পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন অনেক সীমান্ত এলাকা রয়েছে, যেখানে একই ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রে বসবাস করেন। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও এমন বহু পরিবার রয়েছে, যাদের আত্মীয়-স্বজন কাঁটাতারের দুই পাশে অবস্থান করেন। রাষ্ট্রীয় সীমানা, সময়সূচি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিন্নতার কারণে তাদের জীবনে কিছু বিশেষ শরয়ি প্রশ্ন তৈরি হয়।
ইসলামি শরিয়ত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। সীমান্তবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন ৭টি শরয়ি মাসয়ালা নিচে তুলে ধরা হলো-
বিজ্ঞাপন
১. নিজ দেশের নিয়মে রোজা ও ঈদ পালন
সীমান্তের দুই পাশে কখনো কখনো ভিন্ন দিনে রমজান শুরু বা ঈদ উদযাপন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তি যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের স্বীকৃত চাঁদ দেখা কমিটি ও কর্তৃপক্ষের ঘোষণাই অনুসরণ করবেন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম) এ বিষয়ে সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কুরায়ব বর্ণিত হাদিস থেকেও ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন চাঁদ দেখার ভিত্তিতে পৃথক আমলের প্রমাণ পাওয়া যায়। (সহিহ মুসলিম: ১০৮৭)
২. আজান ও নামাজের সময় ভিন্ন হলে করণীয়
সীমান্তের দুই পাশে সময়ের পার্থক্য থাকলে নামাজের সময়ও ভিন্ন হতে পারে। শরিয়তের বিধান হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের অবস্থানস্থলের সময় অনুযায়ী নামাজ আদায় করবেন। কারণ নামাজের সময় সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও স্থানীয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা: ১০৩)
ফিকহের মূলনীতি হলো- নামাজের ওয়াক্ত সাব্যস্ত হয় স্থানভিত্তিক সূর্যের অবস্থানের মাধ্যমে, রাষ্ট্রীয় বা পার্শ্ববর্তী এলাকার সময়ের ভিত্তিতে নয়। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সালাত)
তাই পাশের দেশের আজান শোনা গেলেও নিজ অবস্থানে সময় না হওয়া পর্যন্ত নামাজ আদায় বা ইফতার করা জায়েজ হবে না।
আরও পড়ুন: নামাজ না পড়লে জীবনে যেসব অশান্তি নেমে আসে
৩. জুমা ও জামাতে অংশগ্রহণের বিধান
যদি বৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে যাওয়া সম্ভব হয় এবং সেখানে জুমা বা জামাতে অংশ নেওয়া হয়, তাহলে তা শরয়িভাবে বৈধ। কারণ নামাজের ইমামতি ও জামাতের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো ইসলামি শর্ত পূরণ, ভৌগোলিক সীমানা বা নাগরিকত্ব নয়। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সালাত)
তবে নিজ দেশের প্রশাসনিক বিধান ও স্থানীয় মুসলিম সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। (আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, ইমাম মাওয়ারদি)
৪. জাকাত ও সদকা আদায়ের উত্তম পদ্ধতি
ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে নিজের এলাকার দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। তবে সীমান্তের ওপারে যদি নিকটাত্মীয় বা অধিক অভাবী কেউ থাকেন, তাহলে তাদেরকেও জাকাত দেওয়া বৈধ। আত্মীয়কে জাকাত দিলে জাকাতের সওয়াবের পাশাপাশি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াবও পাওয়া যায়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আত্মীয়কে দান করলে তাতে সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার উভয় সওয়াব রয়েছে। (জামে তিরমিজি)
আরও পড়ুন: যাদের জাকাত দিলে আদায় হবে না
৫. কোরবানির পশু এক দেশে, মালিক অন্য দেশে বিধান কী
বর্তমান যুগে অনেকেই অন্য দেশে অবস্থান করেও নিজ দেশে কোরবানি করান। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি বৈধ। ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন, কোরবানির ক্ষেত্রে মালিকের উপস্থিতি শর্ত নয়; বরং তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি (ওকিল) নিয়োগ করলেই কোরবানি আদায় হয়ে যায়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, কিতাবুল উযহিয়্যাহ)
তবে মাসয়ালা হলো, কোরবানির সময় গণনায় পশুর অবস্থানস্থল ধর্তব্য; অর্থাৎ পশু যে দেশে রয়েছে, সেই দেশের ঈদের নামাজ আদায়ের পরই জবাই করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুল উযহিয়্যাহ)
৬. সফর ও মুসাফিরের বিধান
সীমান্ত পার হয়ে শরিয়ত নির্ধারিত সফরের দূরত্ব অতিক্রম করলে ব্যক্তি মুসাফির হিসেবে গণ্য হবেন।
এ অবস্থায় চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ দুই রাকাত করে আদায় করা যাবে এবং রোজার ক্ষেত্রে শরিয়ত প্রদত্ত রুখসত গ্রহণ করা বৈধ হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করবে।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)
আরও পড়ুন: সফরে নামাজ: কসর না করে পুরো পড়লে সহিহ হবে কি?
৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব
রাষ্ট্রীয় সীমান্ত থাকলেও আত্মীয়তার বন্ধন ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবী করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারেও।’ (সুরা নিসা: ১)
সীমান্তের কারণে দূরত্ব তৈরি হলেও আত্মীয়তা ছিন্ন করা বৈধ নয়। বরং যোগাযোগ, খোঁজখবর নেওয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ইসলামের শিক্ষা।
মোটকথা, সীমান্তবাসীদের জীবনে কিছু ব্যতিক্রমী বাস্তবতা থাকলেও ইসলাম এসব বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত নির্দেশনা দিয়েছে। রোজা-ঈদ, নামাজ, জাকাত, কোরবানি কিংবা সফর প্রত্যেক ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, ব্যক্তি যে অঞ্চলে অবস্থান করছেন, সেখানকার শরয়ি বাস্তবতা ও বৈধ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা।
কাঁটাতারের বেড়া মানুষকে ভৌগোলিকভাবে পৃথক করতে পারে; কিন্তু ঈমান, আত্মীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে কখনো বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। তাই সীমান্তের দুই পাশের মুসলমানদের উচিত শরিয়তের বিধান মেনে চলার পাশাপাশি পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্পর্ক অটুট রাখা।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম; সুরা বাকারা: ১৮৫; সুরা নিসা: ১; জামে তিরমিজি; আল-হিদায়া; রদ্দুল মুহতার; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া; আহকামুস সুলতানিয়্যাহ




