ইসলামে সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নেয়ামত ও আমানত। সন্তানের জন্য সুন্দর, অর্থবহ ও ইসলামসম্মত নাম নির্বাচন করা পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অনেকেই প্রশ্ন করেন- গর্ভে থাকা অবস্থায় সন্তানের নাম নির্ধারণ করা কি বৈধ? কোরআন, হাদিস ও ফিকহি মতামতের আলোকে এ বিষয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
গর্ভে থাকা সন্তানের নাম নির্ধারণের বিধান
গর্ভে থাকা সন্তানের জন্য আগে থেকেই নাম নির্ধারণ করা বা চিন্তা করা জায়েজ। এটি কোনো নিষিদ্ধ কাজ নয়; বরং এটি পিতা-মাতার মানসিক প্রস্তুতি এবং সন্তানের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘রাতে আমার একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, আমি তার নাম আমার পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর নামে রাখি।’ (সহিহ মুসলিম: ২৩১৫)
আলেমদের মতে, রাসুলুল্লাহ (স.) সন্তানের নাম ইবরাহিম রাখবেন, তা তিনি আগে থেকেই স্থির করে রেখেছিলেন এবং জন্ম হওয়ার পর তা ঘোষণা করেন। এ থেকে বোঝা যায়, সন্তানের নাম পূর্বনির্ধারণ বা পূর্বচিন্তা করা বৈধ।
আরেক হাদিসে মৃত সন্তানের নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন নবীজি। কারণ তারা মা-বাবার আগে জান্নাতে পৌঁছাবে এবং তাদের জন্য সুপারিশ করবে।’ (আল-জামেউস সাগির (সুয়ুতি), হাদিস: ৪৬৬৩; মুসনাদে আহমদ: ৪/২১) এটি গর্ভাবস্থায় নাম নির্ধারণের বৈধতার বড় দলিল।
আরও পড়ুন: সন্তান জন্মের পর করণীয় সুন্নতসমূহ
নাম রাখার সময়
ইসলামি শরিয়তে সন্তানের নাম রাখার জন্য কয়েকটি সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায়-
- জন্মের পরপরই: সন্তান জন্মগ্রহণের প্রথম দিনেই নাম রাখা জায়েজ। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর সন্তান ও নাতির নাম জন্মদিনেই রেখেছিলেন।
- সপ্তম দিনে (আকিকার সময়): সুন্নাহ অনুযায়ী সপ্তম দিনে আকিকা দিয়ে নাম রাখা উত্তম। হাদিসে এসেছে- ‘সপ্তম দিনে তার নাম রাখা হবে…’ (সুনানে আবু দাউদ)
- জন্মের আগে: গর্ভাবস্থায় নাম নির্ধারণ করাও বৈধ এবং অনেক সাহাবি এভাবে পূর্বেই নাম ভেবে রাখতেন।
লিঙ্গ জানা না থাকলে করণীয়
বর্তমানে চিকিৎসা প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্তানের লিঙ্গ জানা সম্ভব হলেও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে-
একটি ছেলে ও একটি মেয়ের নাম আগে থেকে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত প্রস্তুতির অংশ। বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ ইমাম নববি (রহ.) এবং আরও অনেক আলেম সাহাবায়ে কেরামের আমলের আলোকে বলেছেন, যদি মা-বাবা গর্ভাবস্থায় জানতে পারেন (বা ধারণা করেন) যে সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে, তবে তারা আগে থেকেই নাম নির্ধারণ করতে পারেন। আর যদি নিশ্চিত না হন, তবে একটি ছেলের নাম এবং একটি মেয়ের নাম পছন্দ করে রাখা মোস্তাহাব। এটি অনাগত মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শামিল।
আরও পড়ুন: নবীজি যে ২ নাম সবচেয়ে পছন্দ করতেন
সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখার গুরুত্ব
ইসলামে সুন্দর নাম রাখা সন্তানের অন্যতম অধিকার। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও পিতার নামে ডাকা হবে; সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪৮)
নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার
ইসলাম কিছু নামকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছে-
- আল্লাহর প্রিয় নাম: আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান (সহিহ মুসলিম)
- নবী-রাসুলদের নাম: মুহাম্মদ, ইবরাহিম ইত্যাদি।
- সাহাবিদের নাম: এগুলো বরকতপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী।
- ভালো অর্থবোধক নাম: যে নামের অর্থ ইতিবাচক, সুন্দর ও সম্মানজনক।
যে নামগুলো পরিহার করা উচিত
মন্দ অর্থের নাম: যেমন—দুঃখ, যুদ্ধ, কষ্ট ইত্যাদি অর্থের নাম।
শিরকযুক্ত নাম: আল্লাহ ছাড়া অন্যকারো দাসত্ব বোঝায় এমন নাম (যেমন: আবদুশ শামস)।
অহংকারসূচক নাম: যে নাম অতিরিক্ত প্রশংসা বা গর্ব প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন: ছেলে সন্তানের নাম মুহাম্মদ রাখা যাবে?
নাম পরিবর্তনের বিধান
যদি কোনো নাম খারাপ অর্থ বহন করে, তাহলে তা পরিবর্তন করা জায়েজ। রাসুলুল্লাহ (স.) অনেক সময় সাহাবিদের নাম পরিবর্তন করে সুন্দর নাম দিতেন, যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
গর্ভের সন্তানের জন্য দোয়ার গুরুত্ব
নাম নির্ধারণের পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় সন্তানের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের দোয়া- ‘রব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বয়্যিবাহ, ইন্নাকা সামিউদ দুআ।’ অর্থ: ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে নেক সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩৮)
সারসংক্ষেপ
গর্ভাবস্থায় নাম নির্ধারণ করা জায়েজ এবং এটি একটি উত্তম প্রস্তুতি। তবে সন্তানের জন্য সর্বোত্তম নাম নির্বাচন করা, তার অর্থ ভালো হওয়া এবং ইসলামি আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সন্তান যেন সুস্থ ও নেককার হয়- এটাই হওয়া উচিত মা বাবার মূল লক্ষ্য।




