‘নবীজি (স.)-কে ভালোবাসি’ এ কথা বলা সহজ। তাঁর জন্ম, জীবন ও আদর্শ নিয়ে আবেগ প্রকাশ করাও সহজ। কিন্তু সত্যিকারের নবীপ্রেমের পরিচয় কোথায়? শুধু মুখে ভালোবাসার কথা বললেই কি সেই ভালোবাসা পূর্ণতা পায়?
ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের এমন এক অনুভূতি, যার প্রভাব তার আচরণে প্রকাশ পায়। মানুষ যাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে, তার কথা মনে রাখে, তার আদর্শকে গুরুত্ব দেয় এবং তার পথ অনুসরণ করতে চায়। তাই রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি ভালোবাসারও কিছু সুস্পষ্ট আলামত রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)
এই আয়াত নবীপ্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে- আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার পথ হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণ। তাই নবীপ্রেম শুধু আবেগের বিষয় নয়, এর সঙ্গে আনুগত্য ও অনুসরণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সুন্নাহ অনুসরণ করাই ভালোবাসার প্রমাণ
মানুষ যাকে ভালোবাসে, স্বাভাবিকভাবেই তার মতো হতে চায়। তার কথা ও কাজকে নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করে। নবীজি (স.)-এর ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।
কাজী ইয়াজ (রহ.) নবীপ্রেমের আলামত আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসে, সে তাকে প্রাধান্য দেয় এবং তার আদর্শ অনুসরণ করতে চায়। তাই সত্যিকারের নবীপ্রেমের অন্যতম প্রধান আলামত হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণ, তাঁর সুন্নাহকে জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর আদেশ পালন করা। (আশ-শিফা: ২/৫৭১)
তাই নামাজ, ইবাদত, আচার-আচরণ, লেনদেন, পরিবার, প্রতিবেশী ও মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আদর্শকে গুরুত্ব দেওয়া নবীপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ।
আরও পড়ুন: 'মৌসুমি ভালোবাসা নয়, জীবনজুড়ে নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ করুন'
তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা
নবীজি (স.) কোনো বিষয়ে আল্লাহর বিধান পৌঁছে দিলে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো তা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা। নিজের পছন্দ-অপছন্দকে তাঁর নির্দেশের ওপর স্থান দেওয়া নবীপ্রেমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক বিবাদে আপনাকে বিচারক মানে। অতঃপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের মনে কোনো সংকীর্ণতা না থাকে এবং তারা তা সম্পূর্ণভাবে মেনে নেয়।’ (সুরা নিসা: ৬৫)
অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশের সামনে নিজের প্রবৃত্তি ও পছন্দকে প্রাধান্য না দিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াও ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করা
মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার কথা স্বাভাবিকভাবেই বেশি মনে পড়ে। নবীপ্রেমের ক্ষেত্রেও তাই।
কাজী ইয়াজ (রহ.) বলেন, নবীপ্রেমের একটি আলামত হলো তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করা। কারণ মানুষ যাকে ভালোবাসে, তাকে বেশি স্মরণ করে। (আশ-শিফা: ২/৫৭২)
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনচরিত পড়া, তাঁর হাদিস জানা, তাঁর শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করা এবং তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা নবীপ্রেমকে হৃদয়ে জাগ্রত রাখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করো।’ (সুরা আহজাব: ৫৬)
আরও পড়ুন: নবীপ্রেমের প্রকৃত রূপ: আনুষ্ঠানিকতা নয়, সুন্নাহর অনুসরণ
তাঁর চরিত্র নিজের জীবনে ধারণ করা
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু তাঁকে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর চরিত্র ও আচার-আচরণও আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলতে হবে। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, বিনয়, ক্ষমাশীলতা, দয়া ও মানুষের প্রতি সদাচরণ ছিল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাই তাঁকে ভালোবাসার দাবি করলে নিজের চরিত্রেও তাঁর আদর্শের ছাপ ফুটে উঠতে হবে।
মুখে নবীপ্রেমের স্লোগান, অথচ আচরণে কঠোরতা, লেনদেনে প্রতারণা, অন্যের অধিকার হরণ, অহংকার ও জুলুম এসব নবীপ্রেমের দাবি করার মতো অবস্থান নয়। যে ভালোবাসা মানুষের চরিত্র ও আচরণ বদলায় না, সেই ভালোবাসার সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
যাঁদের তিনি ভালোবাসতেন, তাঁদেরও ভালোবাসা
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পরিবার ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানও নবীপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। তাঁরা ছিলেন তাঁর নিকটতম মানুষ এবং তাঁর জীবন ও শিক্ষার প্রত্যক্ষ অনুসারী।
তাই নবীজি (স.)-এর পরিবার ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি সম্মান রাখা এবং তাঁদের সম্পর্কে শালীনতা বজায় রাখা একজন নবীপ্রেমিকের স্বাভাবিক দায়িত্ব। তাঁদের জীবন, ত্যাগ ও নবীজির (স.) সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক সম্পর্কে জানা তাঁর জীবন ও আদর্শকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
ভালোবাসা মানেই আনুগত্য
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি: ১৫)
এই ভালোবাসার বাস্তব রূপের একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হজরত ওমর (রা.)-এর ঘটনায় পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: আল্লাহ মুসলিমদের জন্য কোন আদর্শ নির্ধারণ করেছেন?
একবার ওমর (রা.) বললেন, আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে সবকিছুর চেয়ে প্রিয়, তবে আমার নিজের জীবন ছাড়া। নবীজি (স.) তখন জানালেন, নিজের জীবনের চেয়েও তাঁকে বেশি প্রিয় না করা পর্যন্ত বিষয়টি পূর্ণ হবে না। পরে ওমর (রা.) বললেন, এখন আপনি আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়। তখন নবীজি (স.) বললেন, ‘এখন, হে ওমর!’ (সহিহ বুখারি: ৬৬৩২)
অর্থাৎ নবীপ্রেম এমন ভালোবাসা, যা মানুষের জীবনের সিদ্ধান্ত ও অগ্রাধিকারে প্রভাব ফেলে। প্রিয় মানুষের কথা মানা, তাঁর পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাঁর দেখানো পথে চলার চেষ্টা করা সেই ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, ‘তিনটি গুণ যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের স্বাদ পাবে। তার মধ্যে একটি হলো- আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয় হওয়া।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৭)
ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এই ভালোবাসা আখেরাতেও মানুষের সঙ্গী হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মানুষ যাকে ভালোবাসে, সে তার সঙ্গেই থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৪০)
হজরত আনাস (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি (স.)-এর এই বাণীর চেয়ে আনন্দদায়ক কথা তাঁরা আর শুনেননি। তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসি, আবু বকর ও ওমরকেও ভালোবাসি। আশা করি, তাঁদের মতো আমল করতে না পারলেও তাঁদের সঙ্গেই থাকব।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৩৯)
তবে এই হাদিস ভালোবাসার নামে আমল ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নয়। ভালোবাসা মানুষকে প্রিয়জনের কাছাকাছি যেতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই রাসুলুল্লাহ (স.)-কে ভালোবাসার সত্যিকারের দাবি হলো তাঁর আদর্শ অনুসরণের আন্তরিক চেষ্টা করা।
তাহলে নবীপ্রেমের প্রমাণ কী?
নবীজি (স.)-কে ভালোবাসি-এ কথা বলা অবশ্যই ভালো। তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা, তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা করা, তাঁর প্রশংসা করা এসবও ভালোবাসার প্রকাশ। কিন্তু ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তার প্রভাব জীবনে পড়বে।
তখন নামাজে তাঁর শিক্ষা মনে পড়বে। মানুষের সঙ্গে আচরণে তাঁর দয়া ও নম্রতা প্রকাশ পাবে। লেনদেনে তাঁর সততা অনুসরণের চেষ্টা থাকবে। পরিবারে তাঁর উত্তম আচরণ স্মরণ হবে। কোনো বিষয়ে তাঁর সুন্নাহ জানা থাকলে নিজের প্রবৃত্তির পরিবর্তে তাঁর পথ অনুসরণ করার চেষ্টা থাকবে।
ভালোবাসা তাই শুধু মুখের কথা নয়। ভালোবাসা হলো অনুসরণ, আনুগত্য, স্মরণ এবং নিজের জীবনকে প্রিয়জনের আদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
রাসুলুল্লাহ (স.) উম্মতের প্রতি যে গভীর মমতা রেখে গেছেন, তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর জবাব হতে পারে তাঁর দেখানো পথে চলা। তাঁর সুন্নাহকে জীবনের সৌন্দর্য করা এবং তাঁর শিক্ষা নিজের আচরণে প্রকাশ করা। কারণ সত্যিকারের নবীপ্রেম মুখে উচ্চারিত একটি দাবি নয়। নবীপ্রেম এমন এক ভালোবাসা, যা মানুষের জীবনকে নবীজির (স.) আদর্শের দিকে বদলে দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি গভীর ও সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সুরা আলে ইমরান: ৩১; সুরা নিসা: ৬৫; সুরা আহজাব: ৫৬; সহিহ বুখারি: ১৫, ৬৬৩২; সহিহ মুসলিম: ৬৭, ২৬৩৯, ২৬৪০; আশ-শিফা: ২/৫৭১-৫৭২




