ঘরকে ইবাদত, পারিবারিক সৌহার্দ্য ও প্রশান্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। রাসুলুল্লাহ (স.) ঘরে প্রবেশের সময় কিছু আদব ও সুন্নাহ পালনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এই আমলগুলো পরিবারে যেমন ভালোবাসা ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি করে, তেমনি ঘরকে শয়তানের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর রহমত টেনে আনে।
ঘরে প্রবেশের সময় যে আমলগুলো পালন করা শান্তি ও বরকতের কারণ-
১. অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা
কারও ঘরে বা কামরায় প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার। পবিত্র কোরআনে অনুমতি চাওয়ার পরও সাড়া না পেলে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এমনকি নিজের ঘরেও হুট করে প্রবেশ না করে শব্দ দিয়ে বা জানান দিয়ে প্রবেশ করা উত্তম, যাতে ঘরের ভেতরের কেউ অপ্রস্তুত অবস্থায় থাকলে নিজেকে সামলে নিতে পারেন। (সূত্র: সুরা নূর: ২৭-২৮; আদাবুল মুফরাদ: ১০৬৬)
২. আল্লাহর নাম (বিসমিল্লাহ) নিয়ে প্রবেশ করা
ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করা বা ‘বিসমিল্লাহ’ বলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, কেউ ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম নিলে শয়তান তার সঙ্গীদের বলে- ‘এ ঘরে আজ রাতে তোমাদের থাকার কোনো সুযোগ নেই।’ অর্থাৎ, আল্লাহর নাম নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলে শয়তান সেই ঘরে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ হারায়। (দলিল: সহিহ মুসলিম: ২০১৮)
বিজ্ঞাপন
৩. মাসনুন দোয়া পাঠ করা
ঘরে প্রবেশের সময় রাসুল (স.) থেকে একটি বিশেষ দোয়া পাঠের কথা সুনানে আবু দাউদসহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। দোয়াটি হলো- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাল মাওলাজি ওয়া খাইরাল মাখরাজি, বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উত্তম প্রবেশ এবং উত্তম বাহির হওয়া প্রার্থনা করছি। আল্লাহর নামেই আমরা প্রবেশ করি এবং আল্লাহর নামেই আমরা বের হই। আর আমাদের রব আল্লাহর ওপরই আমরা ভরসা করি।’ এই আমলটি ঘরের আধ্যাত্মিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। (সূত্র: আবু দাউদ: ৫০৯৬)
৪. সালাম দিয়ে প্রবেশ করা
ঘরে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া অন্যতম বড় সুন্নাহ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা নিজেদের ওপর সালাম দেবে- এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ সালাম ঘরে শান্তি ও রহমত প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম। (দলিল: সুরা নূর: ৬১; আবু দাউদ: ৫০৯৪)
৫. হাসিমুখে ও সুন্দর আচরণে প্রবেশ
ঘরে প্রবেশের সময় হাসিমুখে ও কোমল আচরণ করা সুন্নাহ। রাসুলুল্লাহ (স.) পরিবারের সাথে সবচেয়ে উত্তম ব্যবহার করতেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) পরিবারের লোকদের সাথে ছিলেন সবচেয়ে নরম মেজাজের এবং সদা হাস্যোজ্জ্বল। (সূত্র: তিরমিজি: ৩৮৯৫; আশ-শিফা: ১/১৬১; আখলাকুন নবী-আবুশ শায়খ: ১৬৯)
আরও পড়ুন: নারী-পুরুষ একে অপরকে সালাম দেওয়া জায়েজ?
৬. রাত্রিবেলা প্রবেশের আদব
যদি অনেক রাতে দেরি করে ঘরে ফিরতে হয়, তবে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। শব্দ কম করা এবং অন্যদের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটানো মুমিনের বৈশিষ্ট্য। হযরত মিকদাদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (স.) রাতে ঘরে ফিরলে এমনভাবে সালাম দিতেন যাতে ঘুমন্ত ব্যক্তির জাগরণ না ঘটে, অথচ জাগ্রত ব্যক্তি তা শুনতে পায়। (সূত্র: সহিহ মুসলিম, তাওহিদ পাবলিকেশন: ৫২৬৯)
৭. সফর থেকে ফেরার আমল
সফর বা দীর্ঘ ভ্রমণ থেকে ফেরার ক্ষেত্রে রাসুল (স.)-এর সুন্নাহ হলো- হুট করে পরিবারের অপ্রস্তুত অবস্থায় ঢুকে না পড়া। নবী (স.) সফর থেকে রাতের বেলা হঠাৎ করে ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। এছাড়া সফর থেকে ফিরে (বাড়িতে প্রবেশের আগে নিকটস্থ মসজিদে) দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া সুন্নত। (সূত্র: সহিহ বুখারি: ১৮০১; সহিহ মুসলিম: ৭১৪, ৭১৫)
ঘরে প্রবেশের এই আদব ও সুন্নাহগুলো দৈনন্দিন জীবনে ছোট মনে হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। এগুলো নিয়মিত পালনের মাধ্যমে আমাদের ঘর হয়ে উঠতে পারে শয়তানমুক্ত, শান্তিপূর্ণ এবং রহমতে ভরপুর। এই আমলগুলো পরিবারে বরকত বৃদ্ধি করে এবং ঘরের পরিবেশকে সুশৃঙ্খল করে তোলে।




