অসুস্থতা মানুষের জীবনের এক কঠিন পরীক্ষা। শারীরিক কষ্টের সঙ্গে এসময় দুশ্চিন্তা ও একাকিত্ব ঘিরে ধরে। রাসুলুল্লাহ (স.) মানুষের এই অবস্থা গভীরভাবে অনুধাবন করতেন। সাহাবিদের কেউ অসুস্থ হলে তিনি নিজে দেখতে যেতেন। শয্যাপাশে বসে সাহস জোগাতেন এবং সুস্থতার দোয়া করতেন। অসুস্থতার কষ্টকে তিনি মুমিনের জন্য কল্যাণের সুযোগ হিসেবে দেখিয়েছেন।
১. নিজে গিয়ে অসুস্থের খোঁজ নিতেন
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া ছিল নবীজি (স.)-এর সুন্নাহ। তিনি নিজে অসুস্থ মানুষের কাছে যেতেন এবং তাদের অবস্থা জানতে চাইতেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) এক অসুস্থ বেদুইনকে দেখতে গেলেন। তাকে বললেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই, ইনশাআল্লাহ এটি পবিত্রকারী।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৫৬)
অসুস্থ মানুষের কাছে গিয়ে তার অবস্থা জানতে চাওয়া এবং কিছু সময় পাশে থাকা তার মনোবল বাড়াতে পারে। নবীজি (স.)-এর আচরণে অসুস্থ মানুষের প্রতি এই আন্তরিকতার সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
২. রোগীর প্রয়োজনের কথা জানতে চাইতেন
অসুস্থ ব্যক্তির শুধু রোগের খবর নেওয়াই নয়, তার প্রয়োজনের প্রতিও খেয়াল রাখতেন নবীজি (স.)। রোগী কিছু খেতে চাইছে কি না, তার কোনো প্রয়োজন আছে কি না এসব বিষয়ও তিনি গুরুত্ব দিতেন।
এতে বোঝা যায়, রোগীর সেবা শুধু ওষুধ বা চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রয়োজন বুঝে পাশে দাঁড়ানোও সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরও পড়ুন: রোগীর জন্য যে দোয়া ৭ বার পড়তে বলেছেন নবীজি
৩. অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করতেন
অসুস্থ ব্যক্তির শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি তার সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন নবীজি (স.)।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর পরিবারের কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তার ওপর ডান হাত বুলিয়ে দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে মানুষের রব! কষ্ট দূর করে দিন, শিফা দান করুন। আপনিই শিফাদাতা। আপনার শিফা ছাড়া কোনো শিফা নেই। এমন শিফা দিন, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৭৫০)
চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে সুস্থতা চাওয়াও নবীজি (স.)-এর শিক্ষা। রোগের চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন, একই সঙ্গে শিফার মালিক যে আল্লাহ, এই বিশ্বাসও মুমিনের অন্তরে থাকা জরুরি।
৪. রোগীকে সাহস ও আশার কথা বলতেন
অসুস্থতার সময় মানুষ সহজেই হতাশ হয়ে পড়তে পারে। নবীজি (স.) এমন সময়ে ভয় বাড়ানোর পরিবর্তে রোগীকে আশাবাদী করতেন।
অসুস্থ বেদুইনকে তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই, ইনশাআল্লাহ এটি পবিত্রকারী।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৫৬)
অন্য বর্ণনায় অসুস্থ ব্যক্তিকে আনন্দদায়ক ও আশাব্যঞ্জক কথা বলতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। (জামে তিরমিজি: ২০৯৪)
একজন অসুস্থ মানুষের সামনে এমন কথা বলা উচিত নয়, যা তার ভয় বা হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়। ভালো কথা, সান্ত্বনা ও আল্লাহর রহমতের আশা তার মনে শক্তি জোগাতে পারে।
আরও পড়ুন: রোগী দেখাসহ ৪ আমলের প্রতিদান জান্নাত
অসুস্থতার কষ্ট গুনাহ মোচনের কারণ
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে গিয়ে দেখেন, তাঁর প্রচণ্ড জ্বর। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এত বেশি জ্বরের কারণে কি তাঁর দ্বিগুণ সওয়াব হবে?
নবীজি (স.) বলেন, হ্যাঁ। এরপর তিনি বলেন, কোনো মুসলমানের ওপর অসুস্থতা বা অন্যকোনো কষ্ট এলে আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহ মোচন করেন, যেমন গাছ তার পাতা ঝরিয়ে দেয়। (সহিহ বুখারি: ৫৬৪৭)
অসুস্থতার কষ্ট তাই একজন মুমিনের জন্য অর্থহীন নয়। ধৈর্যের সঙ্গে তা সহ্য করলে সেই কষ্টও গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে।
রোগী দেখতে যাওয়ার বড় ফজিলত
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়ার প্রতি রাসুলুল্লাহ (স.) বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলমান তার মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, সে ফিরে আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল আহরণ করতে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৮)
আরেক হাদিসে এসেছে, সকালে কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে গেলে সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যায় দেখতে গেলে সকাল পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। (জামে তিরমিজি: ৯৬৯)
তাই অসুস্থ আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত কারও খোঁজ নেওয়া শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়। এটি সওয়াবের আমলও হতে পারে।
আরও পড়ুন: অমুসলিম কবিরাজের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার বিধান কী
রোগীকে দেখতে গিয়ে একটি দোয়া
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে সাতবার এই দোয়া পড়তেন-
‘আসআলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আন ইয়াশফিয়াক।’
অর্থ: ‘আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, যিনি মহান আরশের প্রতিপালক। তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন।’ (জামে তিরমিজি: ২০৮৩)
অসুস্থ আত্মীয় বা পরিচিত কারও কাছে গেলে এই দোয়াটি পড়া তার প্রতি মমতা প্রকাশের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহও হতে পারে।
মানবিকতার এই শিক্ষা সবার জন্য
নবীজি (স.)-এর অসুস্থ মানুষের প্রতি মমতা শুধু মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ইহুদি কিশোর তাঁর সেবা করত। সে অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে দেখতে তার বাড়িতে যান। পরে তাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানালে সে ইসলাম গ্রহণ করে। (সহিহ বুখারি: ১৩৫৬)
এ ঘটনা অসুস্থ মানুষের প্রতি তাঁর মানবিক আচরণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নবীজি (স.)-এর সুন্নাহ আমাদের শেখায়, অসুস্থ মানুষের প্রয়োজন শুধু ওষুধে শেষ হয় না। কখনো তার প্রয়োজন হয় একজন আপন মানুষের, যে পাশে বসবে, ভালো কথা বলবে, তার জন্য দোয়া করবে এবং তাকে আশাবাদী করবে। তাই আমাদের আশপাশে কেউ অসুস্থ হলে তার পাশে দাঁড়ানো, তার কষ্টের সময়ে মমতা ও দোয়া দিয়ে তাকে সাহস জোগানোই হোক নববী মমতার একটি বাস্তব প্রকাশ।



