সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বাবার রেখে যাওয়া অবৈধ সম্পদ কি সন্তানের জন্য হালাল?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:১০ পিএম

শেয়ার করুন:

বাবার রেখে যাওয়া অবৈধ সম্পদ কি সন্তানের জন্য হালাল?

ইসলামে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যদি জীবদ্দশায় ঘুষ, সুদ, প্রতারণা, আত্মসাৎ বা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করে এবং সেই সম্পদ রেখে মারা যায়, তাহলে প্রশ্ন দেখা দেয়- এ ধরনের সম্পদ কি তার উত্তরাধিকারীদের জন্য হালাল হবে?
ফিকহ ও ইসলামি আইনশাস্ত্রে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

অবৈধ সম্পদের মালিকানা কি বৈধ হয়?

ইসলামে অন্যের হক নষ্ট করে বা হারাম পন্থায় অর্জিত সম্পদ বৈধ সম্পদ হিসেবে গণ্য হয় না, বিশেষত যেখানে অন্যের নির্দিষ্ট অধিকার (হক্কুল ইবাদ) যুক্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮) আবার তিনি ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা বাকারা: ২৭৮)
অতএব হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদের জন্য ব্যক্তি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির সম্মুখীন হবে।

আরও পড়ুন: শিরক ও হারাম উপার্জন: ঈমান ও আমল নষ্টকারী দুই মহাবিপদ

উত্তরাধিকারীরা কি সব সম্পদের মালিক হয়ে যাবে?

আলেমরা এ ক্ষেত্রে অবৈধ সম্পদের ধরন অনুযায়ী পার্থক্য করেছেন-


বিজ্ঞাপন


১. যদি সম্পদের প্রকৃত মালিক জানা থাকে: ধরা যাক, কেউ কারও টাকা আত্মসাৎ করেছে, ঘুষ নিয়ে অন্যের অধিকার নষ্ট করেছে বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করেছে। এ ক্ষেত্রে সেই সম্পদ উত্তরাধিকারীদের জন্য হালাল হবে না। প্রথমে প্রকৃত মালিক বা তার উত্তরাধিকারীদের কাছে সম্পদ ফেরত দিতে হবে। এরপর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে। (আল-মাজমু, ইমাম নববি)

২. যদি প্রকৃত মালিক নির্দিষ্টভাবে জানা না থাকে: কখনো কখনো হারাম সম্পদের মালিক নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। যেমন সুদের অর্থ, দুর্নীতির অর্থ বা এমন সম্পদ যার প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করা যায় না। এ ধরনের সম্পদের ব্যাপারে ফকিহদের মত হলো- সওয়াবের নিয়ত না করে বরং মালিকানা পরিশুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার মাধ্যমে সম্পদের দায়মুক্তি অর্জনের ব্যাপারে আলেমদের মতামত রয়েছে। (মাজমুউল ফতোয়া, ইবনে তাইমিয়া)

আরও পড়ুন: হারাম টাকা দান করলে সওয়াব হবে?

৩. যদি সম্পদ হালাল ও হারামের মিশ্রণ হয়: বাস্তবে অনেক সময় বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের একটি অংশ হালাল উপার্জনের থাকে আর অন্য অংশটি থাকে অবৈধ। এ ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরামের পরামর্শ হলো—হারাম অংশটি অনুমান করে পৃথক করে দেওয়া এবং তা জনকল্যাণে ব্যয় করে মূল সম্পদকে দায়মুক্ত করা। অবশিষ্ট হালাল অংশটি উত্তরাধিকারীরা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিতে পারবেন।

যদি উত্তরাধিকারীরা সম্পদের উৎস সম্পর্কে না জানে?

কেউ যদি উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পায় এবং সে জানেই না যে সম্পদটি হারাম উপায়ে অর্জিত ছিল, তাহলে তার ওপর কোনো গুনাহ নেই। কিন্তু যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে সম্পদের একটি অংশ অন্যের হক বা হারাম উপার্জন থেকে এসেছে, তাহলে সামর্থ্য অনুযায়ী তা সংশোধনের চেষ্টা করা এবং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো- মিরাসের মূল বিধান অপরিবর্তিত থাকে, তবে সম্পদের ভেতরে যদি হারাম অংশ থাকে তা পৃথক করে নিষ্পত্তি করতে হয়।

হারাম উপার্জনকারীর জন্য কঠিন সতর্কবার্তা

হাদিস শরিফে যে শরীর হারাম খাদ্যে গঠিত হয়েছে, জাহান্নামই তার জন্য অধিক উপযুক্ত বলে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। (সুনানে তিরমিজি)
অন্য হাদিসে তিনি এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে দীর্ঘ সফর করে আল্লাহর কাছে দোয়া করে; কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম উপার্জন থেকে হওয়ায় তার দোয়া কবুল হয় না। (সহিহ মুসলিম)

অতএব, অবৈধ সম্পদ রেখে মারা গেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তরাধিকারীদের জন্য হালাল হয়ে যায় না। যদি সম্পদের প্রকৃত মালিক জানা থাকে, তাহলে তা অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। আর যদি মালিক নির্দিষ্টভাবে জানা না যায়, তাহলে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার মাধ্যমে সম্পদের দায়মুক্তি অর্জনের ব্যাপারে আলেমদের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাই সম্পদের পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার বৈধতা। একজন মুসলমানের উচিত হালাল উপার্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং মৃত্যুর আগে অন্যের হক আদায় করে যাওয়ার চেষ্টা করা।

তথ্যসূত্র: আল-বাকারা: ১৮৮, ২৭৮; সহিহ মুসলিম: ১০১৫; সুনানে তিরমিজি: ৬১৪; আল-মাজমু (ইমাম নববি): ৯/২৫৭; মাজমুউল ফতোয়া (ইবনে তাইমিয়া): ২৮/৪২১

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর