হজ বা ওমরার সময় তাওয়াফের সময় অনেকেই বারবার কাবার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ কেউ মনে করেন, পুরো তাওয়াফজুড়ে কাবার দিকে তাকিয়ে থাকাই বেশি ফজিলতের কাজ। কিন্তু এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা কী? তাওয়াফের সময় কাবার দিকে তাকানো কি ঠিক?
ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাওয়াফের সময় কাবার দিকে চোখে তাকানো গুনাহ নয়। তবে তাওয়াফে কাবাকে বাম পাশে রাখা ওয়াজিব। তাই কাবার দিকে তাকাতে গিয়ে যদি কেউ শরীর এমনভাবে ঘুরিয়ে ফেলেন যে বুক কাবার দিকে হয়ে যায় এবং ওই অবস্থায় কিছুটা পথ অতিক্রম করেন, তাহলে সেই অংশের তাওয়াফ পুনরায় আদায় করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার: ২/৪৯৪–৪৯৭)
কাবার দিকে তাকানো ও শরীর ঘুরিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়
তাওয়াফের সময় কাবার দিকে চোখে তাকানো এবং কাবার দিকে বুক বা শরীর ফিরিয়ে হাঁটা- এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ফকিহদের মতে, তাওয়াফের সময় কাবাকে নিজের বাম পাশে রাখা ওয়াজিব। তাই কাবার দিকে তাকানোর সময়ও শরীরের অবস্থান এমন হওয়া উচিত, যাতে বুক কাবার দিকে না ঘুরে যায়।
সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর তাওয়াফের বর্ণনায় পুরো সময় কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে বা বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকার কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। বরং তিনি কাবাকে বাম পাশে রেখে তাওয়াফ সম্পন্ন করেছেন।
আরও পড়ুন: তাওয়াফের সময় কথা বলা যাবে?
শরয়ি সতর্কতা: বুক কাবার দিকে ঘুরে গেলে
হানাফি ফকিহদের মতে, তাওয়াফের সময় কাবার দিকে তাকাতে গিয়ে যদি কেউ শরীর এমনভাবে ঘুরিয়ে ফেলেন যে তাঁর বুক (সিনা) বা পিঠ কাবার দিকে হয়ে যায় এবং ওই অবস্থায় কিছু দূর অতিক্রম করেন, তাহলে সেই অংশের তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না।
এ ক্ষেত্রে সম্ভব হলে যেখানে শরীর ঘুরে গিয়েছিল, সেখান থেকে পুনরায় সুন্নাহ অনুযায়ী তাওয়াফ করতে হবে। আর ভিড়ের কারণে তা সম্ভব না হলে পুরো ওই চক্কর নতুন করে সম্পন্ন করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার: ২/৪৯৪–৪৯৭)
সুন্নাহ কখন কাবার দিকে মুখ করতে বলে?
তাওয়াফের সাত চক্করের প্রতিটির শুরুতে হাজরে আসওয়াদের সমান্তরালে পৌঁছালে ইস্তিলাম করা সুন্নাহ। এ সময় কাবার দিকে মুখ করে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করা হয়। তবে এই নির্দিষ্ট মুহূর্ত ছাড়া বাকি পুরো সময় কাবাকে বাম পাশে রেখেই তাওয়াফ করতে হয়।
শরীর ঘুরিয়ে কাবার দিকে তাকালে যেসব সমস্যা হতে পারে
তাওয়াফের সময় বারবার শরীর ঘুরিয়ে কাবার দিকে তাকানোর চেষ্টা করলে কয়েকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে-
১. তাওয়াফের অংশ শুদ্ধ না হওয়া: বুক বা পিঠ কাবার দিকে ঘুরে গিয়ে কিছু দূর অতিক্রম করলে সেই অংশ পুনরায় আদায় করতে হতে পারে।
২. অন্য মুসল্লিদের কষ্ট হওয়া: ভিড়ের মধ্যে শরীর ঘুরিয়ে হাঁটলে অন্য তাওয়াফকারীদের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে, যা হারাম শরিফের শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
৩. একাগ্রতা বিঘ্নিত হওয়া: তাওয়াফের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জিকির ও দোয়ায় নিমগ্ন থাকা। বারবার শরীর ঘুরিয়ে তাকালে সেই মনোযোগ ব্যাহত হতে পারে।
আরও পড়ুন: হজ ও ওমরার তাওয়াফের পার্থক্য কী
কাবার দিকে তাকানো কি স্বতন্ত্র ইবাদত?
জনসাধারণের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে- ‘কাবার দিকে তাকানোও ইবাদত।’ কাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিঃসন্দেহে ঈমানের অংশ। তবে কাবার দিকে তাকানোকে স্বতন্ত্র ইবাদত বা বিশেষ ফজিলতের আমল হিসেবে নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিসে প্রমাণিত বলা যায় না। এ বিষয়ে যে বর্ণনাগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস দুর্বল (যয়িফ) বলেছেন।
তাই তাওয়াফের সময় কাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো সুন্নাহ অনুসরণ করা।
একজন মুসলমানের করণীয়
তাওয়াফ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি ইবাদত। হাদিসে একে নামাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তবে প্রয়োজনবোধে এতে কথা বলার অনুমতি রয়েছে। তাই তাওয়াফের সময় একজন মুসলমানের উচিত-
- কাবাকে বাম পাশে রেখে সুন্নাহ অনুযায়ী তাওয়াফ করা।
- অপ্রয়োজনে শরীর ঘুরিয়ে কাবার দিকে না তাকানো।
- দোয়া, জিকির ও আল্লাহর স্মরণে একাগ্র থাকা।
- হাজরে আসওয়াদের সমান্তরালে পৌঁছালে সুন্নাহ অনুযায়ী ইস্তিলাম করা।
- নিজের কারণে অন্যকোনো তাওয়াফকারী যেন কষ্ট না পান, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।
তাওয়াফের সময় কাবার দিকে তাকানো গুনাহ নয়। তবে তাওয়াফজুড়ে কাবার দিকেই তাকিয়ে থাকা সুন্নাহ হিসেবে প্রমাণিত নয়। ইসলামে ইবাদতের সৌন্দর্য কেবল আবেগে নয়, সুন্নাহর অনুসরণে। তাই কাবার প্রতি ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো পদ্ধতিতে বিনয়, একাগ্রতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে তাওয়াফ সম্পন্ন করা।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ১৬১৬; সহিহ মুসলিম: ১২৭০; রদ্দুল মুহতার: ২/৪৯৪–৪৯৭; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ‘তাওয়াফ’ অধ্যায়




