হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার এটি ফরজ। একবার হজ আদায় করার পর পুনরায় হজ করলে সেটি ‘নফল হজ’ বিবেচিত হয়। নফল ইবাদতের চেয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ‘হককুল ইবাদ’ বা সৃষ্টির অধিকারের গুরুত্ব রয়েছে ইসলামে। এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- নফল হজে যাওয়ার জন্য কি স্ত্রীর অনুমতি বা পরামর্শের প্রয়োজন আছে? শরিয়তের আলোকে বিষয়টি নিচে তুলে ধরা হলো।
নফল হজের ক্ষেত্রে বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি একবার ফরজ হজ আদায় করে থাকেন এবং পুনরায় নফল হজ করতে চান, তবে সেক্ষেত্রে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা এবং তাঁর সম্মতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলেমদের মতে, নফল হজের চেয়ে পরিবারের হক আদায় এবং স্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রশান্তির প্রতি খেয়াল রাখা অনেক সময় বেশি সওয়াবের কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে যদি স্ত্রী অসুস্থ হন, একাকী থাকতে ভয় পান অথবা স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তানদের দেখাশোনা বা পারিবারিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নফল হজের চেয়ে পরিবারের পাশে থাকাই অধিক উত্তম। কারণ নফল হজ একটি ঐচ্ছিক ইবাদত, কিন্তু জরুরি সময়ে পরিবারের দেখাশোনা করা স্বামীর ওপর অপরিহার্য দায়িত্ব।
আরও পড়ুন: বিদেশ থেকে স্বামী নফল রোজা রাখতে নিষেধ করলে মান্য করা জরুরি?
ফরজ হজের সাথে পার্থক্য
জেনে রাখা ভালো যে, ফরজ হজের বিষয়টি নফল হজের চেয়ে ভিন্ন। কারো ওপর হজ ফরজ হয়ে গেলে এবং তিনি আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান হলে তাঁকে অবশ্যই হজ পালন করতে হবে। যেহেতু এটি আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ, তাই এক্ষেত্রে স্ত্রী বা অন্য কারো অনুমতির বাধ্যবাধকতা নেই। ইসলামি নীতি অনুযায়ী- ‘স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।’ (তথ্যসূত্র: মুসনাদে আহমাদ: ১০৯৫; জামে তিরমিজি: ১৭০৭)
অর্থাৎ, হজ ফরজ হওয়ার পর শুধু অনুমতির অভাবে তা বিলম্ব করলে ব্যক্তিটি গুনাহগার হবেন। তবে নফল হজের ক্ষেত্রে যেহেতু কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই সেখানে স্ত্রীর অধিকার ও সম্মতির বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
বিজ্ঞাপন
ভরণপোষণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা
হজ ফরজ হোক বা নফল, স্বামীর ওপর একটি শর্ত সবসময়ই কার্যকর থাকে- তাহলো স্ত্রীর পূর্ণ ভরণপোষণ নিশ্চিত করা। হজে যাওয়ার আগে স্বামীকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তাঁর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা ও বাসস্থানের কোনো অভাব হবে না। হাদিসে এসেছে- ‘কেউ পাপী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার ওপর নির্ভরশীলদের রিজিক নষ্ট করে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯২)
আরও পড়ুন: শাওয়ালের ৬ রোজা রাখতে কি স্বামীর অনুমতি লাগবে?
পারিবারিক সদ্ভাব ও পরামর্শের গুরুত্ব
শরিয়ত নফল হজের ক্ষেত্রে পরামর্শকে গুরুত্ব দিলেও মূলত পারিবারিক জীবনে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। একজন আদর্শ স্বামীর জন্য উচিত-
- হজে যাওয়ার আগে স্ত্রীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করা
- তাঁকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করা এবং হজের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলা
- পবিত্র ভূমি থেকে স্ত্রী ও পরিবারের জন্য বিশেষ দোয়া করা
এই শিষ্টাচারগুলো পারিবারিক শান্তি ও ভালোবাসা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্ত্রীর হজের ক্ষেত্রে স্বামীর ভূমিকা (তুলনামূলক আলোচনা)
স্বামীর মতো স্ত্রীর ক্ষেত্রেও হজ ফরজ হলে স্বামী তাতে বাধা দিতে পারেন না। তবে স্ত্রীর সফরে অবশ্যই একজন মাহরাম (যাঁর সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ) থাকতে হবে। মাহরাম থাকলে স্ত্রী ফরজ হজ আদায় করতে পারবেন, এমনকি স্বামী অনুমতি না দিলেও অধিকাংশ ফিকহি মত অনুযায়ী ফরজ হজে বাধা দেওয়া বৈধ নয়। তবে নফল হজের ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক।
সারসংক্ষেপ, নফল হজের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা এবং তাঁর অধিকারের প্রতি সজাগ থাকা অধিক উত্তম ও সওয়াবের কাজ। ফরজ হজের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও স্ত্রীর ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং তাঁর সাথে সদ্ভাব বজায় রাখা একজন মুমিনের অপরিহার্য গুণ।
(সুরা আলে ইমরান: ৯৭; ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/২২১; বাদায়েউস সানায়ে: ২/১৪১; মুসনাদে আহমদ: ১০৯৫; তিরমিজি: ১৭০৭; আবু দাউদ: ১৬৯২




