সালাতে খুশু-খুজু ও একাগ্রতা বজায় রাখতে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়, নম্র (খুশু-খুজুসম্পন্ন)।’ (সুরা মুমিনুন: ১-২) তাই অনেক মুসল্লির মনে প্রশ্ন জাগে- রুকুর সময় চোখ কোথায় রাখা সুন্নাহ? সেজদার স্থানে, পায়ের দিকে, নাকি অন্য কোথাও?
রুকুর সময় দৃষ্টি কোথায় থাকবে এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো স্থান নির্ধারণ করে নির্দেশনা পাওয়া যায় না। তবে সালাতের আদব, খুশু-খুজু এবং দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে কোরআন, সুন্নাহ ও ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা রয়েছে।
সহিহ হাদিসে কী পাওয়া যায়?
রাসুলুল্লাহ (স.) সালাতে খুশু-খুজুর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘লোকেরা যেন সালাতে আকাশের দিকে দৃষ্টি তোলা থেকে বিরত থাকে। অন্যথায় তাদের দৃষ্টি কেড়ে নেওয়া হতে পারে।’ (সহিহ বুখারি: ৭৫০; সহিহ মুসলিম: ৪২৯)
অন্য হাদিসে হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে সালাতে এদিক-সেদিক তাকানোর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘এটা এক ধরনের ছিনতাই, যার মাধ্যমে শয়তান বান্দার সালাত হতে অংশবিশেষ ছিনিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি: ৭৫১)
এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, সালাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এদিক-সেদিক বা আকাশের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকা এবং দৃষ্টি স্থির রাখার মাধ্যমে একাগ্রতা বজায় রাখা সুন্নাহর গুরুত্বপূর্ণ আদব।
আরও পড়ুন: সেজদা থেকে হাতে ভর দিয়ে ওঠাই কি সঠিক পদ্ধতি?
ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা
হানাফি ফকিহদের মতে, সালাতের প্রতিটি অবস্থায় এমন স্থানে দৃষ্টি রাখা মোস্তাহাব, যা খুশু-খুজু বজায় রাখতে সহায়ক। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী-
- কিয়ামে (দাঁড়ানো অবস্থায়) সেজদার স্থানে দৃষ্টি রাখা।
- রুকুতে দুই পায়ের মাঝামাঝি অংশ বা পায়ের আঙুলের দিকে দৃষ্টি রাখা।
- সেজদায় নাকের দুই পাশের দিকে দৃষ্টি রাখা।
- তাশাহহুদে বসে কোলের দিকে দৃষ্টি রাখা।
(ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৭৩; রদ্দুল মুহতার: ১/৬৩৭; আল-মাবসুত: ১/২৮)
তবে এসব স্থান নির্ধারণকে ফুকাহায়ে কেরাম সালাতের আদব ও খুশু-খুজু বজায় রাখার উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এগুলো ফরজ বা ওয়াজিব নয়, বরং মোস্তাহাব। তাই দৃষ্টির নির্দিষ্ট স্থান নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে সালাতে পূর্ণ একাগ্রতা বজায় রাখাই মূল উদ্দেশ্য।
অন্যান্য মাজহাবের মত
এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফি ফকিহরা রুকুর সময় পায়ের দিকে দৃষ্টি রাখাকে মোস্তাহাব বলেছেন। অন্যদিকে শাফেয়ি মাজহাবের অধিকাংশ ফকিহের মতে, রুকুসহ সালাতের সব অবস্থায় সেজদার স্থানের দিকে দৃষ্টি রাখা উত্তম। তবে উভয় মতের লক্ষ্য একটিই- সালাতে খুশু-খুজু ও একাগ্রতা বজায় রাখা।
আরও পড়ুন: একাকী নামাজে ইকামত দেওয়ার বিধান কী
রুকুতে মাথা ও দৃষ্টির অবস্থান
রুকুতে দৃষ্টি নিচের দিকে রাখার অর্থ এই নয় যে মাথা অতিরিক্ত নিচু করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (স.) রুকুর সময় মাথা ও পিঠ প্রায় সমান্তরাল রাখতেন। তিনি মাথা খুব বেশি উঁচুও করতেন না, আবার অতিরিক্ত নিচুও করতেন না। (সহিহ মুসলিম: ৪৯৮)
অতএব, পিঠ সোজা ও মাথা সমান্তরাল রেখে রুকু আদায় করা সুন্নাহ। আর দৃষ্টি নিচের দিকে স্থির রাখা খুশু-খুজু বজায় রাখার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রুকুতে চোখ বন্ধ করার বিধান
অনেকে একাগ্রতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে রুকু বা সেজদায় চোখ বন্ধ রাখেন। তবে ফুকাহায়ে কেরামের মতে, অকারণে সালাতে চোখ বন্ধ রাখা মাকরুহ। অবশ্য সামনে এমন কিছু থাকলে, যা সালাতে মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়, সে ক্ষেত্রে একাগ্রতা বজায় রাখার স্বার্থে চোখ বন্ধ রাখার অবকাশ রয়েছে। (মারাকিল ফালাহ: ১/১১০)
কেন দৃষ্টি স্থির রাখা গুরুত্বপূর্ণ?
সালাতে দৃষ্টি স্থির রাখা খুশু-খুজু বজায় রাখতে সহায়ক। অপ্রয়োজনীয়ভাবে এদিক-সেদিক তাকালে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই ফুকাহায়ে কেরাম দৃষ্টিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ রাখাকে সালাতের আদবের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহর সামনে বিনয় ও একাগ্রতা বজায় রাখা সহজ হয়।
একজন মুসল্লির করণীয়
রুকুর সময় একজন মুসল্লির উচিত-
- অপ্রয়োজনীয়ভাবে চারদিকে না তাকানো।
- হানাফি ফকিহদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পায়ের আঙুলের দিকে বা নিচের দিকে দৃষ্টি রাখা।
- মাথা ও পিঠ সমান্তরাল রেখে সুন্নাহ অনুযায়ী রুকু আদায় করা।
- ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম’ তাসবিহ অর্থ ও ভাব অনুধাবনের চেষ্টা করে মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করা।
- পুরো সালাতে খুশু-খুজু ও একাগ্রতা বজায় রাখার চেষ্টা করা।
মোটকথা, রুকুর সময় দৃষ্টি কোথায় থাকবে এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। তবে ফুকাহায়ে কেরাম খুশু-খুজু বজায় রাখার স্বার্থে বিভিন্ন মত উল্লেখ করেছেন। তাই এ বিষয়ে মতভেদকে বিতর্কের বিষয় না বানিয়ে সালাতে বিনয়, একাগ্রতা ও সুন্নাহর আদব বজায় রাখাই একজন মুমিনের করণীয়।
তথ্যসূত্র: সুরা মুমিনুন: ১-২; সহিহ বুখারি: ৭৫০, ৭৫১; সহিহ মুসলিম: ৪২৯, ৪৯৮; আল-মাবসুত: ১/২৮; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৭৩; রদ্দুল মুহতার: ১/৬৩৭; মারাকিল ফালাহ: ১/১১০




