকে ইচ্ছা করে কষ্ট গ্রহণ করতে শেখায় না। এর অর্থ হলো, জীবনে এসে পড়া কষ্টও আল্লাহর কাছে গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে। তাই দুঃসময় এলে নিজের ওপর আরও আঘাত না করে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর রহমতের আশা করা উচিত।

ভুলের শাস্তি আত্মধ্বংস নয়

অপরাধবোধ কখনো মানুষকে নিজের প্রতি নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে। কেউ মনে করতে পারেন, তিনি এত বড় ভুল করেছেন যে নিজের কষ্টই তার প্রাপ্য। ইসলাম এমন অবস্থায় তওবার পথ দেখায়।

আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন; তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার: ৫৩)

ভুলের পর করণীয় হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, ভুল থেকে ফিরে আসা এবং সম্ভব হলে ক্ষতি পূরণ করা। নিজের শরীর বা জীবন নষ্ট করা তওবার অংশ নয়।

আত্মহত্যার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা

আত্মহত্যা ইসলামে গুরুতর হারাম কাজ। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তবে কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে তার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে মানুষের পক্ষ থেকে রায় দেওয়া ঠিক নয়। কোনো মুসলিমের কোনো কাজের ব্যাপারে শরিয়তের বিধান জানা এক বিষয়, আর নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির শেষ বিচার ঘোষণা করা আরেক বিষয়। তার চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে।

এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। আত্মহত্যায় একজন মানুষকে হারানোর পর তার পরিবারকে দোষারোপ কিংবা মৃত ব্যক্তিকে অপমান করা সমস্যার সমাধান করে না। এতে স্বজনদের কষ্ট আরও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন: বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা, যা বলছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

সবর মানে সাহায্য না নিয়ে কষ্ট সহ্য করা নয়

ইসলামে সবর গুরুত্বপূর্ণ গুণ। তবে সবর মানে সমস্যাকে অস্বীকার করা কিংবা প্রয়োজনীয় সাহায্য থেকে দূরে থাকা নয়। বিপদের মধ্যে নিজেকে সংযত রাখা, আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং বৈধ উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই সবরের দাবি।

আল্লাহ বলেন, ‘ধৈর্যশীলদেরকে পুরস্কার দেওয়া হবে হিসাব ছাড়াই।’ (সুরা জুমার: ১০)

তাই নিজের কষ্টের কথা বিশ্বস্ত কাউকে বলা, পরিবার বা বন্ধুর সহায়তা নেওয়া কিংবা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সবরের পরিপন্থী নয়।

মানসিক কষ্টেও চিকিৎসা নেওয়া যায়

মানসিক বিপর্যয়কে অনেকে ঈমানের দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। ফলে সমস্যায় থাকা মানুষটি চিকিৎসা নিতে সংকোচ বোধ করেন। এই ধারণা ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহ দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ‘তোমরা চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করো; কেননা মহান আল্লাহ একমাত্র বার্ধক্য ছাড়া সকল রোগেরই ওষুধ সৃষ্টি করেছেন।’ (সুনান আবু দাউদ: ৩৮৫৫)

তাই দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, তীব্র উদ্বেগ, নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা কিংবা আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দিলে চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং বা থেরাপিও গ্রহণ করা যায়।

চিকিৎসা গ্রহণ করা আল্লাহর ওপর ভরসার বিরোধী নয়। শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা স্বাভাবিক ও বৈধ।

কষ্টের সময়ে দোয়া

দুশ্চিন্তা ও বিপদের সময়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একটি দোয়া পড়া যায়- يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ ‘ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুমু, বিরাহমাতিক আস্তাগিস।’ অর্থ: ‘হে চিরঞ্জীব, হে সবকিছুর ধারক ও রক্ষক, আপনার রহমতের মাধ্যমে আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।’

দোয়ার পাশাপাশি নিজের কষ্টের কথা বিশ্বস্ত মানুষের কাছে বলা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেওয়া এবং নিজেকে নিরাপদ রাখাও জরুরি।

কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো

কেউ যখন নিজেকে আঘাত করার কথা বলেন বা নিজের জীবন নিয়ে হতাশার কথা জানান, তখন বিষয়টি হালকা করে দেখা উচিত নয়। তাকে উপদেশ দেওয়ার আগে তার কথা শোনা দরকার। অপমান বা বিচার না করে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজন হলে পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য, চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে।

কেউ আত্মহত্যার কথা বললে তাকে একা না রাখা এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

মানুষের কষ্ট সবসময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তাই বিপদে থাকা একজন মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো ইসলামের মানবিক শিক্ষারই অংশ।

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া নয়

দীর্ঘ কষ্ট মানুষকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করতে পারে যে তার কাছে ভবিষ্যতের কোনো পথই আর দেখা যায় না। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া।

আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার: ৫৩)

সমস্যার সমাধান সবসময় সঙ্গে সঙ্গে আসে না। তবু কষ্টের মুহূর্তে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনের সব সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।

নিজের শরীর কিংবা জীবনকে শাস্তি দেওয়ার পথ ইসলাম সমর্থন করে না। কষ্ট এলে তওবা, দোয়া, সবর ও আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সাহায্য গ্রহণ করাই সঠিক পথ। যে মানুষটি নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে করছেন, তার মনে রাখা জরুরি-আজকের অনুভূতিই তার জীবনের শেষ সত্য নয়। পরিস্থিতি বদলাতে পারে, কষ্ট কমতে পারে, নতুন পথ খুলতে পারে। আল্লাহর রহমত আপনার ধারণার চেয়েও কাছে।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর