জীবনে বিপদ-আপদ আসবেই। কখনো প্রিয়জনের অসুস্থতা, কখনো আর্থিক সংকট। আবার কখনো এমন পরিস্থিতি আসে, যখন মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে। দুশ্চিন্তা ও ভয় তাকে ঘিরে ধরে। এমন সময়ে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মহান আল্লাহ। বিপদের মুহূর্তে কী করতে হবে, কোরআনে তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। তবে তা বিনয়ী ব্যক্তিদের ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন।’ (সুরা বাকারা: ৪৫)
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩)
দুটি আয়াতেই ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, বিপদের সময় সালাত কীভাবে সাহায্য লাভের আমল হতে পারে?
দুশ্চিন্তায় সালাতের আশ্রয় নিতেন রাসুল (স.)
বিপদের সময় সালাত আদায় শুধু কোরআনের নির্দেশ নয়। রাসুল (স.)-এর আমলেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
হুজাইফা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (স.)-এর কাছে কোনো বিষয় কঠিন হয়ে দেখা দিলে তিনি সালাত আদায় করতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৩১৯)
অর্থাৎ বিপদ এলে নিজের সাধ্য অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে সালাতের মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: নামাজে আল্লাহ যেভাবে বান্দার সঙ্গে কথা বলে
সালাতেই আল্লাহর সাহায্যের আবেদন
সালাতে বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। সুরা ফাতেহায় সে বলে, ‘আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই।’
এ কথার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, বান্দা সুরা ফাতেহা পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি অংশের জবাব দেন। বান্দা যখন বলে, ‘আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই’, তখন আল্লাহ বলেন, ‘এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যকার বিষয়। আমার বান্দা যা চেয়েছে, তা পাবে।’ (সহিহ মুসলিম: ৩৯৫)
তাই সালাতে দাঁড়ানো মানে শুধু ইবাদত আদায় নয়। এর মাধ্যমে বান্দা নিজের প্রয়োজন ও অসহায়ত্ব আল্লাহর কাছে তুলে ধরে।
সেজদা দোয়ার উপযুক্ত সময়
সালাতের সেজদা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে।
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সেজদার অবস্থায়। তাই তোমরা তখন বেশি বেশি দোয়া করো।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৮২)
বিপদের সময় সেজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে নিজের কষ্ট ও প্রয়োজনের কথা বলা যায়। তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া যায়। এতে অন্তরে ভরসা তৈরি হয়।
আরও পড়ুন: দোয়া করার জন্য সেজদা, কিছু পদ্ধতি
সালাত ধৈর্য ধরতে শেখায়
বিপদের সময় ধৈর্য ধরে থাকা সহজ নয়। ভয় ও দুশ্চিন্তা মানুষকে দুর্বল করে দেয়। তখন আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা জরুরি।
সালাত মানুষকে বারবার আল্লাহর সামনে দাঁড় করায়। এতে তার মনে আল্লাহর ক্ষমতা ও সাহায্যের কথা স্মরণ হয়। সে বুঝতে পারে, তার সমস্যা যত বড়ই হোক, আল্লাহর কাছে তা কঠিন নয়।
তাই ধৈর্য মানে চুপচাপ বসে থাকা নয়। বিপদের কারণ দূর করার চেষ্টা করতে হবে। বৈধ উপায় গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।
সালাত অন্তরে প্রশান্তি আনে
বিপদের সময় শুধু বাইরের সমস্যাই থাকে না। অন্তরেও অস্থিরতা তৈরি হয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় থাকে। নানা চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ: ২৮)
সালাত আল্লাহর স্মরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে স্মরণ করলে অন্তর শান্ত হয়। বিপদ সঙ্গে সঙ্গে দূর না হলেও তা মোকাবিলা করার শক্তি পাওয়া যায়।
বিপদে মুমিনের করণীয়
বিপদ এলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। সালাত ঠিক রাখতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। নিজের ভুলের জন্য তওবা ও ইস্তেগফার করতে হবে। পাশাপাশি সমস্যার সমাধানে বৈধ উপায় নিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বিপদের সময় ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বলেছেন। কারণ সালাত বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত রাখে। তাকে নিজের অসহায়ত্ব মনে করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা করার শক্তি দেয়।
তাই জীবনে কঠিন সময় এলে দুশ্চিন্তায় ডুবে না থেকে সালাতে দাঁড়ানো উচিত। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত। কারণ তিনি বলেছেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’
আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




