মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে দাম্পত্য সম্পর্ককে পারস্পরিক প্রশান্তির উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।’ (সুরা রুম: ২১) অথচ সন্দেহ এমন এক নীরব ঘাতক, যা এই প্রশান্তি ধ্বংস করে দেয়। নিছক সন্দেহের কারণেই বহু দম্পতির সংসার ভেঙে যায়, পারস্পরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ইসলাম এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে; অমূলক সন্দেহ যেমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তেমনি সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি করাও অন্যায় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অমূলক অনুমান থেকে বিরত থাকা
ইসলামের প্রথম নির্দেশনা হলো ভিত্তিহীন সন্দেহকে প্রশ্রয় না দেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা বেশির ভাগ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কেননা অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ।’ (সুরা হুজরাত: ১২) সন্দেহ মানুষকে ধীরে ধীরে এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে, যার পরিণতিতে নিজেকেই অনুতাপ করতে হয়। তাই প্রমাণ ছাড়া বারবার সন্দেহ পোষণ করা কেবল ক্ষতিকর নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে তা গুনাহও বটে।
আরও পড়ুন: অনুমান করে কথা বলা: ইসলাম কী বলে
কানকথা ও তৃতীয় পক্ষের কথায় কান না দেওয়া
দাম্পত্য জীবনে সন্দেহের একটি বড় কারণ হলো তৃতীয় পক্ষের উসকানি। পরিচিত মানুষেরা হিতাকাঙ্ক্ষীর বেশে স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। এ বিষয়ে আল্লাহ সতর্ক করেছেন, ‘হে মুমিনরা! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যেন অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে বসো এবং পরে কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়।’ (সুরা হুজরাত: ৬) রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়েছে যে নামাজ আদায়কারীরা তার উপাসনা করবে না। কিন্তু তাদের পরস্পরের মধ্যে বিভেদ ঘটাতে সে নিরাশ হয়নি।’ (তিরমিজি: ১৯৩৭)
বিজ্ঞাপন
আচরণে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো
রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। একবার ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রী সাফিয়্যাহ (রা.) তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে ফেরার পথে দুজন আনসারি সাহাবি তাদের দেখে দ্রুত সরে গেলেন। রাসুল (স.) তাদের ডেকে বললেন, ‘থামো! ইনি আমার স্ত্রী সাফিয়্যাহ।’ তারা অবাক হলে রাসুল (স.) বললেন, ‘শয়তান মানুষের রক্তপ্রবাহে চলাচল করে। আমি আশঙ্কা করলাম, সে তোমাদের মনে কোনো সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে পারে।’ (বুখারি: ২০৩৫)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে সন্দেহের সুযোগ তৈরি না করা এবং প্রয়োজনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা নববী আদর্শ।
আরও পড়ুন: সন্দেহ-গুজব-অপবাদ: ইসলামে এসবের ভয়াবহ পরিণতি জানুন
গোয়েন্দাগিরি নয়, খোলামেলা আলোচনা
সংসারে সন্দেহ দেখা দিলে গোপনে ফোন তল্লাশি বা নজরদারির পথ না নিয়ে খোলামেলা আলোচনাই একমাত্র সমাধান। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: ১২) স্বামী বা স্ত্রী যখন মনের শঙ্কার কথা বলেন, তখন রেগে না গিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে শোনা এবং আশ্বস্ত করা জরুরি। পরিস্থিতি কঠিন হলে হিতাকাঙ্ক্ষী গুরুজন বা বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া যায়।
সন্দেহের বাস্তব কারণগুলো নিজেই দূর করুন
কেবল সন্দেহ পোষণ করা নয়, সন্দেহের কারণ তৈরি করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। স্বামী বা স্ত্রী যদি পরপুরুষ বা পরনারীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখেন, গোপনীয়তা অবলম্বন করেন বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, তাহলে শুধু অপর পক্ষকে দোষারোপ না করে সেই কারণগুলো দূর করাই ইনসাফের দাবি। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে...। মুমিন নারীদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সুরা নুর: ৩০-৩১)
আল্লাহভীতি ও আধ্যাত্মিক প্রতিকার
যে দম্পতি আল্লাহভীরু জীবন যাপন করেন, আল্লাহ তাদের সংসারে প্রশান্তি দান করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার পথ করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে জীবিকা দান করবেন।’ (সুরা তালাক: ২-৩) দাম্পত্য কলহ ও সন্দেহ দূর করতে রাসুলুল্লাহ (স.) এই দোয়া শিখিয়েছেন- ‘হে আল্লাহ! আমাকে সুপথ নসিব করুন এবং আমাকে মনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন।’ (তিরমিজি: ৩৪৮১) সুখী সংসারের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ে পরস্পরের জন্য এই দোয়াও করতে পারেন- ‘রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিইয়াতিনা কুররতা আ’ইউনিন ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।’ (সুরা ফুরকান: ৭৪)
ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ দূর করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সততা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মান এবং আল্লাহভীতি। অমূলক সন্দেহ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সন্দেহের বাস্তব উপলক্ষ সৃষ্টি করাও অন্যায়। রাগ বা জেদ নয়, ধৈর্য ও মায়াই পারে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে ভালোবাসা ও প্রশান্তি একসঙ্গে বিরাজ করে।
তথ্যসূত্র: আল-কুরআন (সুরা রুম, হুজুরাত, নুর, তালাক, ফুরকান); সহিহ বুখারি; জামে তিরমিজি; সহিহ মুসলিম




