মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ঢাকা

স্বর্ণ ও রুপার নিসাব নির্ধারণে আধুনিক বিতর্ক

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

স্বর্ণ ও রুপার নিসাব নির্ধারণে আধুনিক বিতর্ক

ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী জাকাত ফরজ হওয়া কিংবা কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত, যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘নিসাব’। ফিকহশাস্ত্রে স্বর্ণের নিসাব নির্ধারিত হয়েছে সাড়ে সাত তোলা (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) এবং রুপার নিসাব সাড়ে ৫২ তোলা (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম)।

কিন্তু আধুনিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই নিসাব নির্ধারণ নিয়ে আলেম ও গবেষকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- বর্তমান সময়ে কোনটি মানদণ্ড হওয়া উচিত: স্বর্ণ নাকি রুপা?


বিজ্ঞাপন


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তিত বাস্তবতা

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগে স্বর্ণ ও রুপার ক্রয়ক্ষমতা প্রায় সমানুপাতিক ছিল। সে সময় সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ ও সাড়ে ৫২ তোলা রুপার বাজারমূল্য প্রায় একই ছিল। ফলে যেকোনো একটিকে মানদণ্ড ধরলে বাস্তবে সামাজিক ভারসাম্যে বড় কোনো পার্থক্য তৈরি হতো না।

কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দুই ধাতুর মূল্যের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্য রুপার তুলনায় বহু গুণ বেশি; অনেক ক্ষেত্রে তা সত্তর থেকে আশি গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বাংলাদেশে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী স্বর্ণের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মূল্য কয়েক লাখ টাকা, অথচ রুপার নিসাব সমমূল্যের সম্পদ তার এক ভগ্নাংশ মাত্র। এই বিশাল ব্যবধান শরিয়তের প্রয়োগে বাস্তব জটিলতা তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন: কোরবানির নিসাব যেভাবে হিসাব করবেন


বিজ্ঞাপন


বিতর্কের দুই পক্ষ

১. রুপার নিসাবকে অগ্রাধিকারদানকারী মত
উপমহাদেশের অধিকাংশ আলেম এবং হানাফি মাজহাবভিত্তিক ফতোয়াধারা রুপার নিসাবকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন। দারুল উলুম দেওবন্দসহ উপমহাদেশের বহু ফিকহি প্রতিষ্ঠান ও ফতোয়া সংস্থা এই অবস্থানকে ‘সতর্কতামূলক মানদণ্ড’ (ইহতিয়াত) হিসেবে সমর্থন করে।
তাদের যুক্তিতে রুপার নিসাব ধরলে বেশি মানুষ জাকাত ও কোরবানির আওতায় আসে, ফলে সমাজে সম্পদের পুনর্বণ্টন বৃদ্ধি পায়। এটি শরিয়তের ‘মাসলাহা’ বা জনকল্যাণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি এ উপমহাদেশে ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত মানদণ্ড।

২. স্বর্ণের নিসাবকে মানদণ্ড ধরার মত
সমকালীন কিছু আন্তর্জাতিক ফিকহ গবেষক, মিসরের দারুল ইফতা এবং কুয়েত-কাতারের কিছু ফতোয়া বোর্ড স্বর্ণকে নিসাবের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণের পক্ষপাতী।
তাদের প্রধান যুক্তি হলো, বর্তমানে রুপার নিসাবের আর্থিক মূল্য এত কমে গেছে যে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের বহু মানুষও এই সীমা অতিক্রম করেন। এতে এমন ব্যক্তিদের ওপরও জাকাত বা কোরবানির দায়িত্ব আরোপিত হতে পারে, যাদের প্রকৃত আর্থিক সামর্থ্য নেই। শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য ছিল সত্যিকার সচ্ছল ব্যক্তিদের ওপর এই দায়িত্ব আরোপ করা- এই মত সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।

আরও পড়ুন: ৫ ভরি স্বর্ণ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হবে?

কোরবানির ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব

জাকাতের ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর পূর্ণ এক চন্দ্রবর্ষ (হাওল) অতিবাহিত হওয়া শর্ত। কিন্তু কোরবানির ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবমতে ১০ থেকে ১২ই জিলহজ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কোরবানি ওয়াজিব হয়, এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত নেই।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে: নিসাব হিসাব করার সময় ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজনীয় সম্পদ- যেমন বাসস্থান, পরিধেয়, নিত্যব্যবহার্য আসবাব এবং পেশাগত সরঞ্জাম বাদ দেওয়া হয়। একইভাবে বিদ্যমান ঋণ ও অপরিহার্য দায় পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদই নিসাবের হিসাবে গণ্য হয়। অর্থাৎ কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হলো- মৌলিক প্রয়োজন ও ঋণ বাদ দিয়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা।
রুপার নিসাবকে মানদণ্ড ধরা হলে এই শর্ত পূরণ হওয়া অনেক পরিবারের জন্যই সম্ভব হয়ে ওঠে। তবে উপরোক্ত ‘বাদ দেওয়ার নীতি’গুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে প্রকৃত আর্থিক অসামর্থ্যের ক্ষেত্রে কোরবানি ওয়াজিব না-ও হতে পারে।

আধুনিক গবেষকদের মধ্যবর্তী প্রস্তাবনা

এই বিতর্কে সমসাময়িক কিছু গবেষক ভারসাম্যপূর্ণ কয়েকটি সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন-
প্রথমত, সম্পদের ধরন অনুযায়ী মানদণ্ড নির্ধারণ- স্বর্ণে বিনিয়োগ বা স্বর্ণভিত্তিক সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে স্বর্ণের নিসাব এবং নগদ অর্থ বা অন্য সম্পদের ক্ষেত্রে রুপার নিসাব প্রযোজ্য হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ‘মৌলিক প্রয়োজন’ বা হাজাতে আসলিয়া বাদ দিয়ে নিসাব নির্ধারণের বিদ্যমান ফিকহি নীতিকে আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা- এতে প্রকৃত সচ্ছল ব্যক্তিকেই দায়িত্বশীল করা সম্ভব হয়।
তৃতীয়ত, যেকোনো ব্যক্তি নিজের আর্থিক অবস্থা নিয়ে দ্বিধায় থাকলে স্থানীয় বিজ্ঞ আলেম বা মুফতির ব্যক্তিগত পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

মোটকথা, স্বর্ণ ও রুপার নিসাব নির্ধারণের এই বিতর্ক ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ব্যক্তির প্রকৃত সামর্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একদিকে রুপার নিসাব সমাজে দানশীলতা ও পুনর্বণ্টনকে উৎসাহিত করে, অন্যদিকে স্বর্ণের নিসাব বাস্তব আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ফলে ইসলামি ফিকহে এ বিষয়ে আলোচনা ও গবেষণা চলমান থাকলেও উপমহাদেশের অধিকাংশ ফতোয়া-ধারায় রুপার নিসাবকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়; তবে সমকালীন কিছু গবেষক বাস্তব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বর্ণভিত্তিক মতকেও গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।    

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর